ফের বাড়লো খেলাপি ঋণের পরিমাণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। তিন মাস আগে—ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। এই হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৮ হাজার ৪০ কোটি টাকা। আর মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৯৮ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পুনঃতফসিল করা ঋণগুলোর একটা বড় অংশ আদায় না হওয়ার কারণে খেলাপির পরিমাণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক চেষ্টা করছে এ ঋণের পরিমাণ যেন ধীরে ধীরে কমে আসে। এজন্য সুপারভিশন বাড়ানো হয়েছে। মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে খেলাপি কমানোর জন্য একাধিকবার নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, খেলাপি কমানোর জন্য সাধারণত ডিসেম্বর ও জুনে ব্যাংকগুলো বেশি তৎপর থাকে। মার্চে বা সেপ্টেম্বরে এক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা থাকে। এরপরও খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়াটা ব্যাংকের জন্য ভালো কোনও বিষয় নয়। তিনি বলেন, খেলাপির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে তা কমানোর জন্য ব্যাংকগুলোকে আবার চাপ দেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, গত বছর ঋণ পুনঃতফসিল ও পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানোর কারণে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমেছিল।
কয়েকটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর মতে, পুনঃতফসিল করা ঋণও নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করেননি ব্যবসায়ীরা। এর ফলে খেলাপির পরিমাণ বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৫৪ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। এই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা।
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৫৪ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। জুন প্রান্তিকে ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণ ছিল ৫২ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা।
প্রসঙ্গত, গত ২ বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০১৫ সালে এসে দীর্ঘ মেয়াদে বড় ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ নিয়ে ১১টি গ্রুপের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করা হয়েছে।
৩৯টি বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ে ৬ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেশি। আলোচ্য সময়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএল-এর মোট ঋণের ২৪ দশমিক ২৭ শতাংশই খেলাপি ঋণ। এই সময়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএল-এর খেলাপি ঋণ বেড়ে ২৭ হাজার ২৮৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন: তিন শতাধিক কারখানা বন্ধের প্রক্রিয়ায়: নাটক নাকি বাস্তবতা!
৩ মাসে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ৩ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা বেড়ে ২৭ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা হয়েছে, যা ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ২৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। আগের প্রান্তিক শেষে ২৩ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা বা ২১ দশমিক ৪৬ শতাংশ ছিল খেলাপি।
রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। আগের প্রান্তিকে যেখানে ব্যাংকটির ২ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা ছিল খেলাপি, এখন তা ৫ হাজার ৪১ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা হয়েছে; যা মোট ঋণের ৫৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
সোনালীর খেলাপি ঋণ ৮ হাজার ১০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৮ হাজার ২৭২ কোটি টাকা হয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ হাজার ২২৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকে এখন খেলাপি ঋণ রয়েছে ১ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা। আগের প্রান্তিকে ছিল ১ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা ছিল। আর বিডিবিএলের খেলাপি ঋণ ৬৪৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৭৩৯ কোটি টাকা হয়েছে।
এদিকে, বেসরকারি ৩৯ ব্যাংকে মার্চ শেষে মোট ঋণের মধ্যে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ খেলাপি ঋণ। আলোচ্য সময়ে এই ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ হয়েছে ২৫ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। তিন মাস আগে ডিসেম্বর শেষে এই ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ ছিল ২০ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা।
বিদেশি ৯ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮২২ কোটি টাকায়। যা ওই ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ৭ দশমকি ৫১ শতাংশ।
খেলাপি ঋণ বেশি বেড়েছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর। ৩ মাসে খেলাপি ঋণ ৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা বেড়ে ২৫ হাজার ৩৩১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আগে যেখানে মোট ঋণের ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ খেলাপি ছিল, এখন তা বেড়ে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।
বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ঋণের ৭৫ দশমিক ৪০ শতাংশ এখন খেলাপি। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৩২ দশমিক ২১ শতাংশ ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া ন্যাশনাল, প্রাইম, সিটি ও উত্তরা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ রয়েছে ৯ শতাংশের ওপরে।
/এএইচ/এমএনএইচ/আপ-এনএস/







