ফিফার কাছে জামালের গল্প: চার বুলেট থেকে আসিয়ান-বিশ্বকাপের স্বপ্ন

চারটি বুলেট শরীরে বিদ্ধ হয়েছিল। তিন দিন ছিলেন কোমায়। জ্ঞান ফেরার পরও ভাবছিলেন পরদিনের ম্যাচটি খেলতে পারবেন না বলে কোচকে জানাতে হবে! মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা সেই কিশোরই আজ বাংলাদেশের ফুটবলের অন্যতম পরিচিত মুখ, জাতীয় দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া। জীবনের সেই অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া, সমর্থক হিসেবে বিশ্বকাপ ভ্রমণ এবং বাংলাদেশকে বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখার স্বপ্ন। সবকিছুই ফিফার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ভাগাভাগি করেছেন তিনি।

ফিফা আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের উদ্বোধনী ম্যাচের আগে দুই দশক আগের সেই ভয়াবহ মুহূর্তটির স্মৃতিচারণ করেন জামাল। যে ঘটনায় একেবারে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। জামাল বলছিলেন, ‘কোপেনহেগেনে জন্মগ্রহণ ও বেড়ে ওঠা। একদিন বিকালে সেখানেই আমি গুলিবিদ্ধ হই। স্কুলের কাছে ছিলাম, পিঠে ব্যাগ ঝোলানো ছিল। একজন লোক দৌড়ে এসে আমাদের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বললো। আমি ভাবছিলাম, সে কী বলছে এসব! এর এক-দুই মুহূর্ত পরই একের পর এক গুলি চলে আসে এবং আমার গায়ে চারটি বুলেট লাগে। আমি তিন দিন কোমায় ছিলাম এবং সুস্থ হতে হাসপাতালে আরও কয়েক মাস কাটাতে হয়।’

বাংলাদেশের হয়ে বড় স্বপ্ন দেখেন জামাল। সেই সময়টাকে নিজের জীবনের অন্যতম মর্মান্তিক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন জামাল। কারণ তখন ফুটবল ক্যারিয়ারেও ভালো সময় কাটছিল তার। তার ভাষায়, ‘আমার জন্য এটি সত্যিই এক মর্মান্তিক পরিস্থিতি ছিল। কারণ সেই সময় আমি এফসি কোপেনহেগেনের বয়সভিত্তিক দলে খুব ভালো ফর্মে ছিলাম।’

কোমা থেকে জ্ঞান ফেরার পরও ফুটবলই ছিল তার মাথায়। জামাল বলেন, ‘কোমা থেকে জেগে ওঠার পর নার্সকে বলেছিলাম, আমার কোচকে ফোন করে জানাতে হবে যে আগামীকাল আমি ম্যাচে খেলতে পারবো না। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কোন দিনের কথা ভাবছি। আমি বললাম, “আজ শুক্রবার।” তখন তিনি বললেন, “না, আজ সোমবার।” এরপর একটি সংবাদপত্র এনে আমাকে দেখালেন আসলে কী ঘটেছিল।’

ভুল সময়ে ভুল জায়গায় থাকার সেই ভয়াবহ ঘটনা পেছনে ফেলে পরবর্তী সময়ে সঠিক সময়েই সঠিক জায়গায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন জামাল। ডেনমার্ক, বাংলাদেশ, ভারত ও আর্জেন্টিনার বিভিন্ন ক্লাবে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ৩৬ বছর বয়সী এই ফুটবলার এখন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে শততম ম্যাচের দ্বারপ্রান্তে।

জাতীয় দলে যখনই তাকে প্রয়োজন হয়েছে, সাড়া দিয়েছেন জামাল। যতদিন শরীর সঙ্গ দেবে, ততদিন এই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা নেই তার,‘অবশ্যই, সবকিছুরই একটা শেষ আছে। তবে এই মুহূর্তে আমি অনুভব করি, আমার শরীর ভালো অবস্থায় আছে। জাতীয় দল এবং বাংলাদেশের জন্য আমার মনে আলাদা একটি টান রয়েছে।’

প্রবাসী ফুটবলারদের সঙ্গে জামাল।অবসর নেওয়া সাবেক ফুটবলারদের সঙ্গে কথা বলে একটি বিষয়ও উপলব্ধি করেছেন জামাল। জাতীয় দলের হয়ে কাটানো মুহূর্তগুলো আরও বেশি উপভোগ করতে না পারার আক্ষেপ থাকে অনেকের, ‘অবসর নেওয়া অনেক খেলোয়াড়ের সঙ্গেই আমার কথা হয়েছে। তারা সবসময় আফসোস করে বলে, সেই সময়গুলোকে যদি আর একটু উপভোগ করতে পারতাম! আমি জানি, আমার এবং দলের ওপর দেশের মানুষের অনেক প্রত্যাশা। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো প্রায় ১৮ কোটি মানুষের একটি দেশে যখন আপনি ২৩ সদস্যের দলে সুযোগ পাবেন, তখন দায়িত্বটা অনেক বেড়ে যায়।’

