‘সেটপিস থেকে ২০-২৫ বছরে এমন গোল দেখিনি’

সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে পাকিস্তানকে হারানোর নায়ক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী রোনান সুলিভান। তার করা জোড়া গোলে বাংলাদেশের তিন পয়েন্ট নিশ্চিত হয়েছে।

জোড়া গোল করে দলকে জিতিয়ে প্রশংসায় ভাসছেন এই স্ট্রাইকার। বিশেষ করে তার নেওয়া অসাধারণ বাঁকানো ফ্রি-কিকের গোল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তুলেছে। এমন গোল গত দুই যুগে কেউ দেখেছে কিনা—এ নিয়েও সন্দিহান অনেকে।

দেশের অভিজ্ঞ কোচ জুলফিকার মাহমুদ মিন্টু সরাসরি বলেছেন, ‘যতদূর মনে পড়ে, আমি এই ধরনের—এত দূর থেকে, এত টপ ক্লাস সেটপিসে গোল বাংলাদেশে আর দেখিনি। গত ২০-২৫ বছরে এমন গোল দেখেছি বলে মনে পড়ে না।’

রোনান প্রথম ম্যাচেই অসাধারণ খেলেছেন। জাতীয় দলে যোগ্য নম্বর নাইনের সংকট দীর্ঘদিনের। আগামীতে রোনান এই সংকট ঘুচিয়ে দিতে পারেন বলে বিশ্বাস মিন্টুর। তিনি বলেন, ‘ওদের (সুলিভান ব্রাদার্স) নিয়ে আলোচনা অনেক দিন ধরেই ছিল এবং তারা এখন একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই খেলছে। আমি শুধু বলবো, সে (রোনান) একজন অসাধারণ খেলোয়াড়। ওর গোলগুলো দেখেছি, বিশেষ করে ফ্রি-কিকটা অসাধারণ। এটাই একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত দক্ষতা। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কিংবা লিওনেল মেসিরা নিয়মিত অনুশীলনের বাইরেও ফ্রি-কিক স্পেশালিস্ট হওয়ার জন্য আলাদা ট্রেনিং করেন। আমার মনে হয়েছে, রোনান তার ব্যক্তিগত দক্ষতা দিয়েই দলকে জিতিয়েছে।’

রোনানের হেড থেকে করা দ্বিতীয় গোলটিও মিন্টুর চোখে দারুণ। এর মধ্য দিয়ে নিজের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার প্রমাণ রেখেছেন তিনি। মিন্টুর ভাষায়, ‘ওর দ্বিতীয় গোলটিও দেখেন—ওর মধ্যে স্বাভাবিক নম্বর নাইনের সামর্থ্য আছে। মার্কারকে কীভাবে ফাঁকি দিতে হয়, আবার কীভাবে ব্যবহার করতে হয়- সেটা সে জানে। একজন নম্বর নাইনের নিজের ইচ্ছা লুকিয়ে রাখার দক্ষতা থাকতে হয়। মার্কারকে বুঝতে না দিয়ে, তার মনের ভেতরে কী আছে সেটা গোপন রাখা জরুরি। দ্বিতীয় গোলের আগে সে ডিফেন্ডারকে ধোঁকা দিয়েছে। অফ দ্য বল মুভমেন্টে পজিশন তৈরি করে ঠান্ডা মাথায় ফিনিশ করেছে।’

এরপর ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মিন্টু। তিনি বলেছেন, ‘সে দুর্দান্ত খেলোয়াড়। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ জাতীয় দলের জন্য সম্পদ হতে পারে। আমি বর্তমানের কথা বলছি না, কারণ এখনও সে বড় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলেনি। তারপরও সকালের সূর্য অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়। তাই বলছি, আগামীর জন্য সে ভালো অপশন হয়ে উঠতে পারে।’

রোনান সুলিভান।‘সুলিভান ব্রাদার্স’ যেভাবে বাংলাদেশ দলে

যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক ফুটবল দম্পতি ব্র্যান্ডন সুলিভান ও হাইক সুলিভানের চার ছেলে। চার জনই ফুটবলকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিয়েছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নানি সুলতানা আলমের মাধ্যমে।

বড় দুই ভাই কুইন সুলিভান ও কাভান সুলিভান খেলছেন মেজর সকার লিগের ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের মূল দলে। এর মধ্যে ২১ বছর বয়সী অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার কুইন যুক্তরাষ্ট্র অনূর্ধ্ব-২০ দলের হয়ে ১৯টি ম্যাচ খেলেছেন। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের ক্যাম্পেও ডাক পান এবং তিনটি প্রীতি ম্যাচ খেলেন।

১৬ বছর বয়সী কাভানও একই ক্লাবে গত দুই বছর ধরে খেলছেন। চার ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট হলেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে নিয়মিত। রোনান ও ডেক্লান সুলিভান যমজ ভাই। তাদের বেড়ে ওঠাও ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়ন অ্যাকাডেমিতে।

১৮ বছর বয়সী এই দুই ভাই অবশ্য অন্য ভাইদের মতো যুক্তরাষ্ট্রকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেননি। তারা লাল-সবুজ জার্সিতেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চান। বাংলাদেশের হয়ে খেলার প্রক্রিয়া শুরু হয় গত বছর।

তাদের আগ্রহ জানতে পেরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন রোনান ও ডেক্লানের বাংলাদেশি পাসপোর্টের প্রক্রিয়া শুরু করে। অবশেষে সাফের এই বয়সভিত্তিক আসরের জন্য তাদের দেশে আনা হয়। আর অভিষেক ম্যাচেই রোনান নিজের জাত চিনিয়েছেন। ডেক্লানের অবশ্য এখনও পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলা হয়নি।

তবে ম্যাচ শেষে দুই ভাই যেভাবে লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে মালদ্বীপের জাতীয় স্টেডিয়ামের গ্যালারির সামনে গিয়ে উচ্ছ্বাসে মেতেছিলেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।