এল নিনোর প্রভাবে আগামী শীতেও বাড়তে পারে গরমের তীব্রতা। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) পূর্বাভাস অনুযায়ী, বছরের শেষ দিকে এল নিনো শক্তিশালী অবস্থায় পৌঁছাতে পারে। এরই মধ্যে ক্লাইমেট ইমপেক্ট ল্যাবের এক গবেষণায় আশঙ্কা করা হয়েছে, এর প্রভাবে বাংলাদেশে সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অতিরিক্ত তাপজনিত কারণে ৬০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। তবে এটি নিশ্চিত মৃত্যুর পূর্বাভাস নয়, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় সম্ভাব্য অতিরিক্ত মৃত্যুর মডেলভিত্তিক হিসাব।
প্রসঙ্গত, এল নিনো এমন একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়। এটি বৃহত্তর জলবায়ুগত একটি চক্রের অংশ, যাকে এল নিনো বা ‘দক্ষিণী দোলন’ বলা হয়। এই প্রক্রিয়ায় সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডল একসঙ্গে কাজ করে বৈশ্বিক আবহাওয়ার ওপর প্রভাব ফেলে।
স্বাভাবিক সময়ে বায়ুপ্রবাহ উষ্ণ পানি পশ্চিম দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এল নিনোর সময় এই প্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে বা দিক পরিবর্তন করে। ফলে উষ্ণ পানি পূর্বদিকে জমা হতে থাকে এবং সেখান থেকেই আবহাওয়ার বড় পরিবর্তন শুরু হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) জানিয়েছে, ১৯৫০ সালে রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে চলেছে। এতে বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে বলে জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।
ডব্লিউএমও গত ৩ সেপ্টেম্বর জেনেভা থেকে দেওয়া পূর্বাভাসে জানিয়েছে, এল নিনো ২০২৬ সালের শেষ দিকে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থায় পৌঁছাতে পারে এবং ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ। সংস্থাটি বলছে, এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে।
বাংলাদেশে কতটা ঝুঁকি
গত ২২ সেপ্টেম্বর ক্লাইমেট ইমপেক্ট ল্যাবের প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত বাংলাদেশে ৬০০ জনের বেশি অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যু হতে পারে। এর মধ্যে খুলনায় প্রায় ৩১০ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে।
গবেষণার এই সংখ্যা নিশ্চিতভাবে কতজন মারা যাবেন, তার পূর্বাভাস নয়। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় সম্ভাব্য অতিরিক্ত মৃত্যুর মডেলভিত্তিক হিসাব।
এল নিনো প্রাকৃতিক জলবায়ুচক্রের একটি অংশ, যার ফলে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনো ও লা নিনা হলো প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রের পানির তাপমাত্রার বিপরীত দুই অবস্থা। এল নিনো হলে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের সমুদ্রের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গরম হয়ে যায়। এতে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের স্বাভাবিক আবহাওয়ার ধরন বদলে যেতে পারে। কোথাও বেশি গরম, কোথাও খরা, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি হতে পারে।
অন্যদিকে লা নিনা হলো এর প্রায় বিপরীত অবস্থা। এ সময় ওই অঞ্চলের সমুদ্রের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ঠান্ডা হয়ে যায়। এর ফলে বায়ুপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় এল নিনোর বিপরীত ধরনের আবহাওয়া দেখা দিতে পারে।
শুধু এল নিনোই দায়ী নয়
এল নিনোর প্রভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহ ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরন বদলে যায়। ফলে কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও খরা আবার কোথাও অতিরিক্ত গরমের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তবে বাংলাদেশের তাপমাত্রা বাড়ার পেছনে শুধু এল নিনোকে দায়ী করা ঠিক হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রার ভিত্তিই আগের তুলনায় বেশি হয়েছে। এর ওপর শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হলে অতিরিক্ত গরমের পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে।
তবে এই আশঙ্কার বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত। তিনি বলেন, ‘গরমে আমি তো এত মারা যাওয়া কখনো দেখিনি বাংলাদেশে।’
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে, যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বাড়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়ছে। এখন কেউ তাপমাত্রা কমাতে পারবে না। তবে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তা যেন ২ ডিগ্রির বেশি না বাড়ে, সে বিষয়ে বিশ্বের ৯৮টি দেশ একমত হয়েছে।
