বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হারের কষ্ট নিয়ে মুখ খুললেন হ্যারি কেইন

হ্যারি এডওয়ার্ড কেইন। ইংল্যান্ডের অন্যতম বড় তারকা। খেলছেন বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে। মিউনিখের অ্যালিয়াঞ্জ অ্যারেনায় স্পেনের জনপ্রিয় পত্রিকা মার্কার সঙ্গে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে লিওনেল মেসি সহ অনেক প্রসঙ্গ এসেছে। যার কিছু অংশ তুলে ধরা হলো...

প্রশ্ন: চলুন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ নিয়ে কথা শুরু করা যাক। আপনি জার্মান স্তরে সবকিছুই জিতেছেন, তাই চ্যাম্পিয়ন্স লিগই মনে হচ্ছে বায়ার্নের সঙ্গে আপনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

উত্তর: হ্যাঁ, একদমই তাই। গত মৌসুমটি আমাদের জন্য সত্যিই খুব ভালো ছিল। লিগ পর্বে সাতটি জয় এবং একটি মাত্র হারে আমরা দ্বিতীয় স্থান পেয়েছিলাম। এরপর আমরা কিছু দুর্দান্ত ম্যাচ খেলেছি। আটালান্টা, রিয়াল মাদ্রিদ… রিয়ালের ম্যাচটি খুবই বিশেষ ছিল, এবং তারপর অবশ্যই পিএসজি। সমর্থকদের জন্য দুটি অবিশ্বাস্য খেলা ছিল। আমাদের সেই সংকীর্ণ হারটি মেনে নেওয়া খুব কঠিন ছিল। আমরা জয়ের খুব কাছাকাছি ছিলাম; ফাইনালে পৌঁছানোর মতো আত্মবিশ্বাস ও মান আমাদের ছিল। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এমনই,সামান্য ব্যবধানেই সবকিছু নির্ধারিত হয়ে যায়।

প্রশ্ন: আর এই বছর?

উত্তর: এই বছর আমাদের কাজ হলো প্রায় একই কাজ পুনরায় করা এবং সেই শেষ ধাপটি পার করা। এই বায়ার্ন একটি দল হিসেবে এবং একটি গ্রুপ হিসেবে জয়ের ক্ষুধা রয়েছে— আমাদের কোচেরও তাই।

প্রশ্ন: ফাইনালটি মাদ্রিদে হবে এবং লিগ পর্বে আপনি অ্যাতলেতিকোর মুখোমুখি হবেন।

উত্তর: হ্যাঁ। আমি মনে হয় এর আগে কখনও তাদের বিরুদ্ধে খেলিনি, তাই এটি আমার প্রথমবার হবে। অ্যাতলেতিকো দেখিয়ে দিয়েছে, তারা কতটা ভালো দল। তারা গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল এবং তাদের প্রতি আমার পূর্ণ সম্মান রয়েছে। এটি একটি কঠিন ম্যাচ হবে, তবে আমরা প্রস্তুত থাকবো। আমি সেই স্টেডিয়ামটিতেই (মেট্রোপলিটানো) টটেনহ্যামের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল হেরেছিলাম, যা খুব কঠিন একটি মুহূর্ত ছিল। আমি আশা করি, সেখানে ফিরে যাবো এবং এবার একটি ভিন্ন গল্প তৈরি করবো।

প্রশ্ন: আপনার বিষয়টি বেশ ব্যতিক্রমী: বয়স যত বাড়ছে, আপনি তত বেশি গোল করছেন। আপনার এই রহস্যটা কী?

উত্তর: এর একটি রহস্য এমন একজন ব্যক্তি যাকে আপনারা খুব ভালো করেই চেনেন (হ্যারি তার ব্যক্তিগত স্পোর্টস ডক্টর, মাদ্রিদে জন্ম নেওয়া আলেজান্দ্রো এলরিয়াগাকে নির্দেশ করছেন)। আমার সাফল্যের পেছনে আলেজান্দ্রো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

প্রশ্ন: সাত বছর আগে তার সঙ্গে কাজ শুরু করার পর থেকে তিনি আপনাকে কী দিয়েছেন?

উত্তর: আমার বর্তমান শারীরিক অবস্থায় আলেজান্দ্রো একটি মৌলিক ভূমিকা পালন করেন। আমরা পর্দার আড়ালে অনেক কাজ করি, আমরা এখন প্রায় ছয় বছর ধরে একসঙ্গে কাজ করছি। আমি যে এই স্তরে পারফর্ম করতে পারছি এবং এত বেশি ম্যাচ খেলতে পারছি, তার অন্যতম প্রধান কারণ তিনিই। এই বয়সেও আমি যে ক্রমাগত উন্নতি করে যাচ্ছি, তা কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়— যদিও কিছু মানুষ মনে করেন এই বয়সে পারফরম্যান্স কমতে থাকে। আমার ক্ষেত্রে প্রায় উল্টোটাই ঘটেছে। আলেজান্দ্রো এবং আমি যে কাজগুলো করি তা আমাদের উভয়ের জন্যই অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক। তিনি একজন অসাধারণ মানুষও বটে, আমরা একসাথে অনেক সময় কাটাই, তাই স্বাভাবিকভাবেই তিনি যা কিছু করেন তার জন্য আমি তাকে অশেষ ধন্যবাদ জানাতে চাই।

প্রশ্ন: আর আপনার অন্য রহস্যগুলো কী কী?

