ইতিহাস গড়ে বিশ্বকাপে প্রথম পয়েন্ট পেলো কানাডা

টরন্টো স্টেডিয়ামের গ্যালারি তখন লাল সমুদ্র। ঘড়িতে ৭৮ মিনিট। বদলি হিসেবে মাঠে নামা কাইল লারিন বক্সের কিনারে বল পেলেন, ঘুরলেন, আর নিচু একটা শট মারলেন জালের কোণ বরাবর। পুরো টরন্টো যেন এক মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস বন্ধ করে রেখেছিল— তারপর বিস্ফোরণ।

কানাডা এভাবেই ২০২৬ বিশ্বকাপে তাদের তৃতীয় বিশ্বকাপ অভিযানে প্রথমবারের মতো পয়েন্ট অর্জন করলো। ১৯৮৬ ও ২০২২— দুটি বিশ্বকাপে মোট ছয় ম্যাচে ছয় হার। সেই দীর্ঘ শূন্যতার অবসান ঘটলো আজ, নিজেদের মাঠে, নিজেদের মানুষদের সামনে। 

সুযোগ নষ্টের প্রথমার্ধ  

শুরু থেকেই আক্রমণে এগিয়ে ছিল কানাডা, কিন্তু ফিনিশিংয়ে সেই চিরপরিচিত কষ্ট। ১৭ মিনিটে জোনাথান ডেভিড গোলরক্ষককে একা পেয়েও শট মারলেন সোজা তার গায়ে। সুযোগ হাতছাড়া, দর্শকদের দীর্ঘশ্বাস। 

ঠিক চার মিনিট পরেই বসনিয়া সেই ভুলের মূল্য আদায় করে নিলো। ইভান বাসিকের বিপজ্জনক কর্নারে সিয়াদ কোলাসিনাচের হেড ফ্লিকে বল পেলেন জোভো লুকিচ এবং গোলরক্ষক ক্রেপোকে হতবাক করে হেডে বল জালে পাঠালেন। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম গোলেই স্বাগতিকদের স্তব্ধ করে দিলেন এই স্ট্রাইকার। বসনিয়া এগিয়ে গেল ১-০। 

এরপর বাকি প্রথমার্ধে কানাডা একের পর এক আক্রমণ করলো, কিন্তু বসনিয়ার রক্ষণ দেওয়ালের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। ৩২ মিনিটে তানি ওলুয়াসেয়িও বক্সের ভেতর থেকে সুযোগ পেয়ে বল পাঠালেন বারের উপর দিয়ে। 

কানাডা বনাম বসনিয়া হার্জেগোভিনা ম্যাচ (ছবি রয়টার্স)

দ্বিতীয়ার্ধ: গোললাইন নাটক ও লারিনের মুক্তি

দ্বিতীয়ার্ধে কানাডার চাপ আরও বাড়লো। ৫৩ মিনিটে ইউস্তাকিওর পাস থেকে লারেয়া গোলরক্ষককে পরাস্ত করে শট মারলেন, কিন্তু কোলাসিনাচ নিজের শরীর ছুঁড়ে দিয়ে বল ব্লক করলেন, বল ক্রসবারে লেগে ফিরে এলো। বসনিয়ার অধিনায়কের সেই অবিশ্বাস্য ক্লিয়ারেন্সে স্টেডিয়ামের পুরো লাল গ্যালারি মাথায় হাত দিলো। 

৬০ মিনিটের আশপাশে কোচ জেস মার্শ তিনটি বদলি একসঙ্গে মাঠে নামালেন। এলেন প্রমিজ ডেভিড ও আলী আহমেদ। এরপর ৭৫ মিনিটে মাঠে এলেন কাইল লারিন। 

৭৮ মিনিটে সেই মুহূর্ত এলো। প্রমিজ ডেভিডের চালাক ফ্লিক পেলেন লারিন বক্সের কিনারে। তিনি ঘুরলেন, নিচু একটা শট মারলেন বটম কর্নারে, বল জালে। টরন্টো জেগে উঠলো আগ্নেয়গিরির মতো।

শেষের স্নায়ুযুদ্ধ 

সমতার পরে ম্যাচ খুলে গেলো। কানাডা চাইলো জয়, বসনিয়া চাইলো বেঁচে থাকতে। ইনজুরি টাইমে লারিন প্রায় নিশ্চিত গোলের সুযোগ পেলেন, কিন্তু তারিক মুহারেমোভিচ ষষ্ঠ গজের ভেতর থেকে ডাইভিং ব্লকে বল সরিয়ে দিলেন। বসনিয়া রক্ষা পেলো, কানাডার জয় হলো না। 

রেফারির শেষ বাঁশিতে স্কোর থামলো ১-১।

ইতিহাসের পাতায় একটি ড্র 

কানাডা এর আগে ১৯৮৬ ও ২০২২ বিশ্বকাপে মোট ছয় ম্যাচের সবকটিতেই হেরেছিল। আজকের এই ১ পয়েন্টকে তাই বলা চলে চল্লিশ বছরের অপেক্ষার ইতি। 

দলনেতা আলফোনসো ডেভিসের অনুপস্থিতিতেও কানাডা যেভাবে চাপ সামলে পিছিয়ে পড়ে ফিরে এলো, তাতে গ্রুপ পর্বে আরও এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন এখন আর কেবল স্বপ্ন নয়। আর বসনিয়া? তারাও মাঠ ছাড়লো মাথা উঁচু রেখে — শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়াই করে পয়েন্ট বাঁচিয়ে। 

ম্যাপেল পাতার দেশে এই রাতটা দীর্ঘদিন মনে থাকবে। 

স্কোরলাইন: কানাডা ১ — বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ১
(কাইল লারিন— ৭৮', জোভো লুকিচ— ২১')