অনলাইন ক্ষোভ থেকে স্পন্সর হারানো: চীনে এমবাপ্পে-বিতর্ক যে বার্তা দিলো

একটি মন্তব্য ঘিরে চীনে তীব্র বিতর্কের মুখে কিলিয়ান এমবাপ্পে। রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি ফরোয়ার্ড চীনের প্রয়াত নেতা মাও সে তুংকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর শুরু হয়েছে অনলাইন সমালোচনা। একে একে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে স্পন্সররা। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম তার বিজ্ঞাপন সরিয়ে নিয়েছে, আর চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমিত করা হয়েছে তার অ্যাকাউন্টে প্রবেশাধিকার। মঙ্গলবার নিজের মন্তব্যের জন্য ক্ষমাও চেয়েছেন ফ্রান্সের অধিনায়ক। বলেছেন, কথাগুলো ছিল তার ‘বিবেচনাহীন’।

একটি পডকাস্টের ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। সেখানে মাওকে ‘একজন লোক, আমার মনে হয়, তিনি চীনের স্বৈরশাসক’ বলে উল্লেখ করেছেন এমবাপ্পে। এরপর চীনা দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারক মেংনিউ ডেইরি, সাংহাই মিল্কগ্রাউন্ড এবং এনার্জি ড্রিংক প্রস্তুতকারক ইস্ট্রোক- তিন প্রতিষ্ঠানই ফুটবল তারকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। 

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভিও এমবাপ্পেকে ঘিরে বিজ্ঞাপন সরিয়ে নেয়। দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো তার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ সীমিত করে। বুধবার মাওকে নিয়ে মন্তব্যের জেরে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে ক্ষমা চায় রিয়াল মাদ্রিদও।

চীনে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও তারকাদের কাছে এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। বিশ্লেষকদের মতে, এমবাপ্পেকে ঘিরে এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে চীনের বাজারে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা সামলানো কতটা জটিল, এমনকি অতীতে একই ধরনের বিতর্কের অভিজ্ঞতা থাকার পরও।

ঘটনাগুলোর কারণ আলাদা হলেও প্রতিক্রিয়ার ধরনে মিল রয়েছে। কোনও মন্তব্য, ছবি কিংবা বক্তব্য অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ তৈরি হয়। আর অল্প সময়েই মূল মন্তব্যকে ছাড়িয়ে যায় সুনামহানির ঝুঁকি।

চীনা ব্র্যান্ডের সঙ্গে আন্তর্জাতিক তারকাদের সংযোগ ঘটানো প্রতিষ্ঠান এমজিআই গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল ম্যাকরিচি বলেন, ‘চীনে সফল হতে হলে চীনা মানুষের মতো করে ভাবতেই হবে, এমন নয়। তবে চীনা দর্শক কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণ না করার সাংস্কৃতিক প্রভাব কী হতে পারে, তা বুঝতে হবে।’

সম্মানের প্রশ্ন

এ ধরনের ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। প্রতিক্রিয়ায় প্রকৃত জনরোষ কতটা, আর কতটা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সরকারি পর্যায়ের তৎপরতায়, সেটা আরও জোরালো হয়ে উঠছে।

এমবাপ্পের ঘটনা সেই পার্থক্য নির্ধারণের জটিলতা তুলে ধরেছে। বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ার পর চীনের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেটে মাওকে নিয়ে এমবাপ্পের মূল মন্তব্য সহজে দেখা যাচ্ছিল না। ফলে অনেক মানুষ তার প্রকৃত বক্তব্যের চেয়ে বেশি জানতে পেরেছেন স্পন্সরদের সরে যাওয়া এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের সমালোচনার খবর।

চীনের ক্রীড়া বিশ্লেষক ও স্পোর্টিং সুপারপাওয়ার বইয়ের লেখক মার্ক ড্রেয়ারের মতে, ‘এই ঘটনায় এক অর্থে পরিকল্পিত ক্ষোভ তৈরি হতে দেখা গেছে।’

তবে এমন প্রতিক্রিয়াকে অবমূল্যায়ন করা ঠিক হবে না বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শ দেওয়া ব্রিজওয়ার্কস গ্লোবালের প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ডাইখওয়াল্ডের মতে, এ ধরনের বিতর্ক বারবার ঘটলেও তা এড়ানো সম্ভব।

এমবাপ্পের ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে বুধবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, ‘ওই ব্যক্তি যে ক্ষমা চেয়েছেন, আমরা সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি।’ তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি।

ডাইখওয়াল্ডের মতে, চীনের বাজারে কাজ করতে হলে দেশটির নিজস্ব ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের প্রতি সম্মান দেখানোর প্রত্যাশা বুঝতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি এই বাজারে অংশ নেন, তাহলে চীনের নিজস্ব বয়ানের প্রতি সম্মান দেখানো এবং সেটি সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকা প্রত্যাশিত। কোন বিষয়গুলো স্পর্শকাতর, সে বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষা থাকা দরকার।’

তবে ব্র্যান্ড, লিগ ও তারকাদের জন্য আরেকটি সমস্যা হলো চীনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার বিষয়গুলো মোটামুটি পরিচিত হলেও কোনও মন্তব্য ঠিক কোন সীমা অতিক্রম করবে, তা সব সময় স্পষ্ট নয়। ফলে বিতর্কের মাত্রা বোঝার আগেই প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক অংশীদাররা সংশ্লিষ্ট তারকার কাছ থেকে দূরত্ব তৈরি করতে পারে।

কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান কনডুইট এশিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ওয়েই কান বলেন, ‘কোন বিষয়টি সীমা অতিক্রম করবে, তা নিয়ে সাদা-কালো কোনও লিখিত নিয়ম নেই।’ তার মতে, ‘ভোক্তাদের অনুভূতি, সমাজের সামগ্রিক মনোভাব এবং সংবাদমাধ্যম ও প্ল্যাটফর্ম কীভাবে কোনও ঘটনাকে ছড়িয়ে দিচ্ছে- তার ওপর নির্ভর করে সীমারেখা বদলে যায়।’

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা বিদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আর অজানা থাকার কথা নয়। তবু অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও এসব ঝুঁকিকে নিয়মিত ব্যবসায়িক বিপদের অংশ হিসেবে না দেখে গৌণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে।

ডাইখওয়াল্ডের ভাষায়, ‘সবকিছু ঠিকঠাক চললে সবাই উদযাপন করে। কিন্তু চীনের বাজারকে ভুলভাবে বুঝলে তার প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে এবং খুব দ্রুত আসতে পারে।’