ট্রান্সফার উইন্ডোর দরজা বন্ধ হয়ে গেছে ইউরোপের বড় বড় লিগে। কিন্তু ফুটবলের বাজার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং দলহীন তারকাদের নিয়ে খুলে গেছে আরেকটি দরজা। আর সেটা ফ্রি এজেন্টের বাজার। আর সেই বাজারে এখনও ঘুরছেন করিম বেনজেমা, পল পগবা, সার্জিও রামোস, জ্যাডন সানচোসহ একঝাঁক তারকা।
ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়দের জানুয়ারির আগে নতুন দলে নেওয়ার সুযোগ প্রায় শেষ। তবে যেসব খেলোয়াড় এখন কোনও ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ নন, তাদের জন্য বাজার এখনও খোলা।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী থেকে বিশ্বকাপজয়ী, সাবেক প্রিমিয়ার লিগ তারকা থেকে ইউরোপের একসময়ের সেরা প্রতিভা। ডেডলাইনের আগে নতুন ঠিকানা খুঁজে না পাওয়া বেশ কয়েকজন বড় নাম এখনও ক্লাবহীন।
এই ফ্রি এজেন্টদের সেরা একাদশটা একবার দেখে নিন-
গোলরক্ষক: নেতো
বয়স: ৩৮, সর্বশেষ ক্লাব: বোতাফোগো
এই একাদশের সবচেয়ে বড় নাম হয়তো নন। তবে ব্রাজিলের সাবেক এই গোলরক্ষকের রয়েছে শীর্ষ পর্যায়ে খেলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।
গত মৌসুমে বোর্নমাউথ থেকে ধারে আর্সেনালে খেলার পর ব্রাজিলে ফিরে বোতাফোগোয় যোগ দিয়েছিলেন তিনি। চলতি বছরের জুনে পারস্পরিক সমঝোতায় সেই চুক্তিও শেষ হয়ে যায়।
ইউরোপে নিজের সেরা সময়ে বেশ নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক ছিলেন নেতো। ফিওরেন্তিনা, জুভেন্টাস, ভ্যালেন্সিয়া ও বার্সেলোনার মতো ক্লাবে খেলেছেন দীর্ঘ ক্যারিয়ারে।
রাইট-ব্যাক: দানি কারভাহাল
বয়স: ৩৪, সর্বশেষ ক্লাব: রিয়াল মাদ্রিদ
ছয়বারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী দানি কারভাহালকে ফ্রি এজেন্টের তালিকায় দেখলে প্রশ্ন জাগে আরও একটি অধ্যায় কি বাকি আছে তার ক্যারিয়ারে?
স্পেনের এই ডিফেন্ডার রিয়াল মাদ্রিদে কাটিয়েছেন ২৩ বছর। ক্লাবটির হয়ে প্রায় ৪৫০ ম্যাচ খেলেছেন এবং জিতেছেন অবিশ্বাস্য ২৭টি বড় শিরোপা। তবে এবার তার চুক্তি আর নবায়ন করেনি রিয়াল। ফলে প্রজন্মের অন্যতম সফল রাইট-ব্যাক এখন ক্লাবহীন।
সেন্টার-ব্যাক: সার্জিও রামোস
বয়স: ৪০, সর্বশেষ ক্লাব: মন্তেরে
একাদশে আরেকজন রিয়াল মাদ্রিদ কিংবদন্তি-সার্জিও রামোস।
মাদ্রিদে ১৬ বছর কাটিয়ে ৬৭১ ম্যাচে ১০১ গোল করেছেন এই স্প্যানিশ ডিফেন্ডার। চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ২০১০ বিশ্বকাপসহ জিতেছেন প্রায় সবকিছুই।
পরবর্তী সময়ে পিএসজি, সেভিয়া ও মেক্সিকোর মন্তেরের হয়ে খেলেছেন রামোস। তবে জানুয়ারিতে মন্তেরে ছাড়ার পর থেকেই ক্লাবহীন তিনি।
অবসর হয়তো খুব বেশি দূরে নয়, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও ক্যারিয়ার শেষের ঘোষণা দেননি রামোস।
সেন্টার-ব্যাক: ডেভিড আলাবা
বয়স: ৩৪, সর্বশেষ ক্লাব: রিয়াল মাদ্রিদ
রক্ষণভাগে আরেক বিশ্বমানের অভিজ্ঞতা ডেভিড আলাবা। অস্ট্রিয়ার এই তারকা বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে সম্ভাব্য প্রায় সব শিরোপাই জিতেছেন। এরপর রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়ে আরও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও লিগ শিরোপা নিজের ঝুলিতে পুরেছেন।
