নাজুক পরিস্থিতিতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ

গোলাম মওলা
০৬ জুন ২০১৬, ০৮:২১আপডেট : ০৬ জুন ২০১৬, ১৬:২১

প্রতীকী ছবি দেশের উন্নয়নে বেসরকারি বা ব্যক্তি খাতের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। অথচ এই খাতের বিনিয়োগ পরিস্থিতি খুবই নাজুক অবস্থায়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে হবেই। ব্যবসায়ীরাও বলছেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু কোনওভাবেই ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ছে না।
অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি বিনিয়োগ বাড়লে বেসরকারি খাতেও বিনিয়োগে গতি আসে। কিন্তু গত ৬ বছর সরকারি বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পরও ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২২ শতাংশের ঘরেই আটকে আছে।
আবার  ব্যাংক ঋণে সুদের হার কমলে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগমুখী হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। ব্যাংকে টাকা পড়ে আছে, সুদও কম, কিন্তু ব্যবসায়ীরা টাকা নিচ্ছেন না।
আরও পড়তে পারেন: হত্যা পরিকল্পিত, ‘মিল’ খুঁজে পাচ্ছে পুলিশ
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো সমস্যার কারণে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা বিনিয়োগে কম আগ্রহ দেখিয়েছেন। আর বিনিয়োগ না বাড়ায় কর্মসংস্থানও কম হয়েছে। ২০১৫ সালের মার্চের পর রাজনৈতিক পরিবেশ স্বাভাবিক থাকলেও বিনিয়োগে কাঙ্ক্ষিত গতি আসতে দেখা যায়নি।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জা আজিজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো সমস্যা এবং জমির সহজপ্রাপ্যতার অভাবে বিনিয়োগ খরা কাটছে না। বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য  সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশের নিশ্চয়তাসহ এসব সমস্যার সমাধান জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

বিনিয়োগ না হওয়ার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখনও অনেকে আস্থার সংকটে ভুগছেন। এছাড়া শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এবং এখনও ঠিকমতো সংযোগ না পাওয়ায় বিনিয়োগ প্রকল্প হাতে নিয়েও শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে গেছেন অনেকে। এর সঙ্গে আছে অনুন্নত অবকাঠামো।

অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৬ অনুযায়ী, দেশে এখন বিনিয়োগের হার জিডিপির ২৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ২০১১-১২ অর্থবছরে বিনিয়োগের হার ছিল ২৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। ৫ বছরে বিনিয়োগ বেড়েছে মাত্র  ১ শতাংশ।

২০১০-১১ অর্থবছরে দেশে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির ২২ শতাংশ ছাড়ায় (২২ দশমিক ১৪ শতাংশ)। ৬ বছর পর এখনকার বিনিয়োগের হার ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ কতটা নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে।

২০১০-১১ অর্থবছরে সরকারি বিনিয়োগের হার যেখানে ছিল ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ, সেখানে এ বছর তা বেড়ে ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। সাধারণত সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, রাস্তাঘাটসহ অন্যান্য অবকাঠামো খাতে বেশি বিনিয়োগ করে। এসব ক্ষেত্রে উন্নতি হলে ব্যবসায়ীরাও বিনিয়োগে আগ্রহী হন। কিন্তু সরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়ছে না।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকারি বিনিয়োগ মূল্যের দিক থেকে বাড়লেও গুণগত মানের দিক থেকে কমছে। এর ফলে বেসরকারি খাত বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না।
আরও পড়তে পারেন: সন্দেহের তীর জঙ্গিদের দিকে

অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে বিনিয়োগ বোর্ডে ৯৫৪টি দেশীয় বিনিয়োগ প্রকল্পের প্রস্তাব জমা পড়েছে। এতে বিনিয়াগ হবে ৫৩ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। আগের বছর বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা পড়ে ১ হাজার ৩০৯টি (৯১ হাজার ২৭৩ কোটি টাকার)।

নিবন্ধিত স্থানীয় বিনিয়োগের মধ্যে ঠিক কতগুলো বাস্তবায়িত হয় তার কোনও আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান নেই।

বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কোনও দিকনির্দেশনা নেই বলে মনে করছেন রফতানিকারকের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) প্রেসিডেন্ট আবদুস সালাম মুর্শেদী। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটে রফতানি খাতের উৎসে কর দেড় শতাংশ করায় রফতানিমুখী শিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থবির হবে, সক্ষমতা কমবে। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তিনি বলেন, আমরা আশা করেছিলাম বাজেটে বিনিয়োগের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকবে। কিন্তু বাস্তবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও গতিশীল করতে যথোপযুক্ত বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য করণীয় বিষয়সমূহের ওপর যথেষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়নি বাজেটে।

অন্যদিকে চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অর্থনৈতিক মূল্যায়নে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) জানিয়েছে, বর্তমানে অর্থনীতিতে বিনিয়োগে নানা ধরনের বাধা রয়েছে। ফলে বিনিয়োগ খুব কম হচ্ছে। এটাই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ খুবই প্রয়োজন। কারণ বিনিয়োগ বাড়লে দেশের কর্মসংস্থান বাড়বে। আয় বাড়বে। অর্থনীতি গতিশীল হবে।  দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নানান বাধা রয়েছে। গত এক বছরে দেশের বিনিয়োগের পরিবেশ আরও নিম্নমুখী হয়েছে। ফলে বিনিয়োগও হচ্ছে খুবই কম। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এ দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছে। তবে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে। কিন্তু সরকারি বিনিয়োগ দিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগের চাহিদা পূরণ করা যাবে না। এ অবস্থায় সরকারকে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য যথোপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে সহজ ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। ঝামেলামুক্ত বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে বিনিয়োগ বাড়বে না।

বিবিএসের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ঘর অতিক্রম করলেও জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমছে। বিবিএসের হিসাবে এবার চলতি বাজারমূল্যে জিডিপির পরিমাণ দাঁড়াবে ১৭ লাখ ২৯ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। গেল অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ২২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।

আরও পড়ুন:পুলিশের পরিবারকে ‘যথেষ্ট নিরাপত্তা’ দিতে নির্দেশ
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ না বাড়ায় কমে গেছে কর্মসংস্থান। বিবিএসের প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ-২০১৫ অনুযায়ী, গেল দুই বছরে মাত্র ৬ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে মাত্র ৩ লাখ মানুষ চাকরি বা কাজ পেয়েছেন। এর ফলে প্রতি বছর বেকার হচ্ছে প্রায় ২৪ লাখ মানুষ। সেই হিসাবে দুই বছরে দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ৪৮ লাখ। অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারপ্রেস নেটওয়ার্ক, আইপিএনের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতিবছর প্রায় ২৭ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে আসে। কিন্তু সরকারি বা বেসরকারিভাবে কাজ পায় মাত্র ২ লাখ মানুষ। গেল দুই বছরে অর্ধকোটি মানুষ বেকার থাকছে। যদিও গেল দেড় বছর ধরে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল না বললেই চলে।

 জিএম/ এমএসএম /

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম