ফ্রান্সে পৌঁছানোর পরপরই জিনেদিন জিদান এমবাপ্পে এবং তার সতীর্থদের ফ্যাশন প্যারেড বন্ধ করে দিয়েছেন । তারকাদের সেই জাঁকজমকপূর্ণ ক্যাটওয়াক চিরতরে নির্মূল করতে জাতীয় অনুশীলন সেন্টারের প্রবেশদ্বারে ক্যামেরার উপস্থিতি নিষিদ্ধ করেছেন নতুন ফরাসি প্রধান কোচ।
নিজের কর্তৃত্ব জাহির করার মধ্য দিয়েই ফ্রান্স জাতীয় দলের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেছেন জিদান। দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি দূর করার লক্ষ্যে, রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক এই কিংবদন্তি কোচ লা ব্লুসদের দৈনন্দিন নিয়মে কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার এই আগমন একটি দৃঢ় মনোভাব ও পেশাদার কঠোরতার নতুন যুগের সূচনা করল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্লেয়ারফন্টেইন ক্রীড়া কমপ্লেক্সে ফরাসি আন্তর্জাতিক ফুটবলারদের আগমন একটি অতিরিক্ত বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল, যা প্রতিনিয়ত খবরের শিরোনাম হতো। কিলিয়ান এমবাপ্পে, জুলেস কুন্দে, ইব্রাহিমা কোনাটে ও মাইকেল ওলিসের মতো তারকা খেলোয়াড়রা বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের আধুনিক ও আকর্ষণীয় পোশাক এবং অনুষঙ্গ পরে গাড়ি থেকে নামতেন; যা অনুশীলনের প্রবেশদ্বারকে একটি শহুরে ফ্যাশন রানওয়েতে পরিণত করেছিল।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এই সংবাদ প্রচারের ঐতিহ্যকে ‘ব্লু কার্পেট’ নামে অভিহিত করেছিল, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করতো। তবে নতুন কোচিং স্টাফদের মতে, এই ধরনের অতিরিক্ত প্রচার ও প্রদর্শনী পরিবেশের গম্ভীরতা নষ্ট করত এবং খেলোয়াড়দের আসল লক্ষ্য অর্থাৎ মাঠের পারফরম্যান্স ও কৌশলগত প্রস্তুতি থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিতো।
মূল ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ
ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম আরএমসি স্পোর্টসের তথ্য অনুযায়ী, জিদানের প্রথম কড়া সিদ্ধান্তটি ছিল খেলোয়াড়দের আগমনের সময় ক্লেয়ারফন্টেইনের প্রধান চত্বরে সংবাদমাধ্যম ও চিত্রগ্রাহকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা। এই নির্দিষ্ট সময়ে সাংবাদিকদের প্রবেশের পথ বন্ধ করে জিজু খেলোয়াড়দের ক্যামেরার সামনে নিজেদের পোশাক প্রদর্শনের সুযোগ পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছেন।
চলতি তলব থেকে ফুটবলারদের ফরাসি ফুটবল ফেডারেশনের অফিশিয়াল কিট বা মার্জিত ভ্রমণের পোশাক পরে অনুশীলন ক্যাম্পে প্রবেশ করতে হবে। ড্রেসিংরুমের উদ্দেশে ফরাসি ফুটবল কর্তৃপক্ষের বার্তাটি পরিষ্কার, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটিকে আবার পেশাদার প্রস্তুতির জায়গা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, এটিকে কোনও বিজ্ঞাপন প্রদর্শনী বানানো যাবে না। যা কৌশলগত শৃঙ্খলার ওপর পুরোপুরি মনোযোগ বজায় রাখবে।
কঠোর নীতি এবং সার্বিক নিয়ন্ত্রণ
ফ্যাশন শো বন্ধ করা জিদানের প্রতিষ্ঠিত নতুন নিয়মের কেবল শুরু মাত্র। তিনি আগের প্রশাসনের অধীনে গড়ে ওঠা সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার ও ঢিলেঢালা ভাব দূর করতে চান। কোচের বিশ্বাস, খেলোয়াড় অনুশীলন ক্যাম্পে পা রাখার মুহূর্ত থেকেই পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
টিএনটি স্পোর্টস এবং ইনফোবে-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন কোচ সাধারণ এলাকাগুলোতে মোবাইল ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের পাশাপাশি খাবার গ্রহণ ও চিকিৎসার সময়সূচিতেও কঠোর নিয়ম চালু করবেন। এই নিয়মগুলোর মাধ্যমে ফরাসি কোচ দলীয় মেলবন্ধন জোরদার করতে এবং ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধ্বে দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে চান।
পোর্টাল স্পোর্টের এর বিশ্লেষকদের মতে, জিদানের যে নৈতিক অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, তাতে দলের জ্যেষ্ঠ খেলোয়াড়দের সঙ্গে কোনও ঝামেলা ছাড়াই তিনি এ ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োগ করতে পারেন। ফরাসি ফুটবলের কিংবদন্তি হওয়ায় তরুণ প্রতিভাবান কিংবা প্রতিষ্ঠিত তারকা—সবার কাছ থেকেই সর্বোচ্চ নিষ্ঠা দাবি করার মতো অনন্য অবস্থান তার রয়েছে।
কিংবদন্তির নির্দেশ মেনে নিচ্ছে ড্রেসিংরুম
আন্তর্জাতিক ফুটবলে জিদানের সম্মানজনক অবস্থানের কথা বিবেচনা করে কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো দলের নেতারা শ্রদ্ধার সঙ্গেই এই নির্দেশ গ্রহণ করেছেন। জুলেস কুন্দের মতো খেলোয়াড়রা ম্যাচের আগে নিজেদের আকর্ষণীয় পোশাকের জন্য ফ্যাশন আইকন হয়ে উঠলেও, কোচিং স্টাফদের এই আদেশ চূড়ান্ত এবং এর কোনও ব্যত্যয় হবে না।
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে ব্যাপকভাবে অনুভূত হবে, যেখানে ক্লেয়ারফন্টেইনে খেলোয়াড়দের আগমনের ছবি কোটি কোটি ভিউ এবং নতুন ফ্যাশন ট্রেন্ড নিয়ে আলোচনার জন্ম দিতো। তবুও, ফেডারেশন সংশ্লিষ্টরা জোর দিয়ে বলছেন যে এই নতুন যুগের একমাত্র অগ্রাধিকার হতে হবে মাঠে কাঙ্ক্ষিত ক্রীড়া সাফল্য অর্জন করা।
এই কঠোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জিনেদিন জিদান ফরাসি দলের সঙ্গে তার নতুন সফর এমনভাবে শুরু করেছেন, যা স্পষ্ট করে দেয় যে শৃঙ্খলার বিষয়ে কোনও আপস করা হবে না। অনুশীলন শিবিরের প্রবেশদ্বারে গণমাধ্যমের বিনোদনমূলক দৃশ্যপটের দিন এখন শেষ, আর সূচনা হয়েছে এমন এক মনোযোগ ও কঠোর অনুশীলনের সময়, যেখানে শুধু ফুটবলের পারফরম্যান্সই কথা বলবে।