তবে চলতি গ্রীষ্মে তার চুক্তি নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেয় রিয়াল। সাম্প্রতিক চোটের সমস্যা অবশ্য উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু পুরোপুরি ফিট আলাবা এখনও সেন্টার-ব্যাক কিংবা লেফট-ব্যাক- দুই জায়গাতেই দারুণ কার্যকর হতে পারেন।
লেফট-ব্যাক: ওলেক্সান্দর জিনচেঙ্কো
বয়স: ২৯, সর্বশেষ ক্লাব: আয়াক্স
এই একাদশের তুলনামূলক তরুণ মুখ জিনচেঙ্কো। প্রিমিয়ার লিগে তার রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।
ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে চারটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জেতার পর আর্সেনালে যোগ দেন ইউক্রেনের এই ফুটবলার। সেখানে মিকেল আর্তেতার দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যও হয়ে উঠেছিলেন। তবে আয়াক্সে তার সংক্ষিপ্ত অধ্যায় চোটের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। ক্লাবটির হয়ে মাত্র ২০ মিনিট খেলতে পেরেছিলেন। এরপর চুক্তির পরিস্থিতির কারণে চলে আসেন ফ্রি এজেন্টের বাজারে।
২৯ বছর বয়সে অবশ্য ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য এখনও যথেষ্ট সময় আছে তার।
মিডফিল্ড: পল পগবা
বয়স: ৩৩, সর্বশেষ ক্লাব: মোনাকো
পল পগবার মতো তারকাখ্যাতি আর কয়জন ফ্রি এজেন্টের আছে? ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি। জুভেন্টাস ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে ক্যারিয়ারের সেরা সময়ও কাটিয়েছেন।
তবে সাম্প্রতিক প্রত্যাবর্তনটা সহজ হয়নি। ১৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে গত বছর মোনাকোতে যোগ দেন পগবা। কিন্তু মাত্র ছয় ম্যাচ খেলার পর পারস্পরিক সমঝোতায় ক্লাবটির সঙ্গে চুক্তি শেষ হয়ে যায়।
প্রতিভা নিয়ে কখনও বড় প্রশ্ন ছিল না। এখন তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ফিটনেস ও ধারাবাহিকতা।
মিডফিল্ড: ফিলিপে কুতিনহো
বয়স: ৩৪, সর্বশেষ ক্লাব: ভাস্কো দা গামা
একসময় ইউরোপিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারদের একজন ছিলেন কুতিনহো।
লিভারপুলের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাকে ২০১৮ সালে বার্সেলোনায় বড় অঙ্কের দলবদলের সুযোগ এনে দেয়। কিন্তু অ্যানফিল্ডের সেই দুর্দান্ত ফর্ম নিয়মিতভাবে বার্সেলোনায় ধরে রাখতে পারেননি তিনি।
বায়ার্ন মিউনিখ, অ্যাস্টন ভিলা ও ভাস্কো দা গামায় খেলার পর ফেব্রুয়ারিতে ফ্রি এজেন্ট হয়ে যান ব্রাজিলিয়ান তারকা।
ইউরোপে ফিরলে যে তাকে ঘিরে আগ্রহ তৈরি হবে, তাতে সন্দেহ নেই। যদিও লিভারপুলের সেই দুর্দান্ত সময়ের কুতিনহো এখন অনেকটাই অতীত।
রাইট উইং: রহিম স্টার্লিং
বয়স: ৩১, সর্বশেষ ক্লাব: ফেইনুর্ড
ইউরোপের অন্যতম ভয়ংকর ফরোয়ার্ড থেকে ফ্রি এজেন্ট স্টার্লিংয়ের পতন সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বিস্ময়কর ঘটনা।
ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে একাধিক প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জিতেছেন। ইংল্যান্ডের হয়েও ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। পরে চেলসি ও আর্সেনালের হয়ে খেলেছেন।
