প্রথম পরিচয় ঢাকাতে। বছর তিনেক আগে ডগলাস সিলভা তখন আরামবাগ ক্রীড়া সংঘের কোচ। দলের অন্যতম তরুণ ডিফেন্ডার নাজমুল আকন্দের সঙ্গে খেলার সূত্র ধরে সখ্যতা। ব্রাজিলে ফিরে গেলেও নাজমুলের সঙ্গে যোগাযোগে কোনও ছেদ পড়েনি। ঢাকায় থাকতেই ব্রাজিলিয়ান কোচকে তাদের দেশের যে কোনও ক্লাবে খেলার আগ্রহটা জানিয়ে রেখেছিলেন। ব্যাটে-বলে দারুণভাবে মিলে যাওয়ায় ফেব্রুয়ারির শুরুতে সাও পাওলো শহরে বড় স্বপ্ন নিয়ে পা রাখেন রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে আসা ফুটবলার। এখন সেই ডগলাসই নেইমারদের দেশে নাজমুলের বড় অভিভাবক! সাও পাওলোতে নিজের বাড়িতেই ঠিকঠাকভাবে আগলে রেখেছেন ২১ বছর বয়সী বাংলাদেশের ফুটবলারকে!
ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে সাও পাওলোর যে কোনও একটি ক্লাবে ট্রায়ালে দেওয়ার জন্য সেখানে যান মোহামেডানে খেলা নাজমুল। তবে গিয়েই বুঝতে পারেন কাজটি সহজ নয়। পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের দেশে গিয়ে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিজের পারফরম্যান্স দেখানো যে বড় কঠিন। যার মাধ্যমে সেখানে যাওয়া সেই কোচ ডগলাসই নাজমুলকে নিজের বাসায় রেখে সেখানকার ক্লাবে খেলানোর জন্য সেভাবেই তৈরি করছেন। দিচ্ছেন দিক-নির্দেশনা।
এরই মধ্যে সাও পাওলোর মৌয়ান স্পোর্টস গিল্ড ক্লাবে নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ পেয়েছেন। দুবেলা করে ঘাম ঝরিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করছেন ২১ বছর বয়সী ফুটবলার। নাজমুল সাও পাওলো শহর থেকে বাংলা ট্রিবিউনকে নিজেই বলেছেন, ‘এখানে এসেছি এক মাসের বেশি সময় হলো। এসেই বুঝতে পারছি এখানে খেলাটা সহজ নয়। তাই সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। আপাতত স্থানীয় একটি ক্লাবে অনুশীলনের সুযোগ পেয়েছি। ডগলাসই তা করে দিয়েছে। এই ক্লাবেই তিনি একসময় খেলেছিলেন। লক্ষ্য হলো এখানকার ক্লাবের হয়ে অনূর্ধ্ব-২৩ দলে খেলা। অন্য ক্লাবও তালিকায় আছে। এখন যেই দলে খেলার সুযোগ পাই।’
৪৮ বছর বয়সী ডগলাসের বাসায় নাজমুল থাকছেন, খাচ্ছেন। ডগলাস কিংবা তার স্ত্রী নিজের হাতে রান্না করে আতিথেয়তা দিচ্ছেন। এরজন্য নাজমুলকে কোনও অর্থ দিতে হচ্ছে না। শুধু তাই নয় ডগলাস নিজেই গাড়ি চালিয়ে প্রতিদিন তাকে ক্লাবের অনুশীলনে নিয়ে যাচ্ছেন! ব্রাজিলিয়ান কোচের এমন মহানুভবতায় নাজমুল বিস্মিত, ‘আমাকে উনি নিজের ছেলের মতো করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তার বাসায় থাকছি, খাচ্ছি। উনি বা তার স্ত্রী রান্না করছেন। কলকাতায় উনি একসময় খেলার কারণে জানেন বাঙালিরা ভাত ও মাছ বেশি পছন্দ করেন। তাই আমার জন্য উনারা গরুর মাংস, মাছ ও ভাতই বেশি রান্না করে থাকেন। এখানে এসে মনে হয়েছে নিজের বাড়িতে আছি।’
একটু পেছনে ফিরে গেলেন নাজমুল। স্মৃতিচারণ করলেন আরামবাগে খেলার সময়কাল। ডগলাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যেন স্মৃতির অতলে ডুবে গেলেন, ‘ডগলাস যখন কোচ হয়ে আসে। তখন আমি তাকে বলেছিলাম ব্রাজিলে আমি ট্রেনিংয়ে গিয়েছিলাম। আমার লক্ষ্য পরবর্তিতে সেখানকার ক্লাবে খেলা। আমার আগ্রহ দেখে ডগলাসও খুশি হয়েছে। এ নিয়ে আমাদের সব সময় কথা হতো। সেই সূত্রেই এবার আমার সাও পাওলোতে আসা। উনি চাইছেন যে করেই হোক যেন আমি এখানকার ক্লাবে খেলে নিজের দেশের সম্মান উজ্জ্বল করতে পারি।’
ডগলাস সবকিছুই করছেন ভালোবাসা থেকে। এর জন্য কোনও অর্থ নিচ্ছেন না জানান নাজমুল, ‘অনেকেই মনে করতে পারেন তিনি আমার এজেন্ট। আসলে তা নয়। উনি সবকিছুই করছেন আমার আগ্রহ দেখে। এখানে আমার থাকা ও খাওয়াতে কোনও অর্থই ব্যয় হচ্ছে না। বরং অনুশীলনের পাশাপাশি এখানকার পর্তুগিজ ভাষা একটু একটু করে শিখতে সহায়তা করছেন। কিছু দিন পর উনি দক্ষিণ কোরিয়াতে কোচিং করাতে যাবেন। যাওয়ার আগেই এখানকার ক্লাবে অন্তত ৬ মাসের জন্য খেলার সুযোগ করে দেওয়ার আশ্বাস পেয়েছি।’
নাজমুলের কথারই সত্যতা মিললো ৪৮ বছর বয়সী কোচের কণ্ঠে। ঢাকায় কোচিং করাতে গিয়েই যে হৃদ্যতা। তারপর এই পর্যন্ত পথচলা। ডগলাস আশাবাদী কণ্ঠে বলেছেন, ‘নাজমুলের আগ্রহ ছিল শেষ পর্যন্ত। তাই ওকে এখানে ট্রায়ালের সুযোগ করে দিয়েছি। আমি চাই ও এখানকার কোনও দলে খেলুক। তবে এশিয়ানদের সমস্যা একটাই। এই যেমন নাজমুলের শারীরিক গঠন ঠিক আছে। তবে টেকনিক্যালি কিছুটা পিছিয়ে। আমার এখানে থেকে ও যদি নিজেকে বদলে ফেলতে পারে তাহলে ক্যারিয়ারের জন্য ইতিবাচক হবে। এটা এখন সম্পূর্ণ ওর হাতে। আমি আমার মতো চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
নাজমুলের স্বপ্নপূরণের পথে ডগলাস যে বড় ভরসার নাম!