ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে কখনও খেলতে পারেনি পাকিস্তান। ফুটবলে মাঠের সাফল্যও নেই বললেই চলে। অথচ বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী শহরগুলোর একটি এই পাকিস্তানে। দেশটির শিল্পনগরী শিয়ালকোট বিশ্বজুড়ে হাতে সেলাই করা ফুটবলের অন্যতম প্রধান উৎপাদনকেন্দ্র।
শিল্পসংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ হাতে সেলাই করা ফুটবল তৈরি হয় শিয়ালকোটে। বছরে এই শহরে উৎপাদন হয় ৪ কোটির বেশি ফুটবল। বিশ্ব ক্রীড়া সরঞ্জামের সরবরাহ ব্যবস্থায় তাই শিয়ালকোটকে বলা হয় এক ধরনের ‘হিডেন চ্যাম্পিয়ন’।
শিয়ালকোটে ফুটবল তৈরির ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। বিশ শতকের শুরুর দিকে স্থানীয় মুচিরা প্রথমে ব্রিটিশ সেনাদের ফুটবল মেরামত করতেন। ধীরে ধীরে সেই কাজই রূপ নেয় ফুটবল সেলাই ও উৎপাদনের বড় শিল্পে।
১৯৮২ বিশ্বকাপে ‘ট্যাঙ্গো’ বলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের তৈরি ফুটবল নতুন পরিচিতি পায়। বলটিতে পানি প্রতিরোধী সিলিং প্রযুক্তির ব্যবহার শিয়ালকোটের উৎপাদন সক্ষমতার প্রতি বিশ্বের নজর কাড়ে।
এরপর ধীরে ধীরে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে শিয়ালকোট। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন টুর্নামেন্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফুটবল ও সরঞ্জাম তৈরিতে শহরটির কারখানাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
বিশ্বকাপের বিভিন্ন আসরে ব্যবহৃত ফেভারনোভা (২০০২), ব্রাজুকা (২০১৪), টেলস্টার ১৮ (২০১৮), আল রিহলা (২০২২) এবং ২০২৬ বিশ্বকাপের ট্রিয়ন্ডা বল তৈরির সঙ্গেও শিয়ালকোটের উৎপাদন খাতের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
অ্যাডিডাস, নাইকি, পুমা, সিলেক্ট ও রিবকের মতো আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ব্র্যান্ডও এই অঞ্চলে ফুটবল উৎপাদন করেছে।
শিয়ালকোটের ফুটবল শিল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর কারিগরি দক্ষতা। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও এখনও বিপুলসংখ্যক ফুটবল হাতে সেলাই করেন অভিজ্ঞ শ্রমিকরা। প্রতিটি প্যানেল নিখুঁতভাবে জোড়া লাগানো, নকশা করা এবং শেষ মুহূর্তের ফিনিশিং। সবকিছুতেই প্রয়োজন সূক্ষ্ম দক্ষতার।
একটি সাধারণ ফুটবলে থাকে ২০টি ষড়ভুজ ও ১২টি পঞ্চভুজ। সেটি তৈরিতে প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৬৯০টি সেলাই। শিয়ালকোটে উৎপাদিত ফুটবলের ৮০ শতাংশের বেশি এখনও হাতে সেলাই করা হয়।
বিশ্বকাপের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক
শিয়ালকোটের ফুটবল তৈরির গল্প শুধু বাণিজ্যের নয়; ফিফা বিশ্বকাপের সঙ্গেও শহরটির দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে।
১৯৮০-এর দশকের শুরু থেকেই শিয়ালকোটে বিশ্বকাপের জন্য ম্যাচ বল উৎপাদনের ইতিহাস রয়েছে। ফলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল টুর্নামেন্টের সঙ্গে পাকিস্তানের এই শহরের সম্পর্ক কয়েক দশকের।
কোটি কোটি দর্শক টেলিভিশনের পর্দায় যে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখেছেন, সেই ম্যাচের বলের পেছনে ছিল শিয়ালকোটের দক্ষ কারিগরদের শ্রম।
ফিফার কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের শর্ত পূরণ করে ধারাবাহিকভাবে ফুটবল তৈরি করতে পারায় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সরঞ্জামের বাজারে শিয়ালকোট একটি আস্থার নাম হয়ে উঠেছে।
শিয়ালকোটকে বিশ্বমঞ্চে তুলে দিয়েছে ফরোয়ার্ড স্পোর্টস
শিয়ালকোটের ফুটবল শিল্পের সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ফরোয়ার্ড স্পোর্টসের। ১৯৯১ সালে প্রকৌশলী খাজা মাসুদ আখতার প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন।
শুরুতে তুলনামূলক ছোট পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়াতে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। মানসম্মত পণ্য তৈরির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতিও বাড়ে।
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে অ্যাডিডাসের সঙ্গে বড় ধরনের অংশীদারত্ব এর মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বড় পরিসরে প্রবেশের সুযোগ পায় প্রতিষ্ঠানটি এবং দ্রুত সম্প্রসারিত হয় তাদের ব্যবসা।