বর্তমানে অনলাইনে অসংখ্য ডিজিটাল মেসেজিং অ্যাপ থাকলেও বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা অন্যতম তিনটি অ্যাপ- হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ও টেলিগ্রাম। প্রতিনিয়ত কোটি কোটি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ফোনালাপ, অফিশিয়াল ডেটা, ছবি বা ভিডিও, আর্থিক লেনদেনের নথিপত্রসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদির গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা রক্ষা করে অনলাইন যোগাযোগমাধ্যমগুলো। ফিচারের ভিন্নতায় একেক জনের পছন্দের তালিকায় একেক অ্যাপ শীর্ষে থাকলেও, সকলের কাছেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায় ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা। ফিচারগত দিক থেকে হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ও টেলিগ্রাম প্রায় কাছাকাছি হলেও, এগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রয়েছে সূক্ষ্ম ভিন্নতা।
এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন কী
মেসেজিং অ্যাপের নিরাপত্তা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন। এই ফিচারটি প্রেরকের ডিভাইস থেকে পাঠানো এনক্রিপ্টেড বার্তা বা কল শুধুমাত্র প্রাপকের ডিভাইসেই ডিক্রিপ্ট হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে। অর্থাৎ, এই পুরো প্রক্রিয়ায় মাঝপথে কোনো হ্যাকার, ইন্টারনেট সেবাদাতা, এমনকি প্ল্যাটফর্ম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানও সেই ডেটার বিষয়বস্তু দেখতে বা পড়তে পারে না। তবে এটি শুধু যোগাযোগের বিষয়বস্তু সুরক্ষিত রাখে; কার সঙ্গে, কখন, কতবার বা কতক্ষণ যোগাযোগ হয়েছে—এ ধরনের মেটাডেটা প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা অনুযায়ী আলাদাভাবে সংরক্ষিত হতে পারে।
হোয়াটসঅ্যাপ
বর্তমানে ৩০০ কোটিরও বেশি মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্বের সবচেয়ে বড় মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম। ব্যক্তিগত ও গ্রুপ চ্যাট, অডিও এবং ভিডিও কল; সব ক্ষেত্রেই এটি সিগন্যাল প্রোটোকল-ভিত্তিক এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন ডিফল্টভাবে ব্যবহার করে।
এই অ্যাপে নিরাপত্তা সুবিধার মধ্যে রয়েছে, সব ব্যক্তিগত বার্তা ও কলে ডিফল্ট এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন; সিগন্যাল প্রোটোকল-ভিত্তিক এনক্রিপশন; টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন; এনক্রিপ্টেড ক্লাউড ব্যাকআপ সুবিধা; চ্যাট লক ও ডিসাপিয়ারিং মেসেজ এবং পাস-কি সমর্থন।
হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার বিষয়বস্তু দেখতে না পারলেও ব্যবহারকারীর ডিভাইস, আইপি ঠিকানা, যোগাযোগের সময় এবং অন্যান্য মেটাডেটা সংগ্রহ করে। ২০১৯ সালে পেগাসাস স্পাইওয়্যার একটি সফটওয়্যার দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে কিছু ব্যবহারকারীর ফোনে নজরদারির সুযোগ পেয়েছিল। যদিও এতে হোয়াটসঅ্যাপের এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন ফিচারটি বিঘ্নিত হয়নি, ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয় এবং পরবর্তীতে মেটা দ্রুত নিরাপত্তা ত্রুটি সংশোধন করে।
ফেসবুক মেসেঞ্জার
ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী ৯০ কোটিরও বেশি। আগে ব্যক্তিগত চ্যাটে ডিফল্ট এনক্রিপশন না থাকায় সমালোচিত হলেও বর্তমানে ব্যক্তিগত বার্তা ও কলে এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন ডিফল্টভাবে চালু রয়েছে।
