ওয়্যারলেসের যুগেও কেন আবারও জনপ্রিয় হচ্ছে তারযুক্ত ইয়ারফোন?

২০১৬ সালে আইফোন ৭ থেকে ৩.৫ মিলিমিটার হেডফোন জ্যাক সরিয়ে ফেলার পর ধীরে ধীরে অন্যান্য শীর্ষ স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও একই পথে হাঁটে। তখন সবাই ধারণা করছিল, হেডফোন জ্যাকের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে তারযুক্ত হেডফোনের যুগেরও অবসান ঘটতে চলেছে। এমতাবস্থায়, ওয়্যারলেস ইয়ারবাড, হেডসেট, নেক-ব্যান্ড, বিশেষ করে ট্রু ওয়্যারলেস স্টেরিও (টিডাব্লুএস) ক্রমেই বাজার দখল করে নেয়। তবে হঠাৎ করে সম্প্রতি আবারও তারযুক্ত হেডফোনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। শুরুতে তারকাদের হাত ধরে আলোচনায় এলেও এখন সাধারণ ব্যবহারকারীরাও তারযুক্ত হেডফোনের দিকে ঝুঁকছে। শুধু নস্টালজিয়া নয়, এর পেছনে রয়েছে একাধিক প্রযুক্তিগত ও ব্যবহারিক কারণ। 

শব্দের মানে এখনো এগিয়ে তারযুক্ত হেডফোন

বিশেষজ্ঞদের মতে, তারযুক্ত হেডফোনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো লসলেস ও আনকমপ্রেসড অডিও। ব্লুটুথ হেডফোনে অডিও পাঠাতে ডেটা কমপ্রেস করতে হয়, ফলে অডিও প্লেব্যাকের সময় কিছু সূক্ষ্ম শব্দ হারিয়ে যেতে পারে। যদিও এলড্যাক, এপিটিএক্স লসলেস কিংবা এলসি৩-এর মতো আধুনিক কোডেক এই ব্যবধান অনেকাংশেই কমিয়েছে, তবুও সরাসরি কেবল সংযোগ এখনো সর্বোচ্চ মানের অডিও সরবরাহ করতে সক্ষম। তাই স্টুডিও মনিটরিং, অডিও এডিটিং কিংবা উচ্চমানের সংগীত শোনার ক্ষেত্রে তারযুক্ত হেডফোনই এখনো পেশাদারদের প্রথম পছন্দ। এছাড়া সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে সংগীত ও সিনেমা প্রেমী, গেমার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটাররাও এ কারণে তারযুক্ত হেডফোন ব্যবহার করে থাকেন।

চার্জের ঝামেলা নেই, লেটেন্সিও প্রায় শূন্য

ওয়্যারলেস ইয়ারবাডের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো ব্যাটারির ওপর নির্ভরশীলতা এবং এর লেটেন্সি। বাজেট অনুযায়ী একেক মডেলের ব্যাটারি ব্যাকাপ কম বেশি হয়ে থাকে, তবে চার্জ শেষ হলে ডিভাইস কার্যত অচল হয়ে যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে এক কানের ইয়ারফোন চললেও, আরেক কানের ব্যাটারি এককভাবে শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অপরদিকে তারযুক্ত হেডফোনে আলাদা ব্যাটারির প্রয়োজন নেই, শুধু প্লাগ-অ্যান্ড-প্লে। একইসঙ্গে তারযুক্ত ইয়ারফোনে লেটেন্সি বা অডিও ডিলে প্রায় শূন্য হওয়ায় প্রায় সব গেমারদেরই এগুলো ব্যবহার করতে দেখা যায়। এছাড়া অন্যান্য মাল্টিমিডিয়া প্লেব্যাকের সময় লিপ সিংকের লেটেন্সির ঝামেলার কারণেও অনেকে তার সংযোগেই আস্থা রাখে।  

দাম কম, টেকসই বেশি

অডিও বিশেষজ্ঞদের মতে, একই দামের ওয়্যারলেস ইয়ারবাডের তুলনায় তারযুক্ত আইইএম (ইন ইয়ার মনিটর)–এ সাধারণত উন্নতমানের ড্রাইভার, ভালো সাউন্ড স্টেজ এবং বেশি ডিটেইল পাওয়া যায়। যেখানে মাত্র ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা খরচ করে বাংলাদেশ বাজারে ভালো মানের তারযুক্ত ইয়ারফোন পাওয়া যায়, সেখানে একই বা কাছাকাছি মানের তারবিহীন ইয়ারফোন কিনতে তার দিগুণ বা তিনগুণ অর্থ ব্যয় করতে হয় ক্রেতাকে। অনেক মডেলে বিচ্ছিন্নযোগ্য কেবল থাকায় কেবল নষ্ট হলেও পুরো হেডফোন বদলাতে হয় না। ফলে এগুলো হয় দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই।  

নতুন প্রজন্মের কাছে ‘রেট্রো’ ফ্যাশন

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, তারযুক্ত হেডফোনের প্রত্যাবর্তনের পেছনে শুধু প্রযুক্তিগত কারণ নয়, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও কাজ করছে। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই সম্প্রতি তাদের পছন্দের তারকাকে তারযুক্ত ইয়ারফোন ব্যবহার করতে দেখে প্রভাবিত হচ্ছে। অনেকে আবার তারযুক্ত ইয়ারফোনকে ‘ডিজিটাল ডিটক্স’–এর প্রতীক হিসেবে দেখছেন। ব্যাটারির চিন্তা নেই, ব্লুটুথ পেয়ারিংয়ের ঝামেলা নেই, রেঞ্জের বাধা নেই—সবমিলিয়ে জেন জি-দের আকৃষ্ট করছে নতুন এই ট্রেন্ড।

ওয়্যারলেস রেডিয়েশনের ভ্রান্তি

অনেকের তারযুক্ত হেডফোন ব্যবহারের পেছনে অন্যতম যুক্তি হলো ব্লুটুথ ডিভাইসের রেডিয়েশন এড়িয়ে চলা। ব্লুটুথ ইয়ারবাড নন-আয়নাইজিং রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি সিগন্যাল ব্যবহার করে কাজ করে, যার শক্তি স্মার্টফোনের তুলনায় অনেক কম। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্বাভাবিক ব্যবহারে ব্লুটুথ হেডফোনের ক্ষতিকারিতার নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই ভুল ধারণার বশবর্তী হয়েও কিছু স্বাস্থ্য সচেতন ব্যবহারকারী সতর্কতার অংশ হিসেবে ব্লুটুথের পরিবর্তে তারযুক্ত হেডফোন ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, কারণ এতে কোনো বেতার রেডিও সিগন্যালের প্রয়োজন হয় না।

তবে কি ওয়্যারলেস ইয়ারফোনের চাহিদা কমে যাচ্ছে? ব্যাপারটি মোটেও সত্যি নয়। তারবিহীন সংযোগের সুবিধা, সহজে বহন ও ব্যবহারযোগ্যতা, উন্নত নয়েজ ক্যানসেলেশনসহ নানা ফিচারের কারণে ওয়্যারলেস ইয়ারবাড এখনও জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এমনকি বর্তমান বাজার পর্যালোচনায়, ওয়্যারলেস ইয়ারফোনই এগিয়ে থাকবে। তবে এমন নানান দিক বিবেচনায়, তারযুক্ত ইয়ারফোন আবারও ব্যবহারকারীদের মাঝে জায়গা করে নিচ্ছে।