কাতার বিশ্বকাপের বদৌলতে বাংলাদেশে লিওনেল মেসি তথা আর্জেন্টিনার অজস্র ভক্তকে নতুন রূপে দেখা গেছে। তাদের ভক্তির কারণেই সংবাদ সম্মেলনে লিওনেল স্ক্যালোনিকে বাংলাদেশের নাম উচ্চারণ করতে হয়েছে। সমর্থনের জন্য দিতে হয়েছে ধন্যবাদ। তবে ব-দ্বীপে যতই আলবিসেলেস্তেদের ক্রেজ থাকুক না কেন, সেই তুলনায় ব্রাজিল নিয়ে উন্মাদনাও কম নয়। বলা চলে ঘরোয়া লিগে ব্রাজিলিয়ানদেরই রাজত্ব। কারণ, প্রিমিয়ার লিগে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন দেশটির খেলোয়াড়দের সংখ্যাই বেশি!
এবার দেখে নেওয়া যাক ঘরোয়া লিগে ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের আধিপত্য কেনই বা এত বেশি। কী কারণে কম খেলে থাকেন আর্জেন্টাইনরা।
রেকর্ড সংখ্যক ব্রাজিলের খেলোয়াড়
প্রিমিয়ার লিগের তিন সংস্করণের চিত্র দেখলে তা দিবালোকের মতো পরিষ্কার। দুই মৌসুম আগে ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের সংখ্যা ছিল ৬। গতবার সেটি বেড়ে আটে দাঁড়িয়েছিল। আর এবার তো সর্বোচ্চ ১১ জন! বিপরীতে দুই মৌসুম আগে মাত্র তিন জন আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়কে দেখা গিয়েছিল। এরপর থেকে আর্জেন্টাইনদের আর দেখাই যায়নি। তবে একটি বিষয় উল্লেখ্য, শুরু থেকে আর্জেন্টিনার চেয়ে ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের আধিক্যটা একটু বেশি দেখা গেছে ঘরোয়া লিগে।
এবার বসুন্ধরা কিংস ও ফর্টিস এফসিতে আছেন তিন জন ব্রাজিলিয়ান। আবাহনী লিমিটেড ও রহমতগঞ্জে দুজন এবং মোহামেডানে আছেন একজন। এরমধ্যে তিন ব্রাজিলিয়ান বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। তারা হলেন আবাহনী লিমিটেডের রাফায়েল অগাস্তো, এবার বসুন্ধরায় নাম লেখানো দোরিয়েল্তন গোমেজ ও রবিনহো।
ব্রাজিলিয়ানদের ফুটবল মানে রেমিট্যান্স
বাংলাদেশে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের আধিক্য আর আর্জেন্টাইনদের অনুপস্থিতি নিয়ে একটু গভীরে গিয়ে দেখা গেছে অন্য চিত্র। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানার চেষ্টা করা হয়েছে এর কারণগুলো।
আবাহনী লিমিটেডের কোচ হয়ে দীর্ঘদিন ধরে ডাগআউটে আছেন মারিও লেমস। পর্তুগিজ কোচ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘আবাহনীতে আসার পর আমরা আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের বায়োডাটা কম দেখেছি। যতটুকু বুঝি ওরা এত দূরে খেলতে আসতে চায় কম। আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়। যোগাযোগও মনে হয় একটা সমস্যা। তাছাড়া এজেন্টরা ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের পছন্দ করে বেশি।’
এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেমস বলেছেন, ‘ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের মান একই। ব্রাজিল দেশ বড়। তাদের অনেক খেলোয়াড়। সারা বিশ্বের লিগগুলোতে ওদের খেলোয়াড়রা খেলছে। আমি পর্তুগাল, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অনেক জায়গায় দেখেছি। সবকিছু মিলে মনে হয় ব্রাজিলিয়ানরা দেশের বাইরে খেলতে পছন্দ করে।’
বসুন্ধরা কিংসের টেকিনিক্যাল ডিরেক্টর বি এ জোবায়ের নিপু আরও বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেন, ‘ব্রাজিলের প্রতি দুর্বলতা আছে। আর্জেন্টিনার প্রতিও আছে। তবে ব্রাজিলে অনেক লিগ হয়। পঞ্চম বিভাগেও হয়। দেখা যায় সেই লিগে দক্ষ খেলোয়াড় পাওয়া যায় কম টাকায়। সেক্ষেত্রে আর্জেন্টিনায় সেভাবে খেলোয়াড় পাওয়া যায় না।’
আর্জেন্টিনার চেয়ে ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা স্কিলের দিক দিয়ে একটু বেশি এগিয়ে আছেন বলে তার দাবি, ‘আর একটা বিষয়, আর্জেন্টিনায় দক্ষ খেলোয়াড় একটু কম। ওদের জাতীয় দলের দিকে তাকান, মেসি ছাড়া তেমন দক্ষ খেলোয়াড় দেখতে পাবেন কম। তাই আমার মনে হয় এদিক দিয়ে ব্রাজিল এগিয়ে থেকে বিশ্বের সব জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা আবার বাইরে খেলে রেমিট্যান্স নিয়ে আসছে। ইউরোপসহ অন্য জায়গায় তাদের উপস্থিতি দেখে তেমনই মনে হচ্ছে। এতে তারা অভ্যস্ত।’
