সংখ্যায় মেসি এগিয়ে, তবু গোল্ডেন বল কেন রদ্রির?

বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন শুধু আর্জেন্টিনাকে হারায়নি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, লিওনেল মেসি যাতে ম্যাচে নিজের স্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন, তেমন সুযোগ তৈরি হতে দেয়নি লা রোহারা।

অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলেই নির্ধারিত হয় ফাইনালের ভাগ্য। তবে ১-০ স্কোরলাইন ম্যাচের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরছে না। পুরো ম্যাচে স্পেনের আধিপত্য ছিল অনেক বেশি স্পষ্ট।

পুরো টুর্নামেন্টে আট ম্যাচে মাত্র এক গোল হজম করেছে স্পেন, যা বিশ্বকাপজয়ী কোনো দলের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।

স্পেনের এই নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন অধিনায়ক রদ্রি। শিরোপা জয়ের পর গোল্ডেন বলও উঠেছে তার হাতেই। ফিফা তাকে টুর্নামেন্টজুড়ে স্পেনের মিডফিল্ডের 'মাস্টার' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

এই পুরস্কার কেবল চ্যাম্পিয়ন দলের অধিনায়ক হওয়ার স্বীকৃতি নয় কিংবা মেসিকে ঘিরে বিতর্ক তৈরির চেষ্টাও নয়। বরং পুরো আসরে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করা ফুটবলারের যথার্থ স্বীকৃতি এটি।

রদ্রির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল স্পেনের খেলার ভারসাম্য ধরে রাখা। প্রতিপক্ষের প্রেসিং ভেঙে প্রথম পাস দেওয়া, আক্রমণের গতি ও দিক নির্ধারণ করা এবং দল আক্রমণে উঠলেও পেছনে থেকে রক্ষণকে নিরাপত্তা দেওয়া; সবকিছুই করেছেন নিখুঁতভাবে।

তার অবস্থানগত বুদ্ধিমত্তার কারণেই ফুল-ব্যাকরা নির্ভয়ে ওপরে উঠতে পেরেছেন, অ্যাটাকিং মিডফিল্ডাররা এগিয়ে খেলেছেন, আর সেন্টার-ব্যাকরা সামনে নিরাপদ কাভার পেয়েছেন।

স্পেনের দুর্দান্ত রক্ষণভাগের সাফল্যের সঙ্গে তাই বল দখলের আধিপত্য ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতিপক্ষকে প্রথমে বল কেড়ে নিতে হয়েছে, এরপর রদ্রিকে অতিক্রম করে সংগঠিত রক্ষণভাগ ভাঙতে হয়েছে। পুরো টুর্নামেন্টে খুব কম দলই সেই কঠিন কাজটি করতে পেরেছে।

এই কাঠামো সব পরীক্ষায় সফল হয়েছে। পর্তুগাল, বেলজিয়াম ও ফ্রান্সকে নিয়ন্ত্রণে রাখার পর ফাইনালে স্পেনের সামনে ছিল টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোল করা আর্জেন্টিনা। ইস্ট রাদারফোর্ডে ফাইনালের আগে ১৯ গোল করা দলটিকে প্রায় নিষ্প্রভ করে দেয় স্প্যানিশরা।

ফাইনালে রদ্রি ১০৬টির মধ্যে ১০১টি সফল পাস করেন। আর্জেন্টিনার অর্ধেই ৬১টির মধ্যে ৫৭টি পাস সফল ছিল তার। দীর্ঘ পাসে ৯টির মধ্যে ৮টিতেই সফল ছিলেন। পাশাপাশি দুটি গুরুত্বপূর্ণ পাস, একাধিকবার চাপ সামলে বল এগিয়ে নেওয়া এবং আটটি দ্বৈরথ জয়—সব মিলিয়ে মিডফিল্ডে ছিলেন অপ্রতিরোধ্য।

তিনি শুধু বল ধরে রাখেননি; সেই বলের দখল ব্যবহার করেছেন আর্জেন্টিনাকে নিজেদের অর্ধে আটকে রাখতে এবং মেসিকে ম্যাচ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে।

এখানেই রদ্রি ও মেসির পার্থক্য। মেসির ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান হয়তো বেশি আকর্ষণীয়, কিন্তু রদ্রি নিয়ন্ত্রণ করেছেন সেই পরিবেশ, যেখানে ওই পরিসংখ্যান তৈরি হওয়া সম্ভব কি না—সেটিই।

এখানে বলে রাখা ভালো গোল্ডেন বল দেওয়া হয় টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়কে, শুধু সর্বোচ্চ গোলদাতা বা সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা ফরোয়ার্ডকে নয়। গোল ও অ্যাসিস্ট মেসির ভূমিকার একটি অংশের প্রতিফলন। কিন্তু বলের দখল, আক্রমণ গঠন, রক্ষণে ভারসাম্য, প্রেসিং সামলানো এবং পুরো দলের কাঠামো পরিচালনার মতো দায়িত্ব পালন করা একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের সঙ্গে কেবল গোল-অ্যাসিস্ট দিয়ে তুলনা করা যায় না।

আরও একটি বিষয় রদ্রির পক্ষে গেছে। টুর্নামেন্টের শেষ তিন ম্যাচ—কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনালে—মেসি গোল করতে পারেননি। বড় ম্যাচে আর্জেন্টিনা যত বেশি তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, স্পেন তত বেশি তাকে বিপজ্জনক জায়গা থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

অন্যদিকে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে রদ্রির গোল বা অ্যাসিস্টের প্রয়োজন হয়নি। ফাইনালের আগেই তিনি ৬৪৮টি সফল পাস দিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে এক আসরে সর্বোচ্চ সফল পাসের রেকর্ড গড়েন। তার পাসের সফলতার হার ছিল ৯৩ শতাংশ। 

গোল-অ্যাসিস্টের হিসাবে মেসি হয়তো রদ্রির চেয়ে অনেক এগিয়ে। কিন্তু ফুটবলে সব সময় পরিসংখ্যানই পুরো গল্প বলে না।

রদ্রি নিজের নির্ধারিত ভূমিকায় ছিলেন অসাধারণ। বিশ্বকাপের সবচেয়ে সফল দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি তিনিই সামলেছেন। পর্তুগাল, ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ করে দলের জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছেন তিনি।

তার ওপর গোল্ডেন বল জিতে রদ্রি এমন এক তালিকায় নাম লেখালেন, যেখানে আক্রমণভাগের খেলোয়াড় নন এমন ফুটবলারদের মধ্যে রয়েছেন লুকা মদ্রিচ, জিনেদিন জিদান ও অলিভার কানের মতো কিংবদন্তিরা।

মেসির গোল করার দক্ষতা ছিল অসাধারণ। তবে পুরো টুর্নামেন্টে মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ, বলের বণ্টন, রক্ষণে ভারসাম্য এবং ম্যাচের ছন্দ ধরে রাখার বিচারে রদ্রির সমকক্ষ আর কেউ ছিলেন না। সেই কারণেই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি শেষ পর্যন্ত উঠেছে স্পেনের এই মিডফিল্ডারের হাতেই।