ম্যারাডোনার পর যেমন বদলে ছিল আর্জেন্টিনা, মেসির পরও কি বদলাবে?

কিছু খেলোয়াড় শুধু জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেন না, তারা হয়ে ওঠেন পুরো একটি দলের পরিচয়। ব্রাজিল যেমন পেলের সঙ্গে একাকার, তেমনি আর্জেন্টিনার ফুটবলকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসি।

এমন উচ্চতার কোনও খেলোয়াড় যখন বুটজোড়া তুলে রাখেন, তখন শুধু একটি ক্যারিয়ার শেষ হয় না; সামনে হাজির হয় আরও বড় এক প্রশ্ন- এরপর কী? যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কখনও কখনও লেগে যায় বহু বছর। ১৯৭০ বিশ্বকাপে পেলের নেতৃত্বে শেষবার শিরোপা জয়ের পর ব্রাজিলকে আবার বিশ্বকাপ জিততে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ২৪ বছর। ম্যারাডোনার যুগ শেষ হওয়ার পর আর্জেন্টিনারও লেগেছিল প্রায় একই রকম দীর্ঘ অপেক্ষা। অবশেষে কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এ ফিরেছিল সেই সোনালি ট্রফি। এবার আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে মেসির অবসরের ঘোষণায় সেই অনিশ্চয়তাই যেন আবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টিও ছিল তার মতোই নাটকীয়। ‘ডি’ গ্রুপে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ফিরে এসেছিলেন আর্জেন্টিনার এই মহাতারকা। তাকে দলে ফিরে পেয়ে আলফিও বাসিলের দল গ্রিসকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর নাইজেরিয়াকেও হারায় ২-১ গোলে। হঠাৎ করেই আর্জেন্টিনা হয়ে ওঠে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেবারিট।

বিশ্বকাপের আগে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘আর্জেন্টিনার আমাকে প্রয়োজন- এটাই আমার প্রয়োজন।’ তখন কোনও ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি ছিল না তার, পেশাদার ফুটবলের বাইরেও ছিলেন। কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকার বাছাই পর্বে কলম্বিয়ার কাছে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর বাসিলের ডাক এলে সাড়া দিতে দেরি করেননি।

ততদিনে আর্জেন্টিনার দলে সম্ভাবনাময় একদল তরুণের উত্থান ঘটেছে। লিও রদ্রিগেজ, ডিয়েগো সিমিওনে, ফার্নান্দো রেদোন্দো, ক্লদিও কানিজিয়া ও গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতাদের ঘিরে দলটি এরই মধ্যে ১৯৯১ ও ১৯৯৩ সালে জিতেছিল টানা দুটি কোপা আমেরিকা।

কিন্তু বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে সেই তরুণ দলটিই যেন ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিল। প্রয়োজন ছিল অনুপ্রেরণার, প্রয়োজন ছিল এমন একজনের, যিনি কঠিন মুহূর্তে দলকে টেনে তুলবেন। আবারও ১০ নম্বর জার্সি গায়ে চাপালেন ম্যারাডোনা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্লে-অফে ২-১ গোলে জিতে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের টিকিট এনে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেন তিনি।

মূল টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র ৪০ দিন আগে দীর্ঘদিনের ফিটনেস কোচ ফার্নান্দো সিগনোরিনির সঙ্গে অনুশীলন করতে লা পাম্পায় চলে গিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরু হতেই তার সেই প্রত্যাবর্তনের গল্প থমকে গেলো। নিষিদ্ধ একটি বস্তুর পরীক্ষায় পজিটিভ হন তিনি। সেই খবরের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই শেষ ষোলোতে রোমানিয়ার কাছে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। সেখানেই শেষ হয়ে যায় ম্যারাডোনার আন্তর্জাতিক অধ্যায়।