সেই দায়িত্বকে হালকাভাবে নেন না জামাল। বরং জাতীয় দলের প্রতিটি মুহূর্তই উপভোগ করেন তিনি,‘বিষয়টিকে আমি হালকাভাবে নেই না। প্রতিবার মাঠে নামলে বা জাতীয় দলের সঙ্গে থাকলে মুহূর্তটি আমার কাছে বিশেষ কিছু হয়ে ওঠে। কারণ বছরের পর বছর ধরে আমি বহু খেলোয়াড়কে আসতে এবং যেতে দেখেছি। দলে যত বেশি সময় কাটাচ্ছি, এটি তত বেশি উপভোগ করছি। কারণ, আমি ফুটবল ভালোবাসি, ভালোবাসি আমার দল ও দেশকে।’

অনেক বাংলাদেশির মতো জামালও ছোটবেলা থেকেই ব্রাজিল জাতীয় দলের সমর্থক। সম্প্রতি বিশ্বকাপ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর ঘুরে সরাসরি মাঠে বসে ছয়-সাতটি ম্যাচ দেখার অভিজ্ঞতাও হয়েছে তার। ফিফাকে বলেছেন,‘বিশ্বকাপের শুরুর দিকে আমি বাংলাদেশে ছিলাম। পরে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ছয়-সাতটি ম্যাচ দেখি। সেখানে তিন সপ্তাহ অবস্থানকালে নিউইয়র্ক, মায়ামি, ডালাস, হিউস্টন, কানসাস, এলএ (লস অ্যাঞ্জেলেস) এবং সিয়াটল ভ্রমণ করি।’

১৯৯৭ সাল থেকে ব্রাজিলের সমর্থক জামাল। তবে বিশ্বকাপের সেই সফরে সবচেয়ে বেশি রোমাঞ্চ দিয়েছে আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচ,‘আমি ১৯৯৭ সাল থেকে ব্রাজিলের ভক্ত। তাই হয়তো বলাটা ঠিক দেখাচ্ছে না, তবে পুরো সফরের সবচেয়ে সেরা মুহূর্তটি ছিল আর্জেন্টিনা বনাম মিসরের ম্যাচ দেখা। সেখানে প্রচণ্ড রোমাঞ্চ ছিল। গোল হওয়া, গোল বাতিল হওয়া, আর্জেন্টাইন সমর্থকদের কান্না এবং শেষ মুহূর্তে পুরো স্টেডিয়ামের উন্মাদনা! একজন ব্রাজিল ভক্ত হয়েও বলতে বাধ্য হচ্ছি, পরিবেশটা এক কথায় পাগল করার মতো ছিল!’

এবার সেই উন্মাদনার কিছুটা নিজেদের ম্যাচেও দেখতে চান জামাল। ফিফা আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের সামনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শক্তিশালী দলগুলোর বিপক্ষে নিজেদের সামর্থ্য যাচাইয়ের সুযোগ। জাকার্তায় বড় দর্শকের সামনে খেলার অপেক্ষায় বাংলাদেশ অধিনায়ক,‘অবশ্যই এই টুর্নামেন্টে আমাদের ভালো করার এবং সেরা পারফর্ম করার প্রত্যাশা রয়েছে। জাকার্তায় বিশাল দর্শকের সামনে খেলার জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।’

নিজেদের লক্ষ্যও ঠিক করে রেখেছে বাংলাদেশ। জামাল বলেন,‘আমরা জানি, গ্রুপে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের চেয়ে আমরা র‌্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে আছি। তবে আমাদের এবং আমাদের দেশের নিজস্ব কিছু প্রত্যাশা রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য তিন থেকে চার পয়েন্ট অর্জন করা। আর ফুটবলে শেষ পর্যন্ত কী হয়, তা তো কেউ বলতে পারে না!’

আসিয়ান কাপের পরও জামালের চোখ আরও বড় স্বপ্নে। যে বিশ্বকাপ তিনি ব্রাজিলের সমর্থক হয়ে গ্যালারিতে বসে উপভোগ করেছেন, একদিন সেই বিশ্বকাপেই বাংলাদেশের জার্সিতে খেলতে চান তিনি,‘এরপর অবশ্যই আমাদের সবার একটিই স্বপ্ন বিশ্বকাপের মতো সর্বশ্রেষ্ঠ মঞ্চে নিজেদের দেশকে খেলতে দেখা। এর জন্য আমাদের ঘরোয়া লিগ আরও উন্নত করা এবং বেশি সংখ্যক খেলোয়াড়কে বিদেশের লিগে পাঠানোর মতো উন্নয়নমূলক কাজ করতে হবে। তবে স্বপ্নটা সবসময়ই আমাদের আছে।’

বাংলাদেশে বিশ্বকাপের উন্মাদনার কথাও তুলে ধরেছেন জামাল। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ম্যাচ ঘিরে দেশের মানুষের উচ্ছ্বাস যে কতটা ব্যাপক, সেটি তিনি নিজেও দেখেছেন,‘বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশে কতটা উন্মাদনা তৈরি হয়, তা ধারণাও করা যাবে না! রাজধানীর প্রতিটি ভবনে হয় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা না হয় ইংল্যান্ডের পতাকা ঝুলে থাকে। ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার ম্যাচ থাকলে ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষ বড় পর্দায় একসঙ্গে খেলা দেখে।’

এরপরই নিজের দেশের বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নকে আরও বড় করে তুলেছেন জামাল, ‘একবার ভাবুন তো, আমরা যদি সত্যিই কখনো বিশ্বকাপে খেলতে পারি, তবে সেই উন্মাদনার স্তরটা কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে!’