লিওনেল মেসির কেবল বাবা নন, হোর্হে মেসি আসলে কে ছিলেন

অবশেষে গুঞ্জন সত্যি হয়েছে। লিওনেল মেসির বাবা হোর্হে মেসি আর নেই। আর্জেন্টাইন গণমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টস এটি নিশ্চিত করেছে।

পরিবারের জন্য আত্মত্যাগ এবং আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে তার ক্যারিয়ারের প্রতিটি পদক্ষেপে দেওয়া অবিচল সমর্থন—স্পেনে পাড়ি জমানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে ক্যারিয়ার জুড়ে চুক্তির বিষয়ে দরকষাকষি, সবখানেই ছিল বাবা হোর্হের উপস্থিতি।

লিওনেল মেসির মতো বিশ্বতারকার চুক্তি ব্যবস্থাপনা ও বড় বড় সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়া মানুষ হয়ে ওঠার আগে, হোর্হে মেসি রোসারিওর একটি মেটালওয়ার্কিং কারখানায় দীর্ঘ সময় কাজ করতেন। ১৯৫৮ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণকারী এই মানুষটি শুরু থেকেই লিওনেলের পাশে ছিলেন এবং বাবা ও এজেন্ট—উভয় ভূমিকাতেই এক নির্ণায়ক চরিত্রে পরিণত হন।

বাবার প্রতিদিনের পরিশ্রম দেখে বড় হওয়া আর্জেন্টাইন অধিনায়কের স্মৃতিতে সেই দিনগুলো আজও অমলিন।

মেসি বলেন, ‘আমার মধ্যে তার অনেক কিছুই আছে, তবে তিনি সারাদিন কাজ করতেন এবং আমাদের সাথে বেশি সময় কাটাতে পারতেন না। তিনি ভোর ৪টায় উঠতেন আর রাতে খাবারের সময় বাড়ি ফিরতেন। যখনই আমাদের দেখা হতো, তিনি তা উপভোগ করতেন; আমাকে কখনোই বকাঝকা করেননি। আমি তাকে খুব মিস করতাম।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজ আমি সৌভাগ্যবান যে নিজের সন্তানদের সাথে অনেক বেশি সময় কাটাতে পারি। তাদের বড় করার ক্ষেত্রে আমি আমার বাবা-মাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করি’।

সেলিয়া কুচ্চিতিনির সাথে সংসার বেঁধে হোর্হে চার সন্তানের একটি পরিবার গড়ে তোলেন। লিওনেল, রদ্রিগো, মাতিয়াস এবং মারিয়া সোল। দীর্ঘদিন তাদের দৈনন্দিন জীবন প্রচারের আলো থেকে অনেক দূরে ছিল। লাভালেহা স্ট্রিটের তাদের বাড়িটি চলতো হাড়ভাঙা খাটুনিতে, আর ভবিষ্যৎ ১০ নম্বর জার্সিধারী তার প্রথম ফুটবল পাঠ নিচ্ছিলেন গ্রান্দোলিতে এবং পরে নিজের বিকাশ ঘটান নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে।

হোর্হে মেসির সিদ্ধান্ত যা ইতিহাস বদলে দিয়েছিল

মেসির গ্রোথ হরমোনের ঘাটতিজনিত রোগ ধরা পড়ার পর পরিবারটি ফুটবলের চেয়েও বড় এক বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হয়। চিকিৎসা ছিল বেশ ব্যয়বহুল, আর তার বাবা খরচ চালানোর পথ খুঁজতে থাকেন। হোর্হে বলেন, ‘আমি আকিনদারে কাজ করতাম এবং ফাউন্ডেশনের সাথে কথা বলি। দুজন মিলে দুই বছরের জন্য চিকিৎসার খরচে আমাকে সাহায্য করেছিল। এরপর পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে; তারা আর খরচ বহন করতে পারছিল না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বার্সেলোনা থেকে একটি সুযোগ আসে এবং বাজিটি ছিল বিশাল। মাত্র ১৩ বছরের এক ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে রোজারিও ছেড়ে যাওয়া। কাতালান ক্লাবটি যেন চিকিৎসার খরচ বহন করে, সে জন্য হোর্হে দরকষাকষিতে নেতৃত্ব দেন এবং ছেলের সাথে স্পেনে স্থায়ী হন। দেশ ছেড়ে যাওয়ার এই কষ্টটি ছিল এমন এক সিদ্ধান্তের মূল্য, যা শেষ পর্যন্ত তাদের জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছিল।’’

