আগামী ২৮ জুলাই দেশের জন্য একটি সুখবর আসবে এমনটিই আশা করছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। কিন্তু গুলশানে জঙ্গি হামলার পর তাদের সেই আশায় চিড় ধরেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অনেকেই মনে করছেন, ২০১৪ সালে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসা বাংলাদেশ হয়তো আবারও ‘ঝুঁকিপূর্ণ’বা ‘কালো তালিকা’য় ঠাঁই পেতে যাচ্ছে। আগামী ২৩ থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিংয়ের (এপিজি) ১৯তম বার্ষিক সভা বাতিল হওয়ায় এই আশঙ্কা আরও প্রকট হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গুলশানে জঙ্গি হামলার ঘটনা না ঘটলে আগামী ২৮ জুলাই বাংলাদেশের জন্য একটি সুসংবাদের সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বাংলাদেশের অনুকূলে আসবে কিনা তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, দেশে যেভাবে জঙ্গি-সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে, তাতে সন্ত্রাস বা জঙ্গি অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। যার প্রভাব পড়তে পারে আগামী সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য এপিজির বার্ষিক সভায়।
অবশ্য এপিজির খসড়া মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও বার্তা দেওয়া আছে যে, বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় যাচ্ছে। বাংলাদেশ অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন-সংক্রান্ত সর্বশেষ যে ঝুঁকি নিরূপণ প্রতিবেদন ও কৌশলপত্র তৈরি করেছে, তাতে সন্ত্রাসে অর্থায়নকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়নি বলেও জানিয়েছে এপিজি। একইসঙ্গে এ বিষয়ে বাংলাদেশের দালিলিক কোনও কৌশলপত্র নেই বলেও এপিজির মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে, ২০১৫ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ সফরে এসে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ও বাস্তবায়ন খতিয়ে দেখে এপিজি। সেই সফরের প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে তারা ওই মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করে।
এপিজি ওই খসড়া মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রাখার সর্তকতা দেখালেও বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) মহাব্যবস্থাপক দেবপ্রসাদ দেবনাথ মনে করেন, এপিজি চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জন্য সুসংবাদ থাