এআই ডেটা সেন্টার ঠান্ডা করতে ‘প্রস্রাব’, কেন এমন অদ্ভুত বিজ্ঞাপন

এআই ডেটা সেন্টারে পানির ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে যখন উদ্বেগ ও সমালোচনা বাড়ছে, তখন ব্যঙ্গাত্মক এক বিজ্ঞাপন সামনে এনেছে এক উদ্ভট সম্ভাব্য সমাধান। মার্কিন বেভারেজ ব্র্যান্ড গ্যারেজ বিয়ার ও লিকুইড ডেথ সাবেক ন্যাশনাল ফুটবল লীগ (এনএফএল) তারকা জেসন কেলসিকে নিয়ে এমন একটি প্রচারণা চালিয়েছে, যেখানে মজার ছলে এআই ডেটা সেন্টার ঠান্ডা রাখতে মানুষের মূত্র ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। ১৮ আগস্ট প্রকাশিত বিজ্ঞাপনটির মূল লক্ষ্য ডেটা সেন্টারে পানির ব্যবহার ও এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

‘আমরা আপনার প্রস্রাব চাই’, শিরোনামের বিজ্ঞাপনটি শুরু হয় জেসন কেলসির বক্তব্য দিয়ে। সেখানে তিনি বলেন, এআই ডেটা সেন্টার সার্ভার ঠান্ডা করতে লাখ লাখ গ্যালন পানি ব্যবহার করে। এরপরই তিনি জানান, এই সমস্যা সমাধানে লিকুইড ডেথ ও গ্যারেজ বিয়ার একসঙ্গে কাজ করছে এবং ডেটা সেন্টার ঠান্ডা করতে তারা মানুষের প্রস্রাব চায়।

এরপর বিজ্ঞাপনটিতে বিষয়টিকে আরও হাস্যরসাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়। কেলসি গানের মাধ্যমে মানুষকে প্রস্রাব দেওয়ার আহ্বান জানান। বলা হয়, প্রচুর পরিমাণে প্রস্রাব প্রয়োজন এবং মানবজাতিকে বাঁচাতে সবাইকে একসঙ্গে ‘কম্পিউটারে প্রস্রাব’ করতে হবে। বিজ্ঞাপনে দর্শকদের গ্যারেজ বিয়ার বা লিকুইড ডেথ স্পার্কলিং এনার্জি পান করে সেই প্রস্রাব পছন্দের এআই ডেটা সেন্টারে পাঠাতে বলা হয়।

এমনকি প্রচারণার অংশ হিসেবে ‘ডেটা সেন্টার কুল্যান্ট কালেক্টর’ নামে ঢাকনাযুক্ত বিশেষ মগও দেখানো হয়েছে। বিজ্ঞাপনে বিভিন্ন মানুষকে এসব পাত্র হাতে নিয়ে প্রস্রাব সংগ্রহ করতে এবং ডেটা সেন্টারে পাঠানোর প্রস্তুতি নিতে দেখা যায়। পুরো বিষয়টিই মূলত ব্যঙ্গ ও রসিকতার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তবে বিজ্ঞাপনের এই ‘প্রস্রাব দিয়ে কম্পিউটার ঠান্ডা’ করার ধারণা বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপনটি আলোচনায় আসার পর প্রশ্ন উঠেছে, প্রস্রাব বা অন্যান্য বর্জ্যপানি পরিশোধন করে সত্যিই কি ডেটা সেন্টারের কুলিং ব্যবস্থায় ব্যবহার করা সম্ভব?

প্রযুক্তিগতভাবে পরিশোধিত বর্জ্যপানি ডেটা সেন্টারের কুলিং ব্যবস্থায় ব্যবহার করা সম্ভব। তবে অপরিশোধিত মূত্র সরাসরি ব্যবহার বাস্তবসম্মত নয়। এর জন্য প্রয়োজন সঠিকভাবে সংগ্রহ ও পরিশোধন, পানির রাসায়নিক গুণমান নিয়ন্ত্রণ এবং উপযুক্ত সরবরাহ অবকাঠামো।

বর্তমানে এআইভিত্তিক কম্পিউটিং দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে ডেটা সেন্টারের সংখ্যাও। এআই সার্ভার ও জিপিইউ দীর্ঘ সময় উচ্চ ক্ষমতায় কাজ করার সময় প্রচুর তাপ তৈরি করে। সেই তাপ কমাতে অনেক ডেটা সেন্টারে পানি-নির্ভর কুলিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।

এ ধরনের ব্যবস্থায় পানি বাষ্পীভূত হয়ে তাপ সরিয়ে নেয়। ফলে এআই কম্পিউটিংয়ের সক্ষমতা যত বাড়ছে, ডেটা সেন্টারে পানির প্রয়োজনও তত বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পানির সরবরাহ সীমিত, সেখানে বড় ডেটা সেন্টারের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার স্থানীয় পানির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে পুনর্ব্যবহৃত বর্জ্যপানি, গ্রে-ওয়াটার এবং শিল্প ব্যবহারের উপযোগী পরিশোধিত পানি ডেটা সেন্টারের কুলিংয়ের সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রয়োজনীয় পরিশোধন ও রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এসব পানি কুলিং ব্যবস্থায় ব্যবহার করা সম্ভব।

অর্থাৎ, জেসন কেলসির ‘প্রস্রাব দিয়ে কম্পিউটার ঠান্ডা’ করার রসিকতার বাস্তব প্রযুক্তিগত রূপ হতে পারে পানযোগ্য পানির পরিবর্তে পরিশোধিত বর্জ্যপানি ব্যবহার। বিজ্ঞাপনটি নিজে কোনো বাস্তব কুলিং প্রযুক্তির প্রস্তাব নয়; বরং এআই ডেটা সেন্টারের পানি ব্যবহারের বিষয়টি হাস্যরসের মাধ্যমে সামনে আনার একটি প্রচেষ্টা। বিজ্ঞাপনটির নির্মাতারাও এটিকে এমন একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

তবে শুধু পানির উৎস পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বর্জ্যপানি সংগ্রহ ও পরিশোধনের জন্য প্রয়োজন পাইপলাইন, শোধনাগার, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ অবকাঠামো। বিশেষ করে যেখানে বড় ডেটা সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে, সেখানে পর্যাপ্ত পুনর্ব্যবহৃত পানি সরবরাহের ব্যবস্থা না থাকলে প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভাব্য সমাধানও বাস্তবে প্রয়োগ করা কঠিন।

অন্যদিকে, ডেটা সেন্টারের পানি নির্ভরতা কমানোর আরেকটি পথ হলো ক্লোজড-লুপ লিকুইড কুলিং। এতে সার্ভার বা জিপিইউর কাছাকাছি তরল কুল্যান্ট ঘুরিয়ে তাপ সরানো হয় এবং একই তরল বারবার ব্যবহার করা যায়। সরাসরি চিপে তরল পৌঁছে দেওয়ার ডিরেক্ট-টু-চিপ কুলিং প্রযুক্তিও দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে।

এসব ব্যবস্থায় প্রচলিত বাষ্পীভবনভিত্তিক কুলিংয়ের তুলনায় পানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তবে উন্নত কুলিং প্রযুক্তির প্রাথমিক স্থাপন ব্যয় অত্যাধিক হওয়ায় দ্রুত বাড়তে থাকা এআই অবকাঠামো তৈরির সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যয়, নির্মাণের গতি, বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং পানি সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই সব সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পড়ে প্রকৃতির ওপর।