বাবা থেকে এজেন্ট এবং ফুটবলের নির্ভরযোগ্য সঙ্গী

লিও বয়সভিত্তিক দল থেকে দ্রুত বার্সার মূল তারকা হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তার বাবার ভূমিকাও বদলে যায়। এজেন্ট হিসেবে পূর্ব কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়াই তিনি চুক্তিপত্র, বাণিজ্যিক সমঝোতা এবং দরকষাকষি পরিচালনা করা শিখে নেন। শেষ পর্যন্ত রোসারিওর এই ছেলের পেশাদার স্বার্থ রক্ষার মূল দায়িত্বে তিনিই পরিণত হন।

তবে তাদের সম্পর্ক কখনোই কেবল ব্যবসায় সীমাবদ্ধ ছিল না; ফুটবল তাদের মধ্যে একটি ভাগ করে নেওয়া ভাষার মতো রয়ে গিয়েছিল। ১০ নম্বর জার্সিধারী এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ‘খেলার বিষয়ে আমি আমার বাবার সঙ্গে প্রচুর কথা বলি; ক্যারিয়ার জুড়ে তিনি আমার পাশে ছিলেন। ম্যাচ শেষ করে আমি তাকে খুদে বার্তা পাঠাতাম বা আমরা কথা বলতাম। ছোটবেলা থেকেই বাবার অনুমোদনের আমার খুব প্রয়োজন হতো। ম্যাচ শেষ করেই আমি তার মতামত জানতে চাইতাম।'

বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এবং বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের তালিকায় নাম লেখানোর পরও বাবার সেই সতর্ক ও শাসনপ্রিয় দৃষ্টি মেসির সঙ্গেই ছিল।

‘আমার বাবা আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। তার ক্রমাগত সমালোচনা আমাকে সবসময় নিজেকে উন্নত করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি এটাও জানেন যে আমি নিজেই আমার সবচেয়ে বড় সমালোচক। আর আমার মায়ের কাছে আমি সবসময়ই সেরা, এমনকি যখন আমি খুব বাজে খেলি তখনও। প্রতিটি ম্যাচেই আমি ভালো খেলেছি বলেই তার মনে হয়; সেখানে আমার কোনও ভুলই থাকে না। তিনি আর দশটা মায়ের মতোই, বলেন মেসি।

মেসির বড় বড় সিদ্ধান্তের নেপথ্যের মানুষটি

বার্সেলোনায় চুক্তি নবায়ন এবং ১০ নম্বর তারকাকে ঘিরে বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিধি হিসেবে তার ভূমিকা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি বেশ কয়েকবার যেমনটা ব্যাখ্যা করেছেন, নীতিটি ছিল সহজ, ‘আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করি যাতে সে কেবল খেলায় মনোযোগ দিতে পারে।’

অন্যদিকে, চুক্তি, স্পন্সর এবং অন্যান্য উদ্যোগের দেখাশোনা করতেন তার সঙ্গে থাকা কর্মীরা।

২০২১ সালে বার্সেলোনার সঙ্গে চুক্তি নবায়ন ব্যর্থ হওয়ার পর তার কষ্টদায়ক বিদায়ের সময় হোর্হে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে আসেন। তিনি পিএসজিতে মেসির যোগদানের দরকষাকষিতে অংশ নেন এবং দুই বছর পর ইন্টার মায়ামিতে ট্রান্সফার চূড়ান্ত করতে হোর্হে ও হোসে মাসের সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দেন।

লিওর ক্যারিয়ারের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে যুক্ত থাকা এই কূটনৈতিক মানুষটির পেছনে লুকিয়ে আছে কোটি কোটি ডলারের চুক্তির অনেক আগে গড়ে ওঠা এক আত্মিক সম্পর্ক। রোজারিওতে কাজের উদ্দেশ্যে ভোরবেলায় ঘর ছাড়া থেকে শুরু করে প্রতিটি ম্যাচ শেষের সেই আড্ডা—হোর্হে ছিলেন একাধারে পিতা, এজেন্ট, উপদেষ্টা এবং সেই বিরল মানুষদের একজন, ফুটবল ক্যারিয়ারের শীর্ষে পৌঁছানোর পরও যার মতামত ১০ নম্বর তারকা সবসময় খুঁজে ফিরেছেন।