উত্তর: ফুটবল কখনও কখনও সময়ের ওপর নির্ভর করে। বায়ার্নে থাকা এবং চারপাশে দুর্দান্ত সব সতীর্থ থাকা আমাকে প্রচুর গোল করার সুযোগ করে দেয়, পাশাপাশি দলের খেলায় অবদান রাখতেও সাহায্য করে— পাস দেওয়া, ডিফেন্ড করা এবং দলকে সাহায্য করার জন্য যা যা করতে ভালোবাসি সবই করা। সত্যি বলতে, আমি শারীরিকভাবে এবং মানসিকভাবে আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে ভালো অনুভব করছি— সেরা অবস্থায় আছি! আমাকে এই সময়টার পুরো সদ্ব্যবহার করতে হবে, কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সময় তো আর সারাজীবন থাকবে না। তবে এই মুহূর্তে আমি খুব ভালো একটি অবস্থায় আছি।

প্রশ্ন: গোল উদযাপন করতে কি আপনার কখনও ক্লান্তি আসে না?

উত্তর: কখনোই না। গোল করা পৃথিবীর সেরা অনুভূতি। এটি অ্যাড্রেনালিনের একটি অবিশ্বাস্য মুক্তি দেয়। এতে একটা বিশাল স্বস্তির অনুভূতিও থাকে। এটি এমন একটি অনুভূতি যা খেলা ছেড়ে দিলে আমি খুব মিস করবো।

প্রশ্ন: আপনি ব্যালন ডি’অরের অন্যতম দাবিদার। আমি জানি আপনি নিজের অর্জন নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন না, তবে ২০২৫/২৬ মৌসুমে বায়ার্ন ও ইংল্যান্ডের হয়ে ৬৫ ম্যাচে ৭৩টি গোল স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে।

উত্তর: এটি বেশ জটিল। আমি কখনও নিজের সম্পর্কে খুব বেশি কথা বলতে পছন্দ করিনি। আমি শুধু এটুকুই বলবো যে গত মৌসুমটি ব্যক্তিগতভাবে এবং দলীয়ভাবে অবিশ্বাস্য ছিল। নির্দ্বিধায় বলতে পারি, এটি ছিল আমার জীবনের সেরা মৌসুম। ৭৩টি গোল করা— যা ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (২০১১/১২ মৌসুমে লিওনেল মেসির ৬৯ ম্যাচে ৮২টি গোলের পর)— নিজেই অনেক কিছু বলে দেয়। আমি এটি নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত। আমার সতীর্থদের এবং যারা এটি সম্ভব করতে সাহায্য করেছেন তাদের সবাইকে কেবল ধন্যবাদই দিতে পারি। কিন্তু ব্যালন ডি’অর আমার হাতে নেই। এটি যারা ভোট দেন তাদের ওপর নির্ভর করে। আমার দৃষ্টিতে, গত মৌসুমটি এখন অতীত। এখন আমি এই মৌসুমে মনোযোগ দিচ্ছি এবং আরও কী করতে পারি তা দেখার জন্য মুখিয়ে আছি। আমি জানি অক্টোবর পর্যন্ত এই পুরস্কারটি নিয়ে অনেক আলোচনা হবে, কারণ এটি একটি বড় পুরস্কার।

প্রশ্ন: হ্যারি, একটি আকর্ষণীয় বিষয় আছে। ২০২৬ সালের এই অনুষ্ঠানটি প্রথমবারের মতো লন্ডনে অনুষ্ঠিত হবে। এটি আপনাকে কী ইঙ্গিত দেয়?

উত্তর: হ্যাঁ, অনেকেই বিষয়টি আমাকে বলেছেন, হতে পারে এটি একটি ভালো লক্ষণ। অবশ্যই, নিজের শহরে অনুষ্ঠানটি হওয়া এটিকে আরও বিশেষ করে তুলবে। তাই হ্যাঁ, এই বছর সেখানে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হওয়াটা বেশ বিশেষ একটি অনুভূতি। আমাদের অপেক্ষা করে দেখতে হবে কী হয়।

প্রশ্ন: আপনি সবসময় আপনার সতীর্থদের কৃতিত্ব দেন। গোল্ডেন শু (ইউরোপের লিগগুলোর সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার) নেওয়ার সময়ও আপনি তাই করেছিলেন। যাই হোক, আপনি যদি তৃতীয় গোল্ডেন শু জেতেন, তবে আপনি ঐতিহাসিক মঞ্চে মেসি (ছয়টি) ও ক্রিস্টিয়ানোর (চারটি) পাশে যুক্ত হবেন। এই দুই জন ছাড়া আর কেউ তিনটি গোল্ডেন শু জেতেনি।