এই অ্যাপের নিরাপত্তা সুবিধায় পাবেন, শুধু ব্যক্তিগত চ্যাট ও কলে ডিফল্ট এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন; সিকিউর স্টোরেজের মাধ্যমে এনক্রিপ্টেড ব্যাকআপ; টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন এবং লগইন এলার্ট ও সিকিউরিটি চেকআপ।
মেসেঞ্জারের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি মেটা-এর বৃহত্তর ইকোসিস্টেমের অংশ। ফলে ব্যবহারকারীর ডিভাইস, অবস্থান, অ্যাকাউন্ট ব্যবহার এবং অন্যান্য মেটাডেটা তুলনামূলক বেশি সংগ্রহ করা হয়। ২০২১ সালে প্রায় ৫৩ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য অনলাইনে প্রকাশ পাওয়ার ঘটনায় মেসেঞ্জার-সংশ্লিষ্ট তথ্যও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীকালেও এমন অভিযোগ কাটিয়ে উঠে মেটা, অ্যাপটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠিন করার মাধ্যমে।
টেলিগ্রাম
প্রায় ১০০ কোটি মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী নিয়ে টেলিগ্রাম দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। বড় গ্রুপ, পাবলিক চ্যানেল, ক্লাউড সিঙ্ক এবং বড় আকারের ফাইল শেয়ারিংয়ের সুবিধার কারণে এটি অনেক ব্যবহারকারীর পছন্দের প্ল্যাটফর্ম।
এই প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা সুবিধায় আছে, শুধু সিক্রেট চ্যাটে এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন; সেলফ-ডিস্ট্রাক্ট মেসেজ; টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন; পাসকোড লক এবং বড় গ্রুপ, চ্যানেল ও প্রিইভেসি কন্ট্রোল।
টেলিগ্রামের সাধারণ ব্যক্তিগত চ্যাট ডিফল্টভাবে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড নয়; শুধুমাত্র সিক্রেট চ্যাট ব্যবহার করলেই E2EE সক্রিয় হয়। সাধারণ চ্যাট টেলিগ্রামের ক্লাউডে সংরক্ষিত থাকে, যাতে একাধিক ডিভাইস থেকে সহজে ব্যবহার করা যায়। নিরাপত্তা গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরেই অ্যাপটির নিজস্ব এমটিপ্রোটো এনক্রিপশন এবং ক্লাউড-ভিত্তিক চ্যাট ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া অবৈধ কনটেন্ট, প্রতারণা এবং অপরাধমূলক কার্যক্রমে ব্যবহৃত কিছু পাবলিক চ্যানেল নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্ল্যাটফর্মটি একাধিকবার আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছে।
তাহলে কোনটি সবচেয়ে নিরাপদ
তিনটি প্ল্যাটফর্মই বর্তমানে শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করলেও তাদের অগ্রাধিকার এক নয়। কেবল ব্যক্তিগত বার্তা ও কলের গোপনীয়তাকে বিবেচনা করলে হোয়াটসঅ্যাপ তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে নিরাপদ, কারণ এটি সব কল বা ডেটা শেয়ারিং এই এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন সুবিধা ব্যবহার করে।
মেসেঞ্জার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করলেও মেটা-এর অতিরিক্ত মেটাডেটা সংগ্রহের কারণে গোপনীয়তা নিয়ে ব্যবহারকারীদের মাঝে সংশয় পুরোপুরি দূর করতে পারেনি। অন্যদিকে টেলিগ্রামের বড় কমিউনিটি, চ্যানেল এবং ক্লাউডভিত্তিক সুবিধার জন্য সম্প্রতি জনপ্রিয় হলেও এর মাধ্যমে করা পাইরেসি, অবৈধ ও প্রতারণামূলক কার্যক্রম ব্যবহারকারীর নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই নিরাপত্তার প্রাধান্যে শীর্ষে থাকবে হোয়াটসঅ্যাপ। তুলনামূলকভাবে মেসেঞ্জারও টেলিগ্রামের চেয়ে ব্যবহারকারীর ডিজিটাল নিরাপত্তা রক্ষায় বেশি সক্রিয় এবং সফল।
প্রয়োজনের সুবিধার্থে ও ব্যাক্তিগত পছন্দমতে এই তিনটি অ্যাপের যেকোনোটিই হতে পারে যথার্থ কার্যকর এবং নিরাপদ। তবে যেকোনো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারেই টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার এবং সন্দেহজনক লিংক এড়িয়ে চলাই ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।