ডিয়েগো কস্তা এরকমই। অস্থিরমতি, উদ্বায়ী চরিত্র। কোনও কিছু পছন্দ না হলে রেগে যান। খেপে যান। মাঠে সেটির প্রকাশও ঘটান দৃষ্টিকটুভাবে। কাল যেমন অ্যানফিল্ড তাকে দেখলো।
আতলেতিকো মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভুত স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডকে যখন ৫৬ মিনিটের পর তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিলেন কোচ ডিয়েগো সিমিওনি, সেটি তিনি মানতে পারেননি। বারকয়েক মাথা নাড়লেন। পার্শ্বরেখার কাছে গিয়ে বদলি খেলোয়াড় মার্কোস ইয়োরেন্তের সঙ্গে হাত অবশ্য মেলালেন। এটি ভদ্রতা, ফুটবলের সৌজন্যবোধ। কিন্তু তারপর… ডাগআউটের কাছে গিয়ে গজরাতে গজরাতে লাথি মারলেন পানির বোতলে, কিটব্যাগে।
সিমিওনি কস্তাকে ভালো করেই চেনেন। এসব কাণ্ডকীর্তি তাই না-দেখার ভান করলেন। কারণ পারিশ্রমিকের দিক দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দামি কোচ তখন স্থির নিশ্চিত যে কস্তাকে বদলে ঠিক কাজটিই করেছেন। আর সত্যিই ইয়োরেন্তের হাতে চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন খুন হতে দেখলো কাল লিভারপুল। দূর থেকে স্প্যানিশ চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনাও দেখলো লা লিগার এক সহযোগী দল বদলা নিলো গত মৌসুমে লিভারপুলের হাতে তাদের নির্মম পরাজয়ের।
তবে ইয়োরেন্তেকে নামানো যে ছিল ‘মাস্টার স্ট্রোক’ সেটি বোঝা গেছে অনেক পরে। ততক্ষণে আতলেতিকো সমর্থকদের স্নায়ুর ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। আর প্রায় গোটা অ্যানফিল্ডই আশায় ঝলমল করে উঠেছে যে চ্যাম্পিয়নস লিগের চ্যাম্পিয়নরা কোয়ার্টার ফাইনালে যাচ্ছে। দুই বছর ধরে অন্যগ্রহের ফুটবল খেলা লিভারপুলকে বিদায় করা এই ঘ্যানঘেনে টাইপের আতলেতিকোর কম্মো নয়! দ্বিতীয় রাউন্ডের প্রথম লেগে আতলেতিকোর মাঠ থেকে ১-০ গোলে হেরে আসা লিভারপুল দ্বিতীয় লেগের ৯০ মিনিটে ১-০ গোলে এগিয়ে যায় জর্জিনিয়ো ভাইনালডামের গোলে। তাতেও অবশ্য শেষ আটের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়নি। ১৫ যোগ ১৫, অতিরিক্ত ৩০ মিনিট খেলার চতুর্থ মিনিটে রবার্তো ফিরমিনোর গোল তীব্র আশায় উদ্বেল করে তোলে লিভারপুলকে। ভরা স্টেডিয়ামে লালসমুদ্রের গর্জনে আতলেতিকো তখন ম্রিয়মান। অতিরিক্ত সময়ের সাত মিনিট পর্যন্ত মাদ্রিদের দলটি পিছিয়ে, কেউ তাদের নিয়ে বাজি ধরেনি!
