আর্জেন্টিনা যে কৌশলে ফাইনালে উঠেছিল, সেই কৌশলেই হাতছাড়া বিশ্বকাপ

ফাইনালে ওঠার পথে লিওনেল স্ক্যালোনির কৌশল ছিল প্রায় নিখুঁত। লিওনেল মেসিকে ঘিরে সাজানো পরিকল্পনাই আর্জেন্টিনাকে টেনে নিয়েছিল শিরোপার লড়াইয়ে। কিন্তু শেষ ম্যাচে সেই একই কৌশল বুমেরাং হয়ে দাঁড়ালো। স্পেনের বিপক্ষে পুরো ম্যাচে আক্রমণে অসহায় ছিল আলবিসেলেস্তেরা। আর সেখানেই নির্ধারিত হয়ে যায় বিশ্বকাপের ভাগ্য।

কোনও দল যদি ১১৭ মিনিট ধরে একটি শটও নিতে না পারে তাহলে হয় তারা ফুটবল খেলছে না, নয়তো তাদের আক্রমণে বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। রবিবারের ফাইনালে আর্জেন্টিনার অবস্থা ছিল ঠিক তেমনই। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে স্পেনের গোলমুখে একটি শটও নিতে পারেনি তারা। লক্ষ্যে তো নয়ই, লক্ষ্যের বাইরেও নয়। পরিসংখ্যান বলছে, এমন ঘটনা বিরল! এই ধরনের রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর কেবল কোস্টারিকাই এর আগে দুবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল।

অতিরিক্ত সময়েও সেই চিত্র খুব একটা বদলায়নি। যদিও এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখায় শেষ দিকে ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া আর্জেন্টিনার জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

আক্রমণে এমন নিষ্প্রভ হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ অবশ্যই স্পেন। পুরো টুর্নামেন্টে আট ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছে তারা। বল দখলে আধিপত্য এবং তীব্র প্রেসিংয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ ও সময় দুটো থেকেই আর্জেন্টিনাকে বঞ্চিত করেছে স্প্যানিশরা। আর এই দুটি ছাড়া গোলমুখে হুমকি তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। তবে দায়ের একটি বড় অংশ পড়ে লিওনেল স্ক্যালোনির বেছে নেওয়া কৌশলের ওপরও।

এই বিশ্বকাপে স্ক্যালোনি পুরো দলটিকে গড়ে তুলেছিলেন লিওনেল মেসিকে কেন্দ্র করে। ৩৯ বছর বয়সী মেসি আগের মতো বল ছাড়া সেভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন না। এটি মাথায় রেখেই দল সাজিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন কোচ। বল হারানোর পর যাতে মাঝমাঠে খোলায়াড়দের আধিক্য বজায় থাকে এবং প্রতিপক্ষকে উইং দিয়ে খেলতে বাধ্য করা যায়। 

এছাড়া স্ক্যালোনি ভরসা রেখেছিলেন এমন কিছু খেলোয়াড়ের ওপর, যাদের ওপর মেসিরও পূর্ণ আস্থা ছিল। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, রদ্রিগো ডি পল ও লিয়ান্দ্রো পারেদেস- যিনি ফাইনালে একাদশে না থাকলেও বদলি হিসেবে নেমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এরা সবাই লড়াকু ও পরিশ্রমী, কিন্তু গতি ও সৃজনশীলতায় খুব বেশি এগিয়ে নন।

মেসিকে কেন্দ্র করে দল সাজানোর আরেকটি প্রভাব ছিল একমাত্র স্ট্রাইকার নিয়ে খেলা। ফলে প্রতিটি ম্যাচেই হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতরো মার্টিনেজের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হয়েছে। এমন দলে একা স্ট্রাইকার হিসেবে খেলাটা যেমন পরিশ্রমসাধ্য, তেমনি অনেকটা একঘেয়ে। একই কারণে স্ক্যালোনি এই স্কোয়াডের অন্যতম প্রতিভাবান ফুটবলার নিকো পাসের জন্যও কার্যকর কোনও জায়গা খুঁজে পাননি।

এতদিন এই পরিকল্পনা কার্যকর ছিল কিছুটা সৌভাগ্য আর অনেকটাই মেসির অসাধারণ পারফরম্যান্সের কারণে। কিন্তু ফাইনালে এসে সেটি আর কাজ করেনি।

এখন চাইলে স্ক্যালোনির সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলা যায়। অবশ্য আর্জেন্টাইন কোচ হয়তো বলবেন, মেসিকে দলে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানোর এটিই ছিল একমাত্র উপায়। বিশ্বকাপে মেসির ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট তার সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে শক্ত যুক্তিও দেয়।

তবু ফাইনাল দেখিয়ে দিয়েছে, বিকল্প কোনও পরিকল্পনা না থাকাটা আর্জেন্টিনার বড় দুর্বলতা ছিল। ম্যাচ যত গড়িয়েছে, দলটি ততই হতাশা আর শারীরিক লড়াইয়ের দিকে ঝুঁকেছে। অথচ বেঞ্চে বসে ছিলেন তাদের সবচেয়ে সৃজনশীল ও প্রতিভাবান কয়েকজন ফুটবলার। শেষ পর্যন্ত সেখানেই গড়ে ওঠে বিশ্বকাপ ফাইনালের পার্থক্য।