বাংলাদেশকে সোনা জেতানোর গল্প শোনালেন ইমরানুর

সিলেটি বাবা-মার সন্তান ইমরানুর রহমান। জন্ম-বেড়ে ওঠা লন্ডনে। তবে শেকড়ের টানে ২০২১ সালের অক্টোবরে দেশে ফিরেই চমকে দিয়েছেন সবাইকে। ১০০ মিটার স্প্রিন্টে সোনা জিতে জানিয়ে দিয়েছেন দেশে ফেরাটা তার এমনি এমনি নয়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। টানা তিনবার দ্রুততম মানবের খেতাব দখল করে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। ঘরোয়া ক্রীড়াঙ্গনের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও যে দেশের পতাকা মেলে ধরার যোগ্য তিনি, সেটার প্রমাণ মিললো কাজাখস্তানে। এশিয়ান ইনডোর অ্যাথলেটিকসে ৬০ মিটার স্প্রিন্টে সোনা জিতে ইতিহাস গড়েছেন। কারণ, দেশের হয়ে এমন কীর্তি আগে কেউই করতে পারেননি।

চারদিক থেকে অভিনন্দন বৃষ্টিতে ভেজা ইমরানুরকে সকালে হোয়াটসঅ্যাপে পাওয়া গেলো। তখন তিনি হোটেলের লবিতে বসেছিলেন। সোনার জেতার পরে প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ছাড়াও বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেছেন। সিলেটের আঞ্চলিক টানে কখনও বাংলায় কিংবা ইংরেজিতে কথা বলা ইমরানুরের সাক্ষাৎকার নিচে তুলে ধরা হলো-

প্রশ্ন: বাংলাদেশের হয়ে এশিয়ান পর্যায়ে প্রথম সোনা জিতেছেন, নিশ্চয়ই এই আনন্দ অন্যরকম…

ইমরানুর: আসলেই এই আনন্দ কিংবা ভালোলাগা অন্যরকম, ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। অনেক দিন ধরে এর জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। অবশেষে সাফল্য ধরা দিয়েছে।

প্রশ্ন: চারদিক থেকে অভিনন্দন বার্তা কেমন পাচ্ছেন?

ইমরানুর: সবাই বাহবা দিচ্ছেন, প্রশংসা করছেন। বাংলাদেশ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা পেয়েছি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে। আমার জন্য এটা বড় প্রাপ্তি। এছাড়া মিডিয়া থেকে শুরু করে অন্যরা তো আছেই।

প্রশ্ন: লন্ডনে বাবা-মা কিংবা স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে? তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন।

ইমরানুর: আমার বাবা-মা সবসময় চাইতেন দেশের জন্য যেন কিছু করতে পারি। তাই তো দেশের হয়ে খেলার জন্য ২০২১ সালে ঢাকায় প্রথমবার আসা। এখন সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। প্রথমবারের মতো পদক জিতেছি। বাবা, মা অনেক খুশি। স্ত্রীসহ অন্যরাও।

প্রশ্ন: কাজাখস্তানে আপনি দেশের হয়ে সোনার পদক জিতবেন। এমনটি ঠিক কোন মুহূর্তে প্রত্যাশা করেছিলেন?

ইমরানুর: কাজাখস্তানে ভালো কিছু করার লক্ষ্য নিয়ে এসেছিলাম। তবে এতটা ভালো করতে পারবো বলে আশা করিনি। এখানে শুরু থেকে ভালো করছিলাম, হিটে প্রথম হই। সেমিফাইনালে ফটো ফিনিশে দ্বিতীয়। ফাইনালে আরও আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে নিজের সেরাটুকু দিতে পারলে ভালো কিছু হবে। হয়েছেও তাই। আমি আসলে ভয় পাইনি।

প্রশ্ন: জাপান, কাতার, ভারত ও চীনের অ্যাথলেটদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে প্রথম হয়েছেন। সোনা জেতার পর ওরা কী বলেছে?

ইমরানুর: প্রথম হওয়ার পর ওরাও অবাক হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে এসে সোনার পদক জিততে পারবো তা হয়তো ভাবতে পারেনি। দৌড় শেষে ওরা অভিনন্দন জানালো, প্রশংসা করলো।

প্রশ্ন: আপনি তো ফুটবল খেলতেন। স্কুল পর্যায়ে শুরু করেন ফুটবলের চর্চা। এরপর ১৬-১৭ বছর বয়সে অ্যাথলেটিকসে। ফুটবল ছেড়ে অ্যাথলেটিকস কেন বেছে নিলেন?

ইমরানুর: আসলে দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিক হয়ে ইংল্যান্ডের ফুটবলে কিছু করা বেশ কঠিন। তাই একপর্যায়ে ফুটবল ছেড়ে অ্যাথলেটিকসে মনোযোগ দিয়েছি। এখন আমি অনেকটা সফল বলতে পারেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের জন্য পদক জিততে পেরেছি।

প্রশ্ন: ৩০ বছর বয়সী ইমরানুরকে ঘিরে স্বপ্ন আরও প্রসারিত হলো। সামনে কী করতে চান?

ইমরানুর: সামনে আরও ভালো কিছু করতে চাই। দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশকে সোনা জেতাতে চাই। এশিয়ান গেমসেও ভালো করতে চাই। আর অলিম্পিকের মতো বড় প্রতিযোগিতায় ভালো করার বড় স্বপ্ন তো আছেই।

প্রশ্ন: আরও বড় পরিসরে ভালো করতে চাইছেন। কিন্তু সেই পথ তো আরও কঠিন।

ইমরানুর: হ্যাঁ, অনেক কঠিন। আরও ভালো করতে হলে হাইপারফরম্যান্স ট্রেনিং লাগবে। ২৪ ঘণ্টাই আমাকে অ্যাথলেটিকস নিয়ে থাকতে হবে।

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি তো লন্ডনের শেফিল্ডে দুটো চাকরি সামলে অ্যাথলেটিকসে আছেন। পুরোদমে অ্যাথলেটিকসে মনোযোগ দিতে হলে তো চাকরি করা কঠিন হয়ে যাবে…

ইমরানুর: হ্যাঁ, তা তো হবেই। সামনের দিকে ভালো করতে হলে পুরোদমে মনোযোগ দেওয়া ছাড়া কোনও বিকল্প নেই। এখন চাকরি করে জিম ও অনুশীলন করতে হয়। অবসর তো একদমই পাই না। লন্ডনে আমার কোচ আছে। তার অধীনে অনুশীলন করতে হচ্ছে। এর পেছনেও অনেক অর্থ ব্যয় হয়।

তবে অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন, অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন বিষয়টি দেখছে। আশা করছি সমাধান বের হবে। কেননা, হাইপারফরম্যান্স ট্রেনিং না হলে সামনের দিকে পদক জেতা কঠিন। এই যেমন শ্রীলঙ্কার অ্যাথলেট আবেকুন ইতালিতে দীর্ঘমেয়াদে অনুশীলনে রয়েছে। আমাদেরও এমনটি প্রয়োজন।

প্রশ্ন: আজ সন্ধ্যায় সোনার পদক আনুষ্ঠানিকভাবে পাবেন। নিশ্চয়ই পোডিয়ামে উঠে তা গলায় পরার জন্য অধীর অপেক্ষায় আছেন?

ইমরানুর: তা তো অবশ্যই। এই পদকের জন্যই তো পরিশ্রম করে আসছি। সৃষ্টিকর্তার কৃপায় পদক এসেছে।

সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন, যেন সামনে দেশের মুখ আরও উজ্জ্বল করতে পারি।