এরপর আর্জেন্টিনার ডাগআউটে ড্যানিয়েল পাসারেলার আগমন কার্যত ‘এল দিয়েস’-এর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর্দা নামিয়ে দেয়। দুজনের সম্পর্ক ছিল কঠিন। কিন্তু ম্যারাডোনাকে পেছনে ফেলে সামনে এগোনোর পথটাও আর্জেন্টিনার জন্য মোটেও সহজ ছিল না।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রস্তুতির সময় ম্যারাডোনার রুমমেট ছিলেন রিভার প্লেট তারকা আরিয়েল ওর্তেগা। ম্যারাডোনার পর সেই বিশাল দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। গায়ে ওঠে ১০ নম্বর জার্সি। কিন্তু ১৯৯৮ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে একটি মুহূর্তই হয়ে দাঁড়ায় ওর্তেগার পুরো বিশ্বকাপের প্রতিচ্ছবি। ডাচ গোলকিপার এডউইন ফন ডার সারকে মাথা দিয়ে আঘাত করে লাল কার্ড দেখেন তিনি। এরপর আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয়।

তবে ওর্তেগাকে ঘিরে গল্পটির বাইরেও আর্জেন্টিনার ফুটবলে তখন বড় পরিবর্তন এসেছিল। দলটি ধীরে ধীরে কোনও একজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আরও বেশি সমষ্টিনির্ভর হয়ে উঠছিল। দেশটির ফুটবলীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মানানসই প্রতিভার কোনও ঘাটতি ছিল না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলকে একাই উদ্ধার করতে পারবেন এমন একজন, একজন সত্যিকারের আইকন, তখনও খুঁজে পায়নি আর্জেন্টিনা।

আর বিষয়টি শুধু ১০ নম্বর জার্সির ছিল না। ছিল সৃজনশীলতার কেন্দ্রবিন্দুর অভাবও। ম্যারাডোনার পর, মেসির আগে দীর্ঘ সময় ধরে আর্জেন্টিনা এমন একজন স্থায়ী নেতারও অভাব অনুভব করেছে, যিনি মাঠে যেমন নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন, তেমনি ড্রেসিংরুমেও থাকবেন নেতৃত্বের কেন্দ্রে।

বরং এক খেলোয়াড়ের কাছ থেকে আরেক খেলোয়াড়ের হাতে ঘুরেছে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড। ১৯৯৮ সালে পাসারেলা দায়িত্ব দিয়েছিলেন সিমিওনেকে। ২০০২ বিশ্বকাপে দুটি ম্যাচে অধিনায়কত্ব করেন হুয়ান সেবাস্তিয়ান ভেরন; জাপানে দলের শেষ ম্যাচে নেতৃত্ব দেন বাতিস্তুতা। এরপর ২০০৬ সালে হোসে পেকারম্যান দায়িত্ব দেন হুয়ান পাবলো সোরিনকে। ২০১০ সালে সেই দায়িত্ব নেন হাভিয়ের মাসচেরানো।

চার বছর পর আবার বিশ্বকাপে ফেরেন ওর্তেগা। এবার কোচ মার্সেলো বিয়েলসার অধীনে। বিয়েলসার দর্শনে গড়া সেই আর্জেন্টিনা দ্রুত বল এগিয়ে নেওয়া, সরাসরি আক্রমণ, দুই প্রান্ত ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ছড়িয়ে দেওয়া এবং বল হারানোর পর দ্রুত প্রেসিং করে তা পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দিতো।

ওর্তেগার গায়ে ১০ নম্বর জার্সি থাকলেও তিনি আর আগের সেই চিরাচরিত আর্জেন্টাইন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ছিলেন না। বরং তাকে খেলানো হতো অনেকটা ওয়াইড ফরোয়ার্ড হিসেবে। প্রতিপক্ষের ফুলব্যাককে অনুসরণ করে রক্ষণেও তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হতো। কিন্তু ওর্তেগা কখনোই নিজের সেরা ছন্দ খুঁজে পাননি। আর্জেন্টিনাও গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি।

ম্যারাডোনা-পরবর্তী যুগে এক বিশ্বকাপ চক্র থেকে আরেক চক্রে আর্জেন্টিনার কোচ বদলেছে। পাসারেলার পর দায়িত্ব আসে বিয়েলসার হাতে, এরপর পেকারম্যানের কাছে।

