উত্তর আমেরিকার হিমেল হাওয়া আর ৪৩ হাজার দর্শকের গর্জন একসঙ্গে মিশে যখন এক হয়, তখন বুঝতে হয় — বিশ্বকাপ এসে গেছে। মেক্সিকোর মাঠ পেরিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মহোৎসব এবার পা রাখলো ম্যাপেল পাতার দেশ কানাডায়। স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টায়, বাংলাদেশ সময় শুক্রবার (১২ জুন) রাত ১১.৩০টায় টরন্টো স্টেডিয়ামে (বিএমও ফিল্ড) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ইতিহাস রচনা করলো কানাডা। পুরুষ ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম ঘরের মাঠে কোনও ম্যাচ আয়োজনের গৌরব অর্জন করলো দেশটি।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা বিবিসির ধারাভাষ্য অনুযায়ী, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিল সুর, ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এক অপূর্ব কোলাজ— যা বিশ্বকে এক সুতোয় বেঁধেছে। ফিফার ভাষায়, আয়োজনটি ছিল ‘কানাডার নানা সম্প্রদায়, সমৃদ্ধ বৈচিত্র্য এবং ফুটবলের মহোৎসব’।
ফ্যাটবয় স্লিম থেকে আদিবাসী ঐতিহ্য: যেভাবে শুরু হলো উৎসব
স্টেডিয়ামের সাউন্ড সিস্টেমে যখন ফ্যাটবয় স্লিমের ‘Right Here, Right Now’-এর রিমিক্স বেজে উঠলো, তখনই গ্যালারির হাজার হাজার দর্শকের ধমনীতে বয়ে গেলো উত্তেজনার ঢেউ।
তবে মূল আয়োজন শুরু হলো শিকড়ের সম্মানে। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদিবাসী কানাডীয় লোক ও কান্ট্রি সংগীতশিল্পী উইলিয়াম প্রিন্স মঞ্চে উঠলেন, আর তার চারপাশে রঙিন পোশাকে ঘুরতে লাগলেন আদিবাসী শিল্পীরা— কানাডার প্রায় ২০ লাখ আদিবাসী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। সুর, ঐতিহ্য আর মাটির গন্ধ মিলিয়ে এক মায়াবী পরিবেশ ছড়িয়ে পড়লো পুরো স্টেডিয়ামে।
লাল ট্র্যাকস্যুট, সোনালী বল আর তারকাদের মেলা
ঐতিহ্যের আবহ থেকে অনুষ্ঠান রূপ নিলো আধুনিক জাঁকজমকে। একদল নৃত্যশিল্পী লাল ট্র্যাকস্যুট পরে এক বিশাল সোনালী বলের আবরণ সরিয়ে উন্মোচন করলেন কানাডীয় পপ তারকা অ্যালেসিয়া কারাকে। তিনি ‘Wild Things’ গেয়ে মাঠ মাতালেন, আর তার চারপাশে ভেসে উঠলো মুজ, তিমিসহ কানাডার বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর শিল্পকর্ম— কানাডার দশটি প্রদেশকে সম্মান জানিয়ে।
এরপর মঞ্চে এলেন কানাডীয় শিল্পী নোরা ফাতেহি— মরক্কান বংশোদ্ভূত, টরন্টোতে জন্মানো, বলিউডে পরিচিত এই নৃত্যশিল্পী তার ঘরের শহরে ফিরে মঞ্চ নামালেন আলাদা উত্তাপে। তার সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশি-আমেরিকান ডিজে-প্রযোজক সঞ্জয় এবং ফরাসি শিল্পী ভেজেড্রিম — তারা মিলে পরিবেশন করলেন বিশ্বকাপের অফিশিয়াল গান ‘Siir Siir’।
উল্লেখ্য, ঢাকায় জন্ম, আমেরিকায় বড় হওয়া সঞ্জয় দেব একসময় ঘরে বসে বিট বানাতেন— আর আজ সেই বিট বাজলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া মঞ্চে।
উৎসবের রঙ আরও চড়ালেন জেসি রেইয়েজ এবং ফিলিস্তিনি শিল্পী এলিয়ানা— তারা পরিবেশন করলেন বিশ্বকাপের আরেকটি অফিশিয়াল গান ‘Illuminate’।
বিশ্বখ্যাত জ্যাজ-পপ তারকা মাইকেল বুবলের উপস্থিতি গ্যালারিতে আনলো এক রোমান্টিক হাওয়া — যদিও বিবিসি রসিকতা করে লিখেছে, অনেক দর্শক মনে মনে হয়তো ভাবছিলেন উনি না আবার ক্রিসমাসের গান ধরে বসেন! অভিনেতা ও কমেডিয়ান উইল আর্নেটও মঞ্চে এলেন বিশ্বকাপ অ্যাম্বাসেডর হিসেবে।
জাতীয় সংগীত ও বিদায়ের সুর
আয়োজনের শেষভাগে এলো সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত। রকিং কিংবদন্তি অ্যালানিস মরিসেট গেয়ে উঠলেন কানাডার জাতীয় সংগীত, আর বসনিয়া-হার্জেগোভিনার জাতীয় সংগীত পরিবেশন করলেন আলেকসান্দার গাজিক।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষ হলো কিছুটা আচমকাভাবেই— তবে উৎসবের আঁচ থামেনি এতটুকু। স্টেডিয়ামের সাউন্ড সিস্টেমে বেজে উঠলো বন জোভির ‘Livin' on a Prayer’, আর গ্যালারির হাজারো কণ্ঠ সমস্বরে তুলে নিলো সেই সুর।
সুর ও সংস্কৃতির এই অবিস্মরণীয় রাত শেষে শুরু হলো আসল লড়াই— স্বাগতিক কানাডা মুখোমুখি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার। ঘরের মাঠে এই প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে নামছে কানাডা। পুরো ম্যাপেল পাতার দেশ তাকিয়ে আছে সেই ইতিহাসের দিকে।









