১০০টিরও বেশি ম্যাচের লড়াই এবং ৪৬টি দলের বিদায়ের পর অবশেষে চূড়ান্ত হয়েছে বিশ্বকাপের ফাইনাল। আগামী রবিবার মধ্যরাতে এই জমকালো লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে বল দখলের আধিপত্য ও দুর্ভেদ্য রক্ষণভাগের স্পেন বনাম প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর কিংবদন্তি তারকা লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা।
বাজির বাজারে স্পষ্ট ব্যবধানে ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামবে স্পেন। মঙ্গলবার সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে যেভাবে হারিয়েছে লা রোহারা, তাতে এই পূর্বাভাসের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা কঠিন। ফরাসিদের বিরুদ্ধে ২-০ গোলের জয়টি কেবল একটি সাধারণ জয় ছিল না, বরং পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে সেরা ছন্দে থাকা ফ্রান্স দলের ওপর স্পেনের একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রমাণ ছিল।
কালশিতে স্পেনের জয়ের সম্ভাবনা এই মুহূর্তে ৫৮ শতাংশ। ড্রাফটকিংসের দর অনুযায়ী, স্পেনের কাপ জেতার বাজির দর -১৭৮, যেখানে আর্জেন্টিনার দর +১৫৪। এই দর কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মনে হলেও তা দুই সেমিফাইনালের চেয়েও বেশি একপেশে। বাজির এই হিসাব স্পেনকে বিশ্বকাপ জেতার ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশের বেশি এগিয়ে রাখছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের দ্য অ্যাথলেটিকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, স্পেনের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা ৫৯ শতাংশ। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলায় দুই দলেরই জয়ের পক্ষে বাজি ধরে অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ৯০ মিনিটের মধ্যে দুই দলেরই গোল করার সম্ভাবনা কয়েন টসের মতো সমান-সমান।
পরিসংখ্যানের একটি মজার দিক হলো, ফাইনালে নামার আগে স্পেন বিশ্রামের জন্য একটি অতিরিক্ত দিন পেয়েছে। আর বিগত ১৪টি বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালের ইতিহাস বলছে, যে দল অতিরিক্ত দিন বিশ্রাম পেয়েছে, তার মধ্যে ১৩ বারই তারা শিরোপা জিতেছে।
স্পেন ও ফ্রান্সের সেমিফাইনালটি ছিল ‘অনড় বস্তু’ (স্পেন) বনাম ‘অপ্রতিরোধ্য শক্তি’র (ফ্রান্স) লড়াই, যেখানে অনড় বস্তুকে ফরাসিরা স্পর্শই করতে পারেনি। আর এবারের ফাইনালটি হতে যাচ্ছে সেই ‘অনড় বস্তু’ বনাম ‘অবিনশ্বর শক্তি’র (আর্জেন্টিনা) লড়াই। এক অর্থে, কোনও দলেরই হার দেখাটা কঠিন। স্পেনের বিরুদ্ধে গোল করাটা প্রায় অসম্ভব মনে হচ্ছে। পুরো টুর্নামেন্টে তারা মাত্র একটি গোল হজম করেছে এবং সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে এমনভাবে ম্যাচ থেকে ছিটকে দিয়েছিল, যা কেউই আগে অনুমান করতে পারেনি।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা যেন এমন এক খলনায়ক (কিংবা দৃষ্টিকোণভেদে নায়ক), যারা কিছুতেই মরতে চায় না। লা আলবিসেলেস্তে’রা বারবার নিজেদের বিপদে ফেলছে এবং ঠিকই আবার উদ্ধার পাওয়ার পথ খুঁজে নিচ্ছে। এটি যেন তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যুক্তির দিক থেকে বাজির দর যেমন স্পেনের দিকে ঝুঁকছে, তেমনি স্পেনের পারফরম্যান্সও টুর্নামেন্টজুড়ে বেশি আকর্ষণীয় ছিল। তবে আবেগের দিক থেকে আর্জেন্টিনার ললাটে লেখা ‘ভাগ্যের দল’ তকমাটি অস্বীকার করা কঠিন।