আর ঠিক তখনই আবির্ভাব মার্কোস ইয়োরেন্তে নামের ২৫ বছর বয়সী ৬ ফুট দীর্ঘ এক মিডফিল্ডারের। লিভারপুলের এক নম্বর গোলকিপার আলিসন বেকারকে ছিটকে ফেলেছে চোট। গোলবারের নিচে নাম্বার-টু আদ্রিয়ান। আদ্রিয়ানই একটি ভুল করে বসলেন। বক্সের মধ্যে বল ধরে সেটি ঠিকঠাক সহখেলোয়াড়কে বাড়াতে পারেননি। বল পেয়ে যান আতলেতিকোর পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড জোয়াও ফেলিক্স। তার পাসেই বল পেয়ে দুর্দান্ত গোল ইয়োরেন্তের। দুই লেগ মিলিয়ে দু’দলের মোট গোলসংখ্যায় এসে যায় সমতা, ২-২। এই অ্যাওয়ে গোলটা ধরে রাখলেই আতলেতিকোর চলতো। এটাই তুলে দিতো কোয়ার্টার ফাইনালে। কিন্তু ৮ মিনিট পর আবারো প্রতিআক্রমণে ইয়োরেন্তের গোল, ম্যাচ ২-২। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল লিভারপুলের। বাকি ১৫ মিনিটে আরও দু’গোল না করতে পারলে চ্যাম্পিয়নদের যে এখানেই মৃত্যু। আতলেতিকোর রক্ষণ সেই গোল আর পেতে দেয়নি। উল্টো অতিরিক্ত সময়ের যোগ করা সময়ে প্রতিআক্রমণ থেকে আলভারো মোরাতা আরেকবার বল ঠেলেছেন লিভারপুলের জালে। প্রথম লেগের মতো দ্বিতীয় লেগেও জয়। শেষ ষোলোতেই চ্যাম্পিয়নদের কফিনে তুলে দিলো আতলেতিকো।
ঘরের মাঠে ২৫ ম্যাচ পর হারলো লিভারপুল। সেই যে ২০১৪-১৫ মৌসুমে অ্যানফিল্ডে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে হেরেছিল ৩-০ গোলে, তারপর আতলেতিকোর কাছে এই হার।
লিভারপুল হেরেছে আসলে এক অখ্যাত মিডফিল্ডারের কাছে। মূল একাদশে যার জায়গা হয় না। বেঞ্চে বসে থাকার নিয়তি মেনেই যিনি আতলেতিকোয় পাঁচ বছরের চুক্তিতে সই করেছেন গত বছর।
সত্যিই কি অখ্যাত মার্কোস ইয়োরেন্তে? আক্রমণাত্মক ফুটবলের বিপক্ষে রক্ষণাত্মক কৌশলকে যিনি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, সেই সিমিওনি অখ্যাত বললে আপত্তি করতে পারেন। বলতে পারেন, ‘ ও তো আমার গোপন অস্ত্র, সুপার-সাব।’ ঠিকুজি বলে ইয়োরেন্তের শরীরে আছে সম্ভ্রান্ত ফুটবলের ডিএনএ। বিখ্যাত হয়ে ওঠাটা তার জন্য কেবল সময়ের ব্যাপার।
ফুটবল ইয়োরেন্তেদের পারিবারিক ঐতিহ্য। আর মাদ্রিদের এই পরিবারের সঙ্গে ভালোবাসার বন্ধন রিয়াল মাদ্রিদের। বাবা ফ্রান্সিসকো ‘পাকো’ জেন্তো লা লিগায় উইঙ্গার হিসেবে খেলেছেন ২০৭ ম্যাচ। মাদ্রিদের দুই প্রান্তের দুটি ক্লাবেই খেলেছেন। আতলেতিকো মাদ্রিদে ২৯ ম্যাচ, রিয়াল মাদ্রিদে ১০৬ ম্যাচ। আর দাদা (বাবার চাচা) ৮৬ বছর বয়সী ফ্রান্সিসকো জেন্তো লোপেজ তো রিয়াল মাদ্রিদের বর্তমান অনারারি প্রেসিডেন্ট। ২০১৬ সালে আলফ্রেডো ডি স্তেফানোর মৃত্যুর পর থেকেই সাম্মানিক পদটি অলঙ্কৃত করে রেখেছেন স্পেনের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ৬ বার ইউরোপিয়ান কাপ জিতেছেন তিনি, লা লিগা জিতেছেন ১২ বার। খেলতেন লেফট উইংয়ে, রিয়ালের হয়ে ৪২৮ ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ১২৮টি।
ইয়োরেন্তেও বাবা-দাদার মতো রিয়াল মাদ্রিদ ভক্ত সেই ছোটবেলা থেকে। রিয়ালের যুবদলে ঢোকা তার ১৩ বছর বয়সে। রিয়াল মাদ্রিদ ‘বি’ দলে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক। ২০১৫ সালে মূল দলে অভিষেকের এক বছর পর রিয়াল তাকে ধারে পাঠায় আলাভেসে। সেখানে এক বছর খেলে ফিরে আসেন। রিয়ালের হয়ে ২০১৮ সালের ২২ ডিসেম্বর তারিখটি ইয়োরেন্তের জন্য স্মরণীয়। এদিনই আল-আইন এফসিকে হারিয়ে রিয়ালকে বিশ্ব ক্লাব কাপ জেতাতে রাখেন বড় ভূমিকা। ৪-১ গোলে জেতা ফাইনালে একটি গোলই শুধু করেননি, ম্যাচেরও সেরা খেলোয়াড় হন তিনি।
২০ জুন, ২০১৯ তারিখে ৩.৫ কোটি পাউন্ডের বিনিময়ে রিয়াল থেকে ইয়োরেন্তেকে পাঁচ বছরের চুক্তিতে নিয়ে নেয় আতলেতিকো। মুক্তো চিনতে ভুল করেনি ক্লাবটি।