উত্তর: মেসি ও রোনালদো পুরো একটি প্রজন্ম ধরে ফুটবলে রাজত্ব করেছেন। তারা ইতিহাসের সেরা ফুটবলারদের দুই জন। সেই আলোচনায় যুক্ত থাকাটাই একটি বিশেষ ব্যাপার। এটি একটি লক্ষ্যও বটে। একজন স্ট্রাইকার হিসেবে আমার কাছ থেকে গোলের আশা করা হয়। গোল্ডেন শু আমার একমাত্র লক্ষ্য নয়, তবে অবশ্যই আমি জানি যে আমি যদি এটি জিতি, তবে তা দলকেও সাহায্য করবে। তাই এই সবকিছুই আমাকে অনুপ্রাণিত করে। প্রতিবার যখন আমি একটি জিতি, আমি আরেকটি জিততে চাই, তারপর আরও একটি। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। আশা করি এই মৌসুমেও বুন্দেসলিগায় যত সম্ভব গোল করে সেখানে পৌঁছাতে পারবো, দেখা যাক আমি আরেকটি জিততে পারি কি না।

প্রশ্ন: বিশ্বকাপে মেসির সঙ্গেও আপনার দেখা হয়েছিল, সেমিফাইনালে। তবে ম্যাচের পর আপনি এবং লিও একে অপরের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন। সেই সময়টার কথা আপনার কীভাবে মনে পড়ে?

উত্তর: নিশ্চিতভাবেই সেদিনটি আমার জন্য কঠিন ছিল। ওভাবে বিদায় নেওয়াটা খুব কষ্টের ছিল। তবে মেসির প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা রয়েছে। আমি তাকে ফুটবলার হিসেবে গড়ে উঠতে দেখেছি। আমি মনে করি, সে সাধারণভাবেই একজন অবিশ্বাস্য খেলোয়াড় এবং যারা তাকে চেনে তাদের মতে, একজন চমৎকার মানুষও বটে। তার সঙ্গে আমার মাত্র কয়েকবারই কথা হয়েছে, তবে তাকে আমার খুব নম্র একজন মানুষ বলে মনে হয়েছে। সে সবসময় নিজের আগে দলকে প্রাধান্য দিয়েছে, আমার মনে হয় আর্জেন্টিনা যে সাফল্য পেয়েছে তার অন্যতম কারণ এটিই। সেদিনের কথা আমার যা মনে আছে, তা হলো— তাকে জড়িয়ে ধরা এবং ফাইনালের জন্য শুভকামনা জানানো। দিনশেষে সেটি আমাদের বিশ্বকাপ ছিল না, কিন্তু বিশ্বকাপের আসল সৌন্দর্য এখানেই। সেরা খেলোয়াড়রা সবচেয়ে বড় মঞ্চে মুখোমুখি হয় এবং অবশ্যই, সেখানে একজন পরাজিত তো থাকবেই। হারের পর, আমি মাথা উঁচু রাখার এবং অন্য দলের প্রতি সম্মান জানানোর চেষ্টা করেছিলাম। আমি মনে করি এটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বিশেষ করে লিওর প্রতি, কারণ এত বছর ধরে ফুটবলে সে যা অবদান রেখে চলেছে।

প্রশ্ন: হোসে মরিনহো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছি, যিনি টটেনহ্যামে আপনার প্রাক্তন ম্যানেজার ছিলেন। তিনি কি আপনার কাছে বিশেষ কেউ ছিলেন?

উত্তর: হ্যাঁ, আমি হোসেকে খুব পছন্দ করি। টটেনহ্যামে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তার প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা রয়েছে। এটা সত্যি যে তিনি টটেনহ্যাম ছাড়ার পর থেকে আমাদের খুব একটা দেখা হয়নি, তবে হয়তো এই বছর চ্যাম্পিয়ন্স লিগে আমাদের দেখা হতে পারে, তাকে আবার দেখতে পাওয়াটা বেশ ভালো হবে।

প্রশ্ন: আপনি কি বলবেন, হোসে আসার পর রিয়াল মাদ্রিদ বায়ার্নের জন্য আরও কঠিন প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে?

উত্তর: রিয়াল কিছু ভালো খেলোয়াড় সই করিয়েছে, মরিনহো একজন দুর্দান্ত কোচ যিনি তার খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনবেন। রিয়ালে সবসময়ই বিশ্বের সেরা কিছু খেলোয়াড় থাকে, গত বছরের মতো এই বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। আমরা জানি, প্রতিযোগিতার পরবর্তী ধাপে তাদের মুখোমুখি হওয়ার একটি শক্তিশালী সম্ভাবনা রয়েছে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ ধাপগুলোতে রিয়াল মাদ্রিদ সবসময়ই থাকবে। গত বছর আমরা তাদের চেয়ে ভালো খেলেছিলাম (বায়ার্ন কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের বিদায় করেছিল)। তবে আমরা এও জানি যে সেটি খুব কঠিন একটি ম্যাচ ছিল। আর এখন হোসে সাথে থাকায় এটি আরও বেশি জটিল হবে।