কাতারে মিলেছিল সঠিক পূর্বাভাস, এবার স্পেনকে চ্যাম্পিয়ন দেখছেন ঢাবি অধ্যাপক

ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই আবেগ, উন্মাদনা আর অনিশ্চয়তার এক অনন্য মঞ্চ। কোটি কোটি সমর্থক যখন প্রিয় দলের জয় নিয়ে স্বপ্ন বুনছেন, তখন সংখ্যার ভাষায় সেই স্বপ্নের সম্ভাব্য পরিণতি আগেভাগেই তুলে ধরছেন বাংলাদেশের একজন পরিসংখ্যানবিদ ও ডেটা সাইন্টিস্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (আইএসআরটি)-এর অধ্যাপক ড. মো. হাসিনুর রহমান খান ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের ১০৪টি ম্যাচের পূর্ণাঙ্গ পূর্বাভাস প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠেয় এই আসরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রতিটি ধাপের ফলাফল তুলে ধরা হয়েছে তাঁর প্রকাশিত পূর্বাভাস সিটে।

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ড. হাসিনুর রহমান খান তাঁর সাবজেক্টিভ প্রবাবিলিটিভিত্তিক ৬৪টি ম্যাচের ভবিষ্যৎবাণী প্রকাশ করেছিলেন ২০ নভেম্বর ২০২২। সেখানে তিনি শতভাগ সঠিকভাবে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, ফ্রান্সকে রানার-আপ এবং এই দুই দলকেই ফাইনালিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। বিশ্বকাপ শেষে তাঁর সেই পূর্বাভাসের সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের অসাধারণ মিল দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়।

চার বছর পর আবারও তিনি হাজির হয়েছেন নতুন এক পূর্বাভাস নিয়ে। গত ১০ জুন তিনি তার ২০২৬ বিশ্বকাপের পূর্ণাঙ্গ পূর্বাভাসটি প্রকাশ করেন তার ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুক ওয়ালে। প্রকাশিত তাঁর ২০২৬ বিশ্বকাপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে স্পেন। ফাইনালে স্পেনের প্রতিপক্ষ হবে আর্জেন্টিনা। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১৯ জুলাই নিউইয়র্ক/নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিতব্য অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জিতবে স্পেন। প্রথম সেমিফাইনালটিতে  ফ্রান্স স্পেনের মুখোমুখি হবে এবং স্পেনের কাছে হেরে ফ্রান্স সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেবে|  দ্বিতীয় সেমিফাইনালটিতে ব্রাজিল আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে এবং আর্জেন্টিনার কাছে হেরে ব্রাজিল সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেবে| তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফ্রান্স ব্রাজিলকে পরাজিত করে তৃতীয় স্থান দখল করবে। ব্রাজিল হবে চতুর্থ।

ড. হাসিনুর রহমান খানের প্রকাশিত পূর্বাভাসে শুধু চ্যাম্পিয়ন-রানারআপের নামই নয়, বরং ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাটের বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বের অবস্থান, সেরা তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলগুলোর অগ্রগতি, রাউন্ড অফ ৩২, রাউন্ড অফ ১৬, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রতিটি ম্যাচের ফলাফলের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। এদিকে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হতে পারে মরক্কো, ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং পর্তুগালকে| সেই প্রেডিকশন অনুযায়ী রাউন্ড অফ ১৬ থেকে বিদায় নিতে হতে পারে জার্মানি, ক্রোয়েশিয়া, মেক্সিকো এবং সুইজারল্যান্ড এর মত বড় বড় দলগুলোকে| অপ্রত্যাশিতভাবে, এর আগের রাউন্ড, রাউন্ড অফ ৩২ থেকে বিদায় নিতে হতে পারে জাপানকে, মরক্কোর সাথে হেরে, নেদারল্যান্ডকে, ব্রাজিলের সাথে হেরে| আর যদি তাই হয় তবে এশিয়ার জায়ান্ট জাপানকে এবং নেদারল্যান্ডকে হারাতে বসেছি রাউন্ড অফ ৩২ থেকে ২৮ শে জুনের আগেই। 

