এআই লেখা চিনতে ‘অদৃশ্য জলছাপ’ দিচ্ছে অ্যানথ্রোপিক, কঠিন হচ্ছে নকল

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি কনটেন্ট শনাক্ত করা সহজ করতে নিজেদের এআই প্ল্যাটফর্ম ক্লড-এ ওয়াটারমার্ক যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে অ্যানথ্রোপিক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন স্বচ্ছতা নীতিমালা মেনে চলতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যবহারকারীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

অ্যানথ্রোপিকের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ক্লড-এর মাধ্যমে তৈরি এআই-নির্মিত লেখা, ছবি ও ফাইলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওয়াটারমার্ক যুক্ত হবে। লেখার ক্ষেত্রে এটি এমনভাবে যুক্ত করা হবে, যা সাধারণভাবে চোখে দেখা যাবে না।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, সমর্থিত ক্লড মডেল কোনো লেখা তৈরি করলে ওয়াটারমার্কটি লেখার মধ্যেই অদৃশ্যভাবে সংযুক্ত হয়ে যাবে। এতে লেখার অর্থ, মান বা পাঠযোগ্যতায় কোনো পরিবর্তন হবে না। এমনকি লেখা কপি করে অন্যত্র পেস্ট করলেও ওয়াটারমার্কটি থেকে যেতে পারে এবং কিছু ধরনের সম্পাদনার পরও তা টিকে থাকতে পারে।

শুধু ইউরোপে নয়, বিশ্বজুড়েই ক্লড-এর যেসব প্ল্যাটফর্মে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, সেখানেই ওয়াটারমার্ক চালু করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ক্লড প্লাটফর্ম এপিআই, ক্লড কোড, ক্লড কোওয়ার্ক এবং ক্লড ট্যাগ।

শিক্ষার্থীদের এআই-নির্ভর নকল ঠেকাতে সহায়ক হতে পারে

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট, প্রবন্ধ ও অন্যান্য শিক্ষামূলক কাজে এআই ব্যবহার করে নকল করার প্রবণতা নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্বেগ বেড়েছে। অনথ্রোপিকের নতুন উদ্যোগ এ ধরনের এআই-নির্ভর প্রতারণা শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে ওয়াটারমার্কিংয়ের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অনলাইন ফোরামগুলোতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কিছু ক্লড ব্যবহারকারী। রেডিটের এক ব্যবহারকারী এটিকে অ্যানথ্রোপিকের বড় ভুল বলে মন্তব্য করেন। তার দাবি, লেখায় এমন একটি চিহ্ন থাকলে সেটি বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি বা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আরেক ব্যবহারকারী ক্লডের তৈরি কাজে ওয়াটারমার্ক যুক্ত করাকে ‘অনৈতিক’ বলে সমালোচনা করেছেন।

ওয়াটারমার্ক শনাক্তকরণে সীমাবদ্ধতাও আছে

অ্যানথ্রোপিক নিজেই স্বীকার করেছে, তাদের এআই-নির্মিত কনটেন্ট শনাক্তকরণ ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে কোনো লেখা ব্যাপকভাবে সম্পাদনা, পুনর্লিখন, অনুবাদ বা অন্য লেখার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হলে শনাক্তকরণ কঠিন হতে পারে। খুব ছোট কোনো লেখার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ইইউর নতুন এআই স্বচ্ছতা উদ্যোগের লক্ষ্য হলো মানুষ যাতে মানবসৃষ্ট এবং এআই-নির্মিত কনটেন্টের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে এবং এআই কনটেন্টের কারণে বিভ্রান্ত না হয়। ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে, প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে এ উদ্যোগের প্রতি শক্তিশালী সমর্থন পাওয়া গেছে।

জুলাইয়ের শেষ নাগাদ প্রায় ২০০টি প্রতিষ্ঠান ইইউর স্বচ্ছতা নীতিমালা মেনে চলার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অ্যানথ্রোপিকের পাশাপাশি ওপেনএআই, মেটা, গুগল এবং মাইক্রসফটও এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে।

ইইউ বলেছে, এই নীতিমালায় স্বাক্ষরের মাধ্যমে জেনারেটিভ এআই সেবাদাতা ও ব্যবহারকারীরা এআইয়ের প্রতি জনসাধারণের আস্থা বাড়ানো এবং প্রতারণা ও ভুল তথ্যের ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করেছে।

‘এআই স্লপ’ নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ

অ্যানথ্রোপিকের এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন নিম্নমানের বা ব্যাপকভাবে এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টকে অনেকে ‘এআই স্লপ’ হিসেবে অভিহিত করছেন। একই সঙ্গে এআই দিয়ে তৈরি লেখা বা অন্যান্য কনটেন্টকে মানুষের তৈরি বলে উপস্থাপনের বিষয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

সম্প্রতি এক নবীন ঔপন্যাসিকের ২০ লাখ ডলারের বই প্রকাশনা চুক্তি বাতিল করা হয়। প্রকাশকের মধ্যে লেখক তার পাণ্ডুলিপি তৈরিতে এআই ব্যবহার করেছেন—এমন উদ্বেগ তৈরি হওয়ার পর চুক্তিটি বাতিল করা হয়েছিল।

তবে সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ওয়াটারমার্কিংয়ের এই ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রযুক্তি সম্পর্কে দক্ষ ব্যবহারকারীরা এর বিকল্প পথ খুঁজে নিতে পারেন বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে।

একজন ব্যবহারকারীর ভাষায়, ক্লড-এর ওয়াটারমার্কিং ব্যবস্থা আসলে কী সমস্যার সমাধান করবে, তা স্পষ্ট নয়। কারণ ইতোমধ্যে ওয়াটারমার্কবিহীন বেশ কিছু বিনা মূল্যের ও ওপেন-সোর্স এআই মডেল রয়েছে। ফলে যারা ওয়াটারমার্ক এড়াতে চান, তারা অন্য মডেল ব্যবহার করতে পারেন।

সূত্র: নিউ ইয়র্ক পোস্ট