২০০৬ সালে জার্মানির মাটিতে বিশ্বকাপ অভিযানে আর্জেন্টিনার দায়িত্বে ছিলেন পেকারম্যান। যিনি বয়সভিত্তিক পর্যায়ে দেশটির সোনালি প্রজন্ম তৈরির অন্যতম স্থপতি। তার পছন্দের ১০ নম্বর ছিলেন হুয়ান রোমান রিকেলমে। ১৯৯৭ সালে আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই তারকা তখন দলের সৃজনশীলতার মূল কেন্দ্র। আর সেই দলেই ১৯ নম্বর জার্সি গায়ে এক তরুণ মেসি ধীরে ধীরে বিশ্বকে দেখাচ্ছিলেন তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সেই অসাধারণ প্রতিভার ঝলক, যা অচিরেই বিশ্ব ফুটবলে ঝড় তুলবে।

আর্জেন্টিনা তখন খেলতো আরও ঐতিহ্যবাহী এক ছকে। বল দখলে রেখে, আর ১০ নম্বরকে ক্লাসিক প্লেমেকার হিসেবে ব্যবহার করে। খেলার গতি ও ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতেন রিকেলমে। কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় নিলেও ২০০৬-এর সেই আর্জেন্টিনা আজও স্মরণীয় টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণীয় ও দক্ষ দল হিসেবে।

২০১০ সালে আর্জেন্টিনার কাঠামোয় আসে বড় পরিবর্তন। ডাগআউটে তখন ম্যারাডোনা, আর তারই ঐতিহাসিক ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামছেন মেসি।

বার্সেলোনায় নিজের অবিশ্বাস্য ক্যারিয়ারের ভিত্তি গড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে এসেছিলেন ছোটখাটো গড়নের সেই জাদুকর। সঙ্গে ছিল ক্রমেই পরিচিত হয়ে ওঠা বিশাল প্রত্যাশা। ক্লাব ফুটবলে তিনি যা করছেন, আর্জেন্টিনার হয়েও ঠিক সেটিই করতে হবে।

কিন্তু সেই বিশ্বকাপ শেষ হয়েছিল হতাশায়। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। তবে আজ পেছন ফিরে তাকালে দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০-কে অন্যভাবেও দেখা যায়। কারণ সেখানেই প্রকৃত অর্থে মেসি-যুগের ভিত্তি গড়ে উঠতে শুরু করেছিল।

ম্যারাডোনার পরও আর্জেন্টিনা একের পর এক বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করেছে। গড়ে তুলেছে স্মরণীয় সব দল। কিন্তু বছরের পর বছর তাদের খুঁজতে হয়েছে এমন একজনকে, যিনি ম্যারাডোনার রেখে যাওয়া প্রতীকী শূন্যতা পূরণ করতে পারবেন। এবার শুরু হচ্ছে নতুন অধ্যায়।

অসাধারণ ফুটবলার তৈরি করার আর্জেন্টিনার ঐতিহ্য এখনও অটুট। কিন্তু লা আলবিসেলেস্তেকে আবারও মুখোমুখি হতে হচ্ছে পরিচিত এক চ্যালেঞ্জের- এমন একজন ১০ নম্বরকে ছাড়া পথ চলা, যাকে একসময় মনে করা হয়েছিল অপূরণীয়।

ম্যারাডোনা-পরবর্তী সময় আর্জেন্টিনার জন্য একটি কার্যকর শিক্ষা রেখে গেছে। আর ইতিহাস বলছে, আর্জেন্টিনা হয়তো আরেকজন মেসি খুঁজে পাবে না। কিন্তু প্রধান তারকাকে ছাড়া কীভাবে নিজেদের বদলে নিতে হয়, কীভাবে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়, সেই পথ তারা আগেও খুঁজে নিয়েছে। হয়তো মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার গল্পটাও শেষ পর্যন্ত হবে নতুন করে নিজেদের আবিষ্কারের গল্প হিসেবে।