এল নিনো ও লা নিনো সম্পর্কে মানুষ জানলেও কেন এই দুই পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত করে বলা যায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘এল নিনো এলে গরম বাড়ে, লা নিনো এলে গরম কমে এটা সবাই এখন জানে।’
আইনুন নিশাত বলেন, এল নিনো এখন সক্রিয় থাকায় তাপমাত্রা বেশি হতে পারে। কিন্তু এর কারণে বাংলাদেশে কী পরিমাণ গরম পড়বে বা এতে কত মানুষ মারা যাবে, তা বলা সম্ভব নয়। তার মতে, এটি একটি অবাস্তব ব্যাখ্যা। তবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সামনে আরও তাপমাত্রা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনো সক্রিয় থাকবে, এটা সঠিক। এতে তাপমাত্রার তীব্রতা এবং গরমের অনুভূতি বেশি থাকবে, সেটাও ঠিক। তবে এল নিনোর প্রভাব সব শহর বা দেশে একই রকম হবে না।
তিনি বলেন, সাধারণত এল নিনোর প্রভাবে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল ছাড়াও প্রায় সারা বছর অতিরিক্ত গরম পড়তে পারে, শীতকালের মেয়াদ কমে আসতে পারে। আবার স্বল্প সময়ের জন্য অনেক বেশি বৃষ্টির প্রবণতাও দেখা যায়। এর মধ্যে কোনটি কোন দেশের ওপর পড়বে বা কোনো দেশে সবগুলোই পড়বে কিনা, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘এই গরমে মানুষ মারা যাবে কিনা তা এইভাবে ঢালাও বলা সম্ভব না।’ প্রতিবছর বিভিন্ন প্রতিবেদনে হিটস্ট্রোকে মৃত্যুর কথা আসে। কিন্তু এ নিয়ে কোনো হাসপাতালেই সঠিক তথ্য বা ডাটা নেই। অনেক সময় হিটস্ট্রোক বলা হলেও পরে দেখা যায়, ওই ব্যক্তির অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা ছিল।
তার মতে, তাই মৃত্যুর এই হিসাব নিশ্চিত করে বলা উচিত নয়। বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জলবায়ু ও আবহাওয়া নিয়ে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত গরমে বয়স্ক মানুষ, শিশু, বাইরে কাজ করা মানুষ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অতিরিক্ত তাপ হৃদ্যন্ত্র ও কিডনির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে এবং হৃদ্রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিকসহ খোলা জায়গায় শারীরিক পরিশ্রম করা মানুষদের ঝুঁকি বেশি। দীর্ঘ সময় রোদে থাকা, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম এবং পর্যাপ্ত পানি না খাওয়ার কারণে তাদের শরীরে অতিরিক্ত তাপ জমতে পারে। নিম্নআয়ের মানুষের বাসস্থানেও অতিরিক্ত গরম মোকাবিলার সুযোগ তুলনামূলক কম থাকতে পারে।
কখন বিপদ বুঝবেন
অতিরিক্ত গরমে মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, তীব্র তৃষ্ণা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব বা পেশিতে টান ধরার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ঠান্ডা জায়গায় গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া ও শরীরে পানির ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থা করা দরকার।
তবে শরীর অস্বাভাবিকভাবে গরম হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি, খিঁচুনি, অচেতন হয়ে যাওয়া বা তাপের মধ্যে ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে সেটি হিটস্ট্রোকের গুরুতর লক্ষণ হতে পারে। ডব্লিউএইচও এটিকে চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব ঠান্ডা করার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, হিটস্ট্রোকের প্রধান লক্ষণ হলো শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া, নাড়ির গতি বেড়ে যাওয়া, অবসন্নতা, মাথা ঘোরা, বমি বা বমি ভাব, চোখে আবছা দেখা ও অসংলগ্ন কথা বলা। জ্ঞান হারালে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
তীব্র গরমে বাইরে বের হলে সঙ্গে পানি ও প্রয়োজনে ওরস্যালাইন রাখার পরামর্শ দেন তিনি। প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে বা রং গাঢ় হলে পানি ও তরল খাবার বাড়াতে হবে। ঢিলেঢালা সুতি পোশাক ও ছাতা ব্যবহার করতে হবে। শ্রমজীবীদের নিয়মিত বিরতি নিয়ে পানি ও তরল খাবার খেতে হবে। রাস্তার পাশের খোলা সরবত বা পানি না খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
বয়স্ক, শিশু, অন্তঃসত্ত্বা ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. লেনিন। পাশাপাশি গরমে হঠাৎ ঠান্ডা পানি পান না করার পরামর্শও দেন তিনি।
বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে
এপি তাদের এক প্রতিবেদনে বলছে, এল নিনোর বছরগুলোতে প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকে। কয়েক বছর পরপর এই পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং এর ফলে প্রায়ই বিশ্বের আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আসে।
এ বছর এরই মধ্যে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিভাগের প্রধান কারেফ রাফিসুরা বলেন, জলবায়ু উষ্ণ হয়ে ওঠার মধ্যে আগস্টে বিশ্বের মহাসাগরগুলোর তাপমাত্রা নতুন রেকর্ডে পৌঁছেছে।