ড. খান মনে করেন, "ফুটবলে বিস্ময় থাকবে, অঘটন ঘটবে, শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তাও থাকবে। কিন্তু প্রতিটি ম্যাচই একেকটি ডেটা পয়েন্ট। দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, ফিফা র‍্যাঙ্কিং, ঐতিহাসিক সাফল্য, টুর্নামেন্টে ধারাবাহিকতা এবং প্রতিপক্ষের শক্তি বিশ্লেষণ করলে কিছু সম্ভাব্য চিত্র সামনে আসে। পরিসংখ্যান কখনো শতভাগ নিশ্চয়তা দেয় না, কিন্তু সম্ভাবনার সবচেয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারে। এটি তথ্য-উপাত্ত, পরিসংখ্যান এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সম্ভাব্য ফলাফল অনুমানের একটি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা।"

বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে ইনজুরি, লাল কার্ড, কৌশলগত পরিবর্তন কিংবা মুহূর্তের অনুপ্রেরণা পুরো চিত্রই বদলে দিতে পারে। তবে কোনও পূর্বাভাসই অকার্যকর নয়। তবু ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট ও চ্যাম্পিয়ন সঠিকভাবে অনুমান করতে পারার ঘটনা ড. হাসিনুর রহমান খানের নতুন পূর্বাভাসকে বিশেষ গুরুত্ব এনে দিয়েছে।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপে আদৌ কি স্পেন শিরোপা জিতবে? ফ্রান্স কি আবারও ফাইনালে উঠবে? ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা কি শেষ চারে নিজেদের জায়গা করে নেবে? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী জুলাইয়ে। তবে এরই মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট-বাংলাদেশের একজন পরিসংখ্যানবিদ আবারও বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চকে সংখ্যার ভাষায় পড়ার চেষ্টা করেছেন। আর সেই প্রচেষ্টা দেখিয়ে দিয়েছে, আবেগের এই খেলাতেও তথ্য ও পরিসংখ্যানের নিজস্ব এক শক্তিশালী ভাষা রয়েছে। এখন অপেক্ষা শুধু সময়ের-দেখার জন্য, কাতারের মতো এবারও কি বিশ্বকাপের মঞ্চে মিলে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপকের সংখ্যাভিত্তিক পূর্বাভাসের সঙ্গে বাস্তবতার গল্প।

বিশ্বকাপ পূর্বাভাসের বাইরেও ড. হাসিনুর রহমান খানের তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ সাম্প্রতিক সময়ে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে। ২০২৬ সালের বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে তিনি নির্বাচনের আগেই ভোটের প্রবণতা ও জোট ভিত্তিক সম্ভাব্য আসন সংখ্যা, ভোটের হার এবং অন্যান্য ফলাফল নিয়ে একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক পূর্বাভাস প্রকাশ করেন, যা পরবর্তীতে প্রকৃত ফলাফলের সঙ্গে অসাধারণ সাধারণভাবে মিলে যায়। একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন উপলক্ষেও পরিচালিত জরিপ ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন প্যানেল ও প্রার্থীদের সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে পূর্বাভাস প্রদান করেছিলেন, যা নির্বাচনী বাস্তবতার সঙ্গে ব্যাপক মিল পাওয়ায় শিক্ষার্থী মহল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষভাবে আলোচিত হয়। ফলে বিশ্বকাপ, জাতীয় নির্বাচন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই তাঁর কাজ একটি বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে: সঠিকভাবে সংগৃহীত তথ্য, উপযুক্ত পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি এবং প্রেক্ষাপটভিত্তিক বিশ্লেষণ অনেক সময় জনমতের অন্তর্নিহিত প্রবণতাকে বিস্ময়করভাবে উন্মোচিত করতে পারে। তবে ড. খান নিজেই বারবার স্মরণ করিয়ে দেন, "পরিসংখ্যান সম্ভাবনার ভাষা বলে, নিশ্চয়তার নয়; তবুও তথ্যের ভিত্তিতে করা পূর্বাভাস অনুমাননির্ভর মতামতের চেয়েও অধিকতর যৌক্তিক ও পরীক্ষাযোগ্য।"