ক্যারিয়ার পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে ফেইনুর্ডে যোগ দিয়েছিলেন স্টার্লিং। কিন্তু নেদারল্যান্ডসে সেই অধ্যায় টিকেছে মাত্র তিন মাস। ৩১ বছর বয়স এখনও খুব বেশি নয়। তাই একসময় ইংল্যান্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণভাগের খেলোয়াড়কে যদি আবার নিজের গতি ও ধারাবাহিকতা ফিরে পেতে দেখা যায়, তাহলে তার সামনে এখনও অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে।
লেফট উইং: জ্যাডন সানচো
বয়স: ২৬, সর্বশেষ ক্লাব: অ্যাস্টন ভিলা
এই একাদশের সবচেয়ে বড় ‘ওয়াইল্ড কার্ড’ সম্ভবত সানচো। বরুসিয়া ডর্টমুন্ড থেকে তাকে দলে নিতে পাঁচ বছর আগে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড খরচ করেছিল ৭ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ড। সেই সানচোই এখন নতুন ক্লাবের সন্ধানে।
জার্মান বুন্দেসলিগায় তার ঝলমলে পারফরম্যান্স একসময় তাকে ইউরোপের অন্যতম সেরা তরুণ প্রতিভায় পরিণত করেছিল। কিন্তু ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে সেই উচ্চতায় আর পৌঁছাতে পারেননি। এরপর চেলসি ও অ্যাস্টন ভিলায় ধারে খেলেছেন।
তবে বয়স মাত্র ২৬। অর্থাৎ নতুন করে শুরু করার জন্য এখনও যথেষ্ট সময় রয়েছে। সাবেক ক্লাব বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে ফেরার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এখনও কিছুই চূড়ান্ত হয়নি।
স্ট্রাইকার: করিম বেনজেমা
বয়স: ৩৮, সর্বশেষ ক্লাব: আল-হিলাল
এই একাদশের নেতৃত্বে কে থাকবেন, তা নিয়ে হয়তো প্রশ্নই ওঠে না। করিম বেনজেমাই ফ্রি এজেন্টদের বাজারের সবচেয়ে বড় নাম এবং সম্ভবত সবচেয়ে সফলও।
২০২২ সালের ব্যালন ডি'অরজয়ী এই ফরোয়ার্ড রিয়াল মাদ্রিদে কাটিয়েছেন ১৪ বছর। জিতেছেন পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং স্প্যানিশ ক্লাবটির হয়ে করেছেন ৩৫০-এর বেশি গোল।
সৌদি আরবে তার অধ্যায় শুরু হয়েছিল আল-ইত্তিহাদে। চলতি বছরের শুরুতে আল-হিলালে যোগ দেন তিনি। তবে ৩১ আগস্ট দুই পক্ষ পারস্পরিক সমঝোতায় চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়।
৩৮ বছর বয়স হলেও গোল করার দক্ষতা এখনও হারিয়ে ফেলেননি বেনজেমা। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবসরের কথা এখনই ভাবছেন না; বরং পরবর্তী গন্তব্য নিয়ে ভাবছেন তিনি।
এই একাদশের বাইরেও ফ্রি এজেন্টের তালিকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি বড় নাম। ম্যানচেস্টার সিটি ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী রিয়াদ মাহরেজ আল-আহলি ছাড়ার পর এখনও নতুন ক্লাব পাননি। দেলে আলি কোমোর সঙ্গে চুক্তি শেষ হওয়ার পর নতুন সুযোগের অপেক্ষায়।
জেমি ভার্ডি ক্রেমোনেজে অধ্যায় শেষ করে এখন দলহীন। এছাড়া অ্যান্থনি মার্শাল, উইলফ্রিড জাহা, জর্জিনিও ভিনালদাম, হামেস রদ্রিগেজ, ইভস বিসুমা, টাইরেল মালাসিয়া ও ক্রিস স্মলিং-এর মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রাও রয়েছেন এই বাজারে।