ফ্রান্সের বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার করে ফাইনালে উঠলেও স্পেনের আসল পরীক্ষা হবে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। লা রোহারা যদি তা ধরে রাখতে পারে, তবে তারা একাধিক উপায়ে ইতিহাস গড়বে। দেশের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি তারা একটি আন্তর্জাতিক রেকর্ডও নিজেদের করে নেবে।
লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা টানা ৩৭টি ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে, যা ২০১৮-২০২১ সালের মধ্যে ইতালির গড়া রেকর্ডের সমান। ফাইনালে একটি জয় স্পেনকে এককভাবে এই রেকর্ডের চূড়ায় নিয়ে যাবে। ২০২৪ সালের ২২ মার্চ কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচে স্পেনের সর্বশেষ পরাজয় এসেছিল। আর প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে তাদের শেষ পরাজয় ছিল ২০২৩ সালের ২৮ মার্চ, ইউরো ২০২৪-এর বাছাই পর্বে স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে। সেটি ছিল প্রধান কোচ হিসেবে দে লা ফুয়েন্তের দ্বিতীয় ম্যাচ। এরপর স্পেন ইউরো ২০২৪ জিতেছে এবং এখন বিশ্বকাপের ফাইনালে লড়ছে।
দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেনের এই পথচলা এককথায় অসাধারণ। ২০২২ সালের হতাশাজনক বিশ্বকাপের পর তিনি দায়িত্ব নেন এবং লা রোহাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করেন, যা তাদের ইউরো ২০০৮, ২০১০ বিশ্বকাপ এবং ইউরো ২০১২ জয়ী সোনালি প্রজন্মের সাফল্যের প্রতিচ্ছবি। এবারের বিশ্বকাপে স্পেন মাত্র একটি গোল খেয়েছে এবং কোনও ম্যাচেই তারা পিছিয়ে পড়েনি। সেমিফাইনালের আগে ফ্রান্সও কোনও ম্যাচে পিছিয়ে পড়েনি, কিন্তু স্পেনের বিরুদ্ধে তারা ম্যাচের ৮২ মিনিটের আগে লক্ষ্যে একটি শটও নিতে পারেনি। ফরাসিদের বিরুদ্ধে ব্যালন ডি’অর জয়ী রদ্রি যখন মাঝমাঠে তার সেরা ছন্দে খেলছিলেন, তখন স্পেনকে একটি নিখুঁতভাবে পরিচালিত যন্ত্রের মতো দেখাচ্ছিল। আর্জেন্টিনার জন্য আরও আশঙ্কার কথা হলো, লামিনে ইয়ামালের কাছ থেকে সেরাটা না পেয়েও স্পেন ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
আর্জেন্টিনারও ২০১৯-২০২২ সালের মধ্যে টানা ৩৬টি ম্যাচ অপরাজিত থাকার নিজস্ব রেকর্ড ছিল। ২০২২ সালের সেই বিশ্বকাপ জয়ী দলের লিওনেল মেসিসহ অনেক খেলোয়াড়ই এবারও দলে আছেন। মেসি পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে নিজের জাদুকরি পারফরম্যান্স ধরে রেখেছেন। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২-১ গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও জিতে ফিরে আসা ম্যাচে তিনি নিজে গোল না করলেও দুটি গোলেই অ্যাসিস্ট করেছিলেন, যা তাকে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে রেখেছে। মেসি ও ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে উভয়েরই গোলসংখ্যা আটটি। তবে এমবাপ্পের তিনটি অ্যাসিস্টের বিপরীতে মেসির অ্যাসিস্ট চারটি। ফলে ফাইনালের আগে মেসি এগিয়ে আছেন এবং প্রথমবারের মতো গোল্ডেন বুট জেতার দৌড়ে ফেভারিট।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আরেকটি নাটকীয় ম্যাচে ৮৫ এবং ৯২ মিনিটে গোল করে জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল আলবিসেলেস্তেরা। ফাইনালে ওঠার পথে নকআউট পর্বের চারটি ম্যাচের মধ্যে দুটি ম্যাচে তাদের অতিরিক্ত সময়ে খেলতে হয়েছে এবং বাকি দুটি ম্যাচে তারা অ্যাড্রেনালিন জাগানো প্রত্যাবর্তন বা কামব্যাক করেছে। আর্জেন্টিনা যদি টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিততে পারে, তবে মেসির অনন্য কীর্তিতে আরও একটি গৌরবময় অধ্যায় যুক্ত হবে। ১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর বিশ্বের আর কোনও দল টানা দুবার বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি।