৫৪ বছর পর মহাকাশ থেকে পৃথিবীর নতুন ছবি

৫৪ বছর পর পৃথিবীর নতুন ছবি

চাঁদের উদ্দেশে যাত্রা করা নাসার আর্টেমিস-২ মিশনের নভোচারীরা এখন পৃথিবী ও চাঁদের মাঝামাঝি অবস্থানে পৌঁছেছেন। এ সময় তারা মহাকাশ থেকে পৃথিবীর প্রথম উচ্চ-রেজোলিউশনের কিছু ‘দৃষ্টিনন্দন’ ছবি তুলেছেন, যা ইতোমধ্যেই প্রকাশ করেছে নাসা।

মিশনের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান এসব ছবি ধারণ করেন। নাসা জানিয়েছে, চূড়ান্ত ইঞ্জিন বার্ন সম্পন্ন করার পরই এই ছবিগুলো তোলা হয়, যা মহাকাশযানকে চাঁদের দিকে সঠিক পথে এগিয়ে দেয়।

নাসার অনলাইন ড্যাশবোর্ড অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল প্রায় ৭টা নাগাদ ওরিয়ন মহাকাশযানটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১ লক্ষ ৪২ হাজার মাইল (২,২৮,৫০০ কিলোমিটার) এবং চাঁদ থেকে ১ লক্ষ ৩২ হাজার মাইল দূরে অবস্থান করছিল।

নভোচারী ক্রিস্টিনা কখ জানান, এই গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পর্শ করার খবর পেয়ে পুরো দলের মধ্যে ‘আনন্দের অভিব্যক্তি’ ছড়িয়ে পড়ে। উৎক্ষেপণের প্রায় দুই দিন পাঁচ ঘণ্টা ২৪ মিনিট পর তারা এই অবস্থানে পৌঁছান।

ওয়াইজম্যান ওরিয়ন মহাকাশযানের চারটি প্রধান জানালার একটি থেকে ‘আর্টেমিস ২ পৃথিবীর দিকে ফিরে তাকাচ্ছে’ শিরোনামের এই ছবিটিও তুলেছিলেন।

প্রকাশিত প্রথম ছবিটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘হ্যালো, ওয়ার্ল্ড’। ছবিতে দেখা যায়, পৃথিবীর বিশাল নীল জলরাশি আটলান্টিক মহাসাগর— যা বায়ুমণ্ডলের আলোয় বেষ্টিত। একইসঙ্গে দুই মেরুতে সবুজ অরোরা বা মেরুজ্যোতিও দৃশ্যমান।

ছবিতে পৃথিবীকে উল্টোভাবে দেখা যাচ্ছে— বাম দিকে পশ্চিম সাহারা ও আইবেরিয়ান উপদ্বীপ, আর ডানদিকে দক্ষিণ আমেরিকার পূর্বাংশ। নিচের ডানদিকে উজ্জ্বল একটি গ্রহও দেখা যায়, যেটিকে নাসা শুক্র গ্রহ হিসেবে শনাক্ত করেছে।

এই ছবিগুলো তোলা হয় ট্রান্স-লুনার ইনজেকশন বার্ন সফলভাবে সম্পন্ন করার পর। এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি মহাকাশযানকে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বের করে চাঁদের দিকে যাত্রা শুরু করতে সহায়তা করে।

আর্টেমিস-২ এখন এমন একটি পথে রয়েছে, যা মহাকাশযানটিকে চাঁদের দূরবর্তী পাশ ঘুরিয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনবে। ১৯৭২ সালের পর এই প্রথম মানুষ পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে ভ্রমণ করছে।

আরেকটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, দিন ও রাতের বিভাজন রেখা।

ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণের পর পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৬ এপ্রিল তারা চাঁদের দূরবর্তী পাশ অতিক্রম করবে এবং ১০ এপ্রিল প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে।

মিশন স্পেশালিস্ট জেরেমি হ্যানসেন জানান, ইঞ্জিন বার্নের পর নভোচারীরা ‘জানালায় চোখ আটকে’ রেখে মহাকাশের ছবি তুলছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা পৃথিবীর অন্ধকার পাশের এক অসাধারণ দৃশ্য দেখছি, যা চাঁদের আলোয় আলোকিত।’

ছবি তুলতে গিয়ে জানালাগুলো নোংরা হয়ে যাওয়ায় সেগুলো কীভাবে পরিষ্কার করা যায়— এ নিয়েও পরে মিশন কন্ট্রোলকে জিজ্ঞাসা করেন কমান্ডার ওয়াইজম্যান।

প্রথমদিকে দূরত্বের কারণে পৃথিবীর ছবি তুলতে কিছুটা সমস্যায় পড়লেও পরে সেটি আর বাধা হয়ে থাকেনি। তিনি বলেন, ‘এটা যেন নিজের বাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে চাঁদের ছবি তোলার মতো অনুভূতি।’

পৃথিবী সূর্যকে সম্পূর্ণরূপে আড়াল করে দেওয়ায় রাতে আলো ঝলমল করে।

আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, পৃথিবী দিন ও রাতের মাঝামাঝি একটি সীমারেখায় বিভক্ত— যাকে ‘টার্মিনেটর’ বলা হয়। পরে প্রকাশিত আরেক ছবিতে প্রায় সম্পূর্ণ অন্ধকার পৃথিবীতে মানুষের তৈরি বৈদ্যুতিক আলোর ঝলক দেখা যায়।

তখন ও এখন: ১৯৭২ সালে (ডানে) এবং ২০২৬ সালে (বামে) পৃথিবী।

নাসা ২০২৬ সালের এই দৃশ্যের সঙ্গে ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো- ১৭ মিশনের তোলা ছবির তুলনাও প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি জানায়, ‘গত ৫৪ বছরে আমরা অনেক এগিয়েছি, কিন্তু একটি বিষয় বদলায়নি— মহাকাশ থেকে আমাদের পৃথিবী এখনও অপূর্ব সুন্দর।’

সূত্র: বিবিসি