‘রোনালদোকে মাঠ থেকে তোলার সাহস কোচের নেই’ 

বিশ্বকাপের মঞ্চে আগের দিনই আলো ছড়িয়েছেন ফুটবলের অন্যতম সেরা সুপারস্টাররা। সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে কিলিয়ান এমবাপ্পে বনে গেছেন ফ্রান্সের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। এরপর নরওয়ের আর্লিং হালান্ড ইরাকের বিপক্ষে জোড়া গোল করে রাঙিয়েছেন নিজের বিশ্বকাপ অভিষেক। আর আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে লিওনেল মেসি ছুঁয়ে ফেলেছেন বিশ্বকাপে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ গোলের বিশ্বরেকর্ড। এছাড়া পর্তুগালের ম্যাচের পর ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দুই গোল করে হ্যারি কেইনও বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা নিয়ে গেছেন দশে। ফলে বুধবারের মঞ্চটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্য। কিন্তু চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অনুজদের এমন উড়ন্ত সূচনার দিনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। 

ডিআর কঙ্গোর বিরুদ্ধে পর্তুগালের ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে পুরো ৯০ মিনিট মাঠে থেকেও কোনও প্রভাব ফেলতে পারেননি ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। ফুটবল ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়ার সুবর্ণ সুযোগটি প্রথম ম্যাচেই হাতছাড়া করলেন তিনি। আর রোনালদোর এই নিষ্প্রভতার দিনে পর্তুগালের হেড কোচ রবার্তো মার্তিনেসের একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুটবল বিশ্বে বইছে সমালোচনার ঝড়। 

ম্যাচের ৮৩তম মিনিটে যখন পর্তুগাল গোলের জন্য মরিয়া, তখন কোচ মাঠ থেকে মিডফিল্ডার ভিতিনহাকে তুলে স্ট্রাইকার গনসালো রামোসকে নামান, কিন্তু পুরো ম্যাচে ফ্লপ থাকা রোনালদোকে মাঠেই রেখে দেন। 

বিবিসির রেডিও ফাইভ লাইভে ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় প্রিমিয়ার লিগের সাবেক স্ট্রাইকার ক্রিস সাটন কোচের এই সিদ্ধান্তকে ধুয়ে দিয়ে বলেন, “মার্তিনেসের এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত লজ্জাজনক। রোনালদো হয়তো শেষ মুহূর্তে জয়সূচক গোল এনে দিতে পারতেন, কিন্তু আজকে পুরো ম্যাচটি তার নাগালের বাইরে ছিল। আসলে কোচ তাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়ার সাহস পাননি। মার্তিনেস এখানে আসল ম্যানেজারের ভূমিকাই পালন করতে পারেননি।”

ম্যাচ শুরুর আগে সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক ওয়েইন রুনি বিবিসি ওয়ানে মজা করে বলেছিলেন যে, আগের দিন মেসি-এমবাপ্পেদের গোলবন্যা দেখে রোনালদো নিশ্চয়ই ড্রেসিংরুমে রাগে ফুঁসছেন এবং আজ রাতে দুটি বা তিনটি গোল করে প্রমাণ করতে চাইবেন যে তিনি এখনও সেই শীর্ষ স্তরেই আছেন। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। পেদ্রো নেতোর ক্রসে জোয়াও নেভেসের ষষ্ঠ মিনিটের গোলে পর্তুগাল এগিয়ে গেলেও বিরতির ঠিক আগে ইয়োয়ান উইসা কঙ্গোকে সমতায় ফেরান। পুরো ম্যাচে ৭৫ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেও পর্তুগাল অন-টার্গেট শট নিতে পেরেছে মাত্র একটি, যা গোল হয়েছিল।

আল-নাসরের এই স্ট্রাইকার, যিনি ক্যারিয়ারে ১০০০ গোলের মাইলফলকের কাছাকাছি আছেন, দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্সিসকো কনসেইসাওয়ের পাস থেকে পরপর দুটি সহজ সুযোগ পেয়েছিলেন। প্রথমবার বল তার কিছুটা পেছনে থাকায় শট পোস্টের বাইরে মারেন এবং দ্বিতীয়বার কঙ্গোর ডিফেন্সের চাপে বল লক্ষ্যে রাখতে ব্যর্থ হন। এই নিয়ে বড় টুর্নামেন্টগুলোতে টানা ১০টি ম্যাচ গোলহীন কাটালেন রোনালদো। পুরো ম্যাচে ৯০ মিনিট খেলে মাত্র ২৫ বার বল স্পর্শ করেছেন তিনি, যা পুরো ম্যাচে খেলা পর্তুগালের যেকোনও আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।

রোনালদোর এই ‘অতি-মানবীয়’ উপস্থিতির কারণে দলের তরুণ খেলোয়াড়রা মনস্তাত্ত্বিক চাপে ভুগছেন বলে মনে করছেন সাবেক ফরাসি ডিফেন্ডার গায়েল ক্লিশি। তিনি বলেন, “মাঠে রোনালদোর মতো একজন মহাতারকা থাকলে তরুণরা অবচেতনভাবেই নিজেদের গুটিয়ে নেয় এবং সব আলো তার দিকে দিয়ে দেয়। প্রথম সুযোগটিতে কনসেইসাও নিজে শট না নিয়ে রোনালদোকে পাস দিতে গিয়েছিলেন শুধু তার স্টারডমের কারণে।” 

অপরদিকে ফক্স স্পোর্টসে সাবেক ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি বলেন, “দ্বিতীয় সুযোগটিতে রোনালদো যদি গোলপোস্টের সিক্স-ইয়ার্ড বক্সের দিকে দৌড়াতেন, তবে ডিফেন্ডাররা তাকে অনুসরণ করতো এবং ব্রুনো ফার্নান্দেস ফাঁকায় বল পেয়ে অনায়াসে গোল করতে পারতেন। কিন্তু নিজে গোল করার তীব্র ক্ষুধার কারণে রোনালদো পাসের লাইনে চলে আসেন। আমার কথা পরিষ্কার— দলকে গোল করতে হবে, আপনাকে একা নয়।”

ক্লিশি অবশ্য এর জন্য এককভাবে রোনালদোকে দায়ী করেননি। তিনি মনে করেন, এটিই একজন অতিমানবের মাঠে থাকার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, আর এখানেই কোচের দক্ষতার প্রয়োজন ছিল। ডাগআউটে মার্তিনেস সাহসিকতা দেখাতে না পারায় রোনালদোর রেকর্ড ছোঁয়ার দিনে পর্তুগালকে মাঠ ছাড়তে হয়েছে একরাশ হতাশা আর নিশ্চিত ২ পয়েন্ট হারানোর আফসোস নিয়ে।  

সূত্র: বিবিসি