প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপ ফুটবল আমাদের অসংখ্য গোল উপহার দেয়। বেশিরভাগ গোল উদযাপিত হয়, প্রশংসা কুড়ায়, তারপর পরবর্তী ম্যাচের উত্তেজনায় হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু গোল স্মৃতি থেকে কখনও মুছে যায় না। থাকে অমলিন। চোখধাঁধানো সেসব গোল এমন নানন্দিকতা সৃষ্টি করে যা পরে ফুটবল রূপকথারই অংশ হয়ে যায়।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই গোলগুলোকেই খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। যেসব মুহূর্ত আজও থামিয়ে দেয় সময়। এবার দেখে নেওয়া যাক বিশ্বকাপ ইতিহাসের ১০টি অবিস্মরণীয় গোলের গল্প।
১. পেলে, ব্রাজিল বনাম সুইডেন (১৯৫৮)
বিশ্বকাপের মতো মঞ্চ যেখানে কিশোরদের বাস্তবতা শেখায়, সেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলে। তাও আবার ফাইনালের মতো স্নায়ু চাপের ম্যাচে! মাত্র ১৭ বছর বয়সে নিজের আগমনী বার্তা দেন তিনি। সেই বিশ্বকাপই জন্ম দিয়েছিল ব্রাজিলের সর্বকালের সেরা কিংবদন্তির।
১৯৫৮ সালের ২৯ জুন বিশ্বকাপের ফাইনালে স্বাগতিক সুইডেনকে ৫-২ গোলে হারিয়ে শিরোপা জেতে ব্রাজিল। ম্যাচটিতে জোড়া গোল করেন পেলে। ৫৫ মিনিটে তার প্রথম গোলটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃত। ওই গোলের সময় তিনি প্রথমে বলটি এক ডিফেন্ডারের মাথার ওপর দিয়ে তুলে দেন, এরপর ভলিতে জড়িয়ে দেন জালে। তার পর তো পেলে হয়ে ওঠেন ‘ও রেই’— অর্থাৎ ফুটবল সম্রাট।
২. কার্লোস আলবার্তো, ব্রাজিল বনাম ইতালি (১৯৭০)
কিছু গোল ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের, কিছু গোল দলগত শিল্পের। ১৯৭০ সালের ফাইনালে ব্রাজিলের গোলটি ছিল নিখুঁত দলগত ফুটবলের প্রতীক। একের পর এক পাসে ইতালির রক্ষণদুর্গ ভেঙে দেওয়ার পর পেলের পাস পেয়ে কার্লোস আলবার্তো প্রথম স্পর্শেই জোরালো শটে জালে কাঁপান। ৮৬ মিনিটের সেই গোল এখনও দলগত আক্রমণের সেরা উদাহরণ হিসেবে স্বীকৃত।
১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ডিয়েগো ম্যারাডোনার এই গোল আইকনিক এক মুহূর্ত। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একার দৌড়ে তিনি যেন ফুটবলকে রূপ দিয়েছিলেন শিল্পকর্মে। নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে শুরু করা অভিযানের শেষে ইংল্যান্ডের একের পর এক খেলোয়াড়কে কাটিয়ে জালে বল পাঠিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন ফুটবল ঈশ্বর। পরে যে গোলটি ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ‘হ্যান্ড অব গড’-এর বিতর্ক ছাপিয়ে ম্যাচটির সবচেয়ে উজ্জ্বল স্মৃতি হয়ে আছে ম্যারাডোনার সেই অবিশ্বাস্য গোল।
ম্যাচটিতে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল করে এরই মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছিলেন কিংবদন্তি নম্বর টেন। তবে কয়েক মিনিট পর করা তার অবিশ্বাস্য দৌড় ও নিখুঁত ফিনিশিং তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
নিজেদের অর্ধে বল পাওয়ার পর একটি দুর্দান্ত মুভে ইংল্যান্ডের পিটার রিড ও পিটার বেয়ার্ডসলিকে পরাস্ত করেন ম্যারাডোনা। এরপর ভারসাম্য, গতি ও বল নিয়ন্ত্রণের মনমুগ্ধকর প্রদর্শনীতে একের পর এক ইংলিশ ডিফেন্ডারকে পেছনে ফেলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে কাটিয়ে বল জালেও জড়িয়ে দেন।
কোয়ার্টার ফাইনাল কখনও সহজ হয় না। সেখানে জায়গার চেয়ে লড়াই বেশি থাকে। ১৯৯৮ সালের সেই আসরে ফ্রাঙ্ক ডি বোয়ারের দীর্ঘ পাস থেকে বার্গক্যাম্পের গোলটি ছিল নিখুঁত শিল্পকর্ম। প্রথম স্পর্শে বল নিয়ন্ত্রণ, দ্বিতীয় স্পর্শে ডিফেন্ডারকে কাটানো এবং তৃতীয় স্পর্শে নিখুঁত ফিনিশিং। ৮৯ মিনিটের সেই এক গোল আর্জেন্টিনার স্বপ্ন ভেঙে দেয় এবং নেদারল্যান্ডসকে তুলে দেয় সেমিফাইনালে।
৫. রোনালদিনহো, ব্রাজিল বনাম ইংল্যান্ড (২০০২)
২০০২ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে রোনালদিনহোর সেই অবিশ্বাস্য ফ্রি-কিক আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ও আলোচিত গোল হয়ে আছে।
গোলটির পর কয়েক দিন ধরে ফুটবল বিশ্বে তুমুল বিতর্ক চলে। প্রশ্ন উঠে, ব্রাজিলের এই জাদুকর কি সত্যিই বলটিকে লক্ষ্যে পাঠাতে চেয়েছিলেন, নাকি সেটি ছিল ভাগ্যের সহায়তায় পাওয়া এক বিস্ময়কর গোল?