দুই মৌসুম আগে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের খেলোয়াড় হার্নান বার্কোসকে এনে চমক দেখিয়েছিল বসুন্ধরা। তবে এএফসি কাপে একটির বেশি ম্যাচ খেলতে পারেননি তিনি। নিপু বলেছেন, ‘বার্কোস খেলেছে, ও ব্যতিক্রম। তবে বেসেরা কিংবা দেলমন্তে খেললেও মন কাড়তে পারেনি। তাই ব্রাজিলিয়ান রবিনহো-দোরিয়েন্তলনদের নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট।’
ঢাকার মাঠে দীর্ঘদিন ধরে কোচিং করিয়ে আসছেন দেশের একমাত্র উয়েফা ‘এ’ লাইসেন্সধারী কোচ মারুফুল হক। অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেছেন, ‘আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় সহজেই এদিকে আসতে চায় না। ওদের সঙ্গে যারা এজেন্ট হিসেবে কাজ করে তাদের সঙ্গে কেন জানি লিংকআপটা নেই। ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা টেকনিক্যালি ও ট্যাকটিক্যালি সাউন্ড বেশি। তাই তাদের বেশি দেখা যাচ্ছে। এখানকার কর্মকর্তা ও কোচসহ সবাই বুঝতে পারছেন শরীর দিয়ে ফুটবল আর চলে না। টেকনিক্যালি বা ট্যাকটিক্যালি বিষয় থাকে। এখান থেকে আমাদের খেলোয়াড়দের অনেক কিছু শেখার আছে।’
দেশি-বিদেশি এজেন্টদের ভাষ্য কী?
দেশে রবিনহোর মতো খেলোয়াড়দের এজেন্ট কনফিয়েনজা স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট। এর কো-ফাউন্ডার এবং নির্বাহী পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশের ফুটবল অবকাঠামো এত উন্নত নয়। একটু অন্যরকম। এগুলো যখন ওদের সামনে (আর্জেন্টিনা) উপস্থাপন করা হয় তখন ওরা আগ্রহ দেখায় না। ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের গ্রুমিং কিন্তু তৃণমূল থেকে শুরু হয়। তাদের কাছে আবার এই বিষয়গুলো ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। ওদের কনভিন্স করা যায়।’
তবে কাতার বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে ভালোভাবেই চিনেছে আর্জেন্টিনা। এই কর্মকর্তা তাই আশাবাদী কণ্ঠে বলেছেন, ‘আমাদের দেশ কাতার বিশ্বকাপের আগে ওদের কাছে এতটা পরিচিত ছিল না। আর যারা এখানে খেলেছে, তারা সেভাবে বড় রকমের প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। তারা নিজেদের জোনে খেলতে কমফোর্ট ফিল করে। তবে বিশ্বকাপের পর হয়তো চিত্র বদলে যেতে পারে।’
তবে আর্জেন্টাইনরা যে নিজেদের পছন্দসই জায়গাতে খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে তা অকপটে বললেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশের এক সাবেক এজেন্ট, ‘আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের অনেকেই এশিয়াতে চ্যালেঞ্জ নিতে আগ্রহী নন। ওদের জাতীয় দলের খেলোয়াড় ছাড়া অন্যরা খুব বেশি ইউরোপ কিংবা লাতিন দেশগুলোর বাইরে খেলে কম। এশিয়ান ফুটবলে ওদের প্রতিনিধিত্বও কম। ওরা আসলে নিজের পরিবার নিয়ে দেশের মধ্যে খেলতে পছন্দ করে। নিজেদের কমফোর্ট জোনে থাকে।’
উজবেকিস্তানে বসবাসরত এক এজেন্ট, যার বাংলাদেশের ফুটবলের সঙ্গে বেশ সংশ্লিষ্টতা সেই ওপিয়েমি হামেদ বাদমুস নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, ‘ভালো আর্জেন্টাইরা বাংলাদেশে সহজে আসতে চায় না। তারা ইউরোপ কিংবা লাতিন দেশগুলোতে খেলে থাকে। কিন্তু ব্রাজিলে অনেক লিগ হয়, বিভিন্ন প্রদেশেও। দেশ বড়, জনসংখ্যাও অনেক। প্রচুর খেলোয়াড় তাদের। সেখান থেকে বিভিন্ন দেশে লিগ খেলতে যায় তারা। ভালো খেলোয়াড়রা সবসময় বড় ক্লাবে খেলতে পছন্দ করে। আবার অল্প পারিশ্রমিকে অনেক সময় ছোট ক্লাবেও ব্রাজিলিয়ানরা খেলে থাকে।’