ছবিটি তোলা সত্যিই খুব কঠিন ছিল। এটুকু বলতে পারি, এটি ক্যামেরাবন্দি করতে আমাকে রীতিমতো রক্ত পানি করতে হয়েছিল, মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের স্পোর্টস পোর্টাল দ্য অ্যাথলেটিক-কে কথাগুলো বলছিলেন স্প্যানিশ ফটোগ্রাফার জোয়ান মনফোর্ট।
২০০৭ সালের ডিসেম্বরের ঘটনা। বার্সেলোনার হয়ে ক্যারিয়ার শুরু করার মাত্র তিন বছর পার করা ২০ বছর বয়সী তরুণ লিওনেল মেসির মুখোমুখি বসানো হয়েছিল মাত্র পাঁচ মাস বয়সী এক শিশুকে। সেই শিশুটি আর কেউ নন, আজকের ফুটবল বিশ্বের নতুন বিস্ময় লামিনে ইয়ামাল। বার্সেলোনা ক্লাবের ফাউন্ডেশন এবং স্প্যানিশ সংবাদপত্র দিয়ারিও স্পোর্ট-এর যৌথ উদ্যোগে ইউনিসেফ ও কাতালুনিয়ার অন্যান্য দাতব্য তহবিলের জন্য ২০০৮ সালের একটি চ্যারিটি ক্যালেন্ডার তৈরির অংশ হিসেবে ছবিটি তোলা হয়েছিল। প্রতি বছরই বার্সার ফুটবলারদের নিয়ে এমন আয়োজন হতো, যেখানে শত শত সাধারণ পরিবার অংশ নিত। কিন্তু ভাগ্যের কী অদ্ভুত খেলা, বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ তারকা ইয়ামালকেই সেদিন জুটিয়ে দেওয়া হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার ও আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী মেসির সঙ্গে!
২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ চলাকালীন ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি শেয়ার করলে তা প্রথমবার ভাইরাল হয়। ছবিতে দেখা যায়, প্লাস্টিকের বাথটাবের পানিতে থাকা ছোট্ট ইয়ামালকে গোসল করাতে সাহায্য করছেন মেসি এবং ইয়ামালের মা শিলা এবানা। আরেকটি ছবিতে তোয়ালে দিয়ে ৫ মাসের ইয়ামালকে জড়িয়ে পরম স্নেহে কোলে নিয়ে আছেন মেসি।
ফটোগ্রাফার মনফোর্ট বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন ছবিটি প্রথম আলোড়ন তোলে, আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না। ২০০৭ সালের কথা ভাবুন, মেসি তখন বার্সেলোনায় কেবল নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করছেন। রোনালদিনহো, স্যামুয়েল ইতো, জাভি, ইনিয়েস্তা, পুয়োল আর অঁরিদের মতো তারকাদের ভিড়ে তিনি তখন একজন উদীয়মান প্রতিভা মাত্র। কে জানত এই ফুটফুটে শিশুটি বড় হয়ে কী হবে, আর মেসি নিজেই বা কোন উচ্চতায় পৌঁছাবেন! নিয়তি আসলেই অনেক বড় ভূমিকা পালন করে।
সেই শুটিংয়ের দিনের স্মৃতিচারণ করে মনফোর্ট বলেন, আমাদের ১২ জন খেলোয়াড়ের একটি তালিকা দেওয়া হয়েছিল। সাধারণত ফুটবলাররা এসে তাড়াহুড়ো করে বলেন, তাড়াতাড়ি শেষ করুন, আমার তাড়া আছে। কিন্তু ভালো ছবির জন্য সময় দিতে হয়। অপরিচিত দুজন মানুষের মধ্যে যখন ছবির মেলবন্ধন তৈরি করতে হয়, তখন পরিবেশটা কিছুটা আড়ষ্ট থাকে। আর যখন একজন ২০ বছরের তরুণ এবং অন্যজন একটা কোলের শিশু, তখন কাজটা আরও কঠিন। তবে ইয়ামালের মা আমাদের দারুণ সাহায্য করেছিলেন। তার উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত জরুরি, যাতে শিশুটি ভয় না পায়। আমরা মূলত একটি মিষ্টি ও ভালোবাসাময় মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করতে চেয়েছিলাম।
বার্সেলোনা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের শহর মাতারো থেকে কোলের শিশুকে নিয়ে ক্যাম্প ন্যুতে এসেছিলেন ইয়ামালের মা। কষ্ট করে আসার জন্য প্রতিটি পরিবারকে ছবির একটি করে কপি উপহার দিতেন মনফোর্ট। সেই ছোট্ট ইয়ামালই ২০১৪ সালে মাত্র সাড়ে ৬ বছর বয়সে বার্সার লা মাসিয়া অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন। এরপর ২০২৩ সালের এপ্রিলে মাত্র ১৫ বছর বয়সে লা লিগায় এবং ১৬ বছর বয়সে জাতীয় দলে অভিষেক ঘটে তার। ইউরো ২০২৪-এ স্পেনকে জেতানোর পর এখন তিনি চলতি বিশ্বকাপে স্পেনের সবচেয়ে বড় তারকা। ক্লাব ফুটবলেও তিনি এখন বার্সায় মেসির সেই আইকনিক ‘১০ নম্বর’ জার্সিটি পরেন।
মনফোর্ট এই ঘটনাকে ‘লাখে একটি’র মতো বিরল বলে উল্লেখ করেন। তিনি এর তুলনা করেন ১৯৮৬ সালের এপ্রিলের একটি ছবির সঙ্গে, যেখানে লা মাসিয়ার ১৫ বছর বয়সী বল বয় পেপ গুয়ার্দিওলা করতালির মাধ্যমে তৎকালীন কোচ টেরি ভেনাবলসের বিদায়কে সম্মান জানাচ্ছিলেন, যিনি পরে বার্সার সফল খেলোয়াড় ও কোচ হন।
বর্তমানে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করা মনফোর্ট বলেন, এটি আমার জীবনের তোলা সবচেয়ে বিখ্যাত ছবি। এবারের বিশ্বকাপেও মানুষ এই ছবি নিয়ে নতুন করে মেতে উঠেছে। ইয়ামাল যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন, তাতে এই ছবি আরও ঐতিহাসিক হয়ে উঠবে। এই ছবিটির পেছনের গল্প মিলে যাওয়াটা লটারি জেতার মতোই অবিশ্বাস্য। যদিও এতে আমার আর্থিক ভাগ্য খোলেনি। তবে আজকের দিনে, যখন ফুটবল মানেই কেবল টাকা আর ক্ষমতার খেলা, সেখানে এমন সুন্দর একটি গল্প জড়িয়ে থাকায় আমি সত্যিই অনেক খুশি।
আগামী রবিবার মধ্যরাতে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। আর এই ম্যাচের মাধ্যমেই মাঠের লড়াইয়ে প্রথমবার একে অপরের মুখোমুখি হতে চলেছেন একসময়ের সেই ‘ধাই-মা’ মেসি এবং কোলের শিশু ইয়ামাল!

১৫ বছর বয়সে বলেছিলেন, ‘মেসি, অবসর নিও না’: কে জানতো সেই ছেলেই আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলবে
ফাইনালে আর্জেন্টিনার চেয়ে স্পেন কেন এগিয়ে