পরে ব্রাজিল তারকা বলেছিলেন, ‘আমি যখন শট নিয়েছিলাম, তখন অবশ্যই গোল করার চেষ্টা করছিলাম। তবে ঠিক ওই জায়গায় বল পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল না।’
৬. ম্যাক্সি রদ্রিগেজ, আর্জেন্টিনা বনাম মেক্সিকো (২০০৬)
শেষ ষোলোর ম্যাচে নির্ধারিত সময়ের খেলার স্কোর ছিল ১-১। আর্জেন্টিনা-মেক্সিকোর কেউই স্কোরলাইনে হেরফের ঘটাতে পারেননি। ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে সেখানেই
৯৮ মিনিটের গোলে উঁচু হয়ে আসা একটি বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাঁ পায়ের ভলিতে এমন এক শট নেন, যা দূরের জালে গিয়ে আঘাত করে। সেই গোল আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ভলি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
৭. জিওভান্নি ভ্যান ব্রঙ্কহর্স্ট, নেদারল্যান্ডস বনাম উরুগুয়ে (২০১০)
সেমিফাইনালে খেলোয়াড়রা ঝুঁকি কম নেন। কিন্তু নেদারল্যান্ডসের ভ্যান ব্রঙ্কহর্স্ট অন্যরকম ছিলেন। ডিফেন্স থেকে ক্লিয়ার হওয়া একটি বল পেয়ে প্রায় ৩৫ গজ দূর থেকে বাম পায়ের দুর্দান্ত শটে লক্ষ্যভেদ করেন তিনি। বলটি আকাশে উঠে বাঁক নিয়ে বার ঘেঁষে ঢুকে যায় জালে। ১৭ মিনিটের পরে তো সেমির ম্যাচটিতে উরুগুয়ের বিপক্ষে ৩-২ গোলে জয় পায় নেদারল্যান্ডস।
৮. আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, স্পেন বনাম নেদারল্যান্ডস (২০১০)
কলম্বিয়ার সেরা বিশ্বকাপ সাফল্য ২০১৪ সালে। সেবারই হামেস রদ্রিগেজের জাদুকরী পারফরম্যান্সে তারা কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে। সেবার টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছিলেন তিনি। সেখানে তার করা একটি গোল এখনও আইকনিক মুহূর্ত হয়ে আছে। পরে তো সেটি তাকে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে দেয়।
সেই গোলটি ছিল শেষ ষোলো পর্বের। ফুটবল মাঠে শিল্পকর্ম বলতে যা বোঝায়, হামেস রদ্রিগেজের সেই গোল ছিল ঠিক তেমনই। উরুগুয়ের বিপক্ষে করা অবিশ্বাস্য এই গোলের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি জিতেছিলেন ফিফার পুসকাস পুরস্কার। ব্রাজিল বিশ্বকাপে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের অন্যতম সেরা মুহূর্ত ছিল এটি। যা গত এক দশকে কোনো দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলারের অন্যতম স্মরণীয় পর্ব।
২৮ মিনিটের সেই গোলটিতে প্রথমে বল নিখুঁতভাবে বুক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেন হামেস। এরপর কোনো সময় নষ্ট না করে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত এক দূরপাল্লার শট নেন। বজ্রগতির সেই শট উরুগুয়ের গোলরক্ষক ফার্নান্দো মুসলেরাকে পরাস্ত করে জালে আশ্রয় নেয়। জন্ম দেয় বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম নান্দনিক গোলের।
রাশিয়া বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের লড়াই তখন রীতিমতো রোমাঞ্চকর। ঠিক তখনই পাভার্দ জন্ম দেন জাদুকরী মুহূর্তের। ৫৭ মিনিটে তার ডান পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে নেওয়া ভলি এমনভাবে বাঁক নিয়েছিল যে গোলরক্ষকের পক্ষে তা ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। ওই গোলে ফরাসিরা শুধু ম্যাচে সমতা ফেরায়নি, ৪-৩ ব্যবধানে জয়ী হয়ে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ের পথও প্রশস্ত করে।