ইসলামাবাদের আকাশ পেরিয়ে ঢাকার মাঠ- উসমান আলীর অপেক্ষাটা শুধু একটি ম্যাচের নয়, নতুন এক অধ্যায়ের। প্রথমবার দেশের বাইরে বাংলাদেশের লিগে। ২১ বছর বয়সী এই গোলকিপারের কাছে তাই রোমাঞ্চটা একটু অন্যরকম।
বাংলাদেশ ফুটবল লিগে সার্ক কোটা চালু হওয়ায় নেপাল ও ভুটানের পর এবার পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের ভাগ্য খুলে গেছে। এবার লিগের দ্বিতীয় পর্বে প্রথমবারের মতো পাকিস্তান জাতীয় দলের ৭ খেলোয়াড় বাংলাদেশের ক্লাবগুলোর হয়ে নামছেন। তাদেরই একজন উসমান আলী। পিডব্লিউডির হয়ে তেকাঠির নিচে কঠিন পরীক্ষা জন্য প্রস্তুত ইসলামাবাদ থেকে উঠে আসা এই ফুটবলার।
বাংলাদেশের লিগে উসমানসহ বাকি ৬ জনের এই পথচলা নতুন হলেও ইতিহাসে তা নতুন নয়। সত্তর দশকে মোহামেডান স্পোর্টিংয়ে খেলে গেছেন পাকিস্তানের ফুটবলার কালা গফুর, ফজল, আমির বক্স ও আশিক। তাদের উত্তরসূরি হয়ে দীর্ঘদিন পর ঢাকায় পা রাখছেন উসমান-উজাইররা। তাই আবেগটাও একটু আলাদা।
পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-২৩ দলের পর কম্বোডিয়ার বিপক্ষে সিনিয়র দলে থাকা গোলকিপার উসমান আলী সেখানকার পোপো এফসির অ্যাকাডেমিতে বড় হয়েছেন। সবশেষ খেলেছেন রাওয়ালপিন্ডির খান রিসার্চ ল্যাবরেটরিজের জার্সিতে। ইসলামাবাদে নিজের বাসায় ঢোকার মুহূর্তে উসমান আলীকে ফোনে পাওয়া গেলে বাংলাদেশের ক্লাব প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশিরা আমাদের ভাই বা ভাইয়ের মতো বলতে পারেন। এখানে খেলতে অনেকটাই মুখিয়ে আছি। যখনই প্রস্তাব পেয়েছি, না করিনি। শুধু আমি নই, আমাদের পাকিস্তান থেকে এবার ৭ জন খেলোয়াড় বাংলাদেশের ক্লাবগুলোতে খেলবেন। এটা আমাদের জন্য বড় সুযোগ। যদি ভালো করতে পারি, তাহলে নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। পরের মৌসুমে আরও পাকিস্তানি খেলোয়াড় খেলার সুযোগ পাবে।’
হামজা চৌধুরী বাংলাদেশের হয়ে খেলার পর চারদিকে আলোড়ন পড়েছে। উসমান নিজেও জানেন সেটা , ‘কোঁকড়া চুলের অধিকারী হামজা তো লেস্টার সিটিতে খেলে থাকে। ও বাংলাদেশের হয়ে খেলছে, এটা তো ভালো দিক। দক্ষিণ এশিয়ার বড় তারকা। বাংলাদেশ দলের খেলা দেখেছি। আমার কাছে মনে হয়, খুব বেশি ভালো কিংবা খারাপ নয়। মাঝামাঝি অবস্থানে আছে।’
পেশাদার ফুটবলে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ভিন্ন দুই দেশে। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের কেউ কেউ ঘরোয়া ফুটবলে কোটি টাকা পর্যন্ত পেয়ে থাকেন। যদিও ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর বর্তমানে খারাপ অবস্থা। সেখানে পাকিস্তানে উসমানের মাসিক বেতন দেড় লাখ পাকিস্তানি রুপি। অন্য জাতীয় দলে খেলা খেলোয়াড়দের বেতন ৩ লাখ রুপি পর্যন্ত। উসমান বলছিলেন, ‘আমাদের এখানে ডলার সংকট চলছে। আমরা খেলে দেড় থেকে তিন লাখ রুপি বা কিছু বেশি পেয়ে থাকি। যারা জাতীয় দলের বাইরে তারা ৭০ হাজার রুপি বা কম পেয়ে থাকে। সেখানে বাংলাদেশে শুনেছি খেলোয়াড়রা অনেক টাকা পেয়ে থাকে। এটা ভালো দিক।’
পাকিস্তানে ক্রিকেট জনপ্রিয় খেলা। তবে উসমানের ভাষায় ফুটবল একটু একটু করে এগোচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে খেলায় ফুটবলের প্রতি ঝোঁক বেড়েছে সমর্থকদের।
পাকিস্তান জাতীয় দলের জার্সিতে ২১টি ম্যাচ খেলা ২৯ বছর বয়সী মিডফিল্ডার আলী উজাইর মাহমুদ কিন্তু উসমানের মতোই ইতিবাচক। গত বছর পাকিস্তানের ক্লাব থেকে ধারে খেলেছেন মালদ্বীপের ক্লাব হোয়ানদেধু এফসিতে। ফয়সালাবাদের ফুটবলার বললেন, ‘আমাদের ফেডারেশন ফুটবলের প্রতি বেশ জোর দিয়েছে। আমরা আশা করছি, ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবো। ঘরোয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উন্নতি করতে পারবো। আর বাংলাদেশে খেলতে এসে নিজেদের মেলে ধরার চেষ্টা করবো। যেন সুনাম অর্জন করা যায়।’
ফিফা র্যাংঙ্কিয়ে ১৯৯তম স্থানে থাকা পাকিস্তান কিছু দিন আগে নিষিদ্ধ ছিল। বিপরীতে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ শিরোপা জিতেছে। ভারত-মালদ্বীপ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব চিনিয়েছে। সেখানে পাকিস্তানের এখনও ট্রফি না জেতাটা উসমানদের জন্য কষ্টকর। তবু সেই ব্যবধান ঘোচানোর স্বপ্ন নিয়েই ঢাকার মাঠে নামছেন উসমানরা। এই মাঠেই যদি তারা নিজেদের ছাপ ফেলতে পারেন, তাহলে সেটাই হবে সীমান্ত ছাড়িয়ে ফুটবলের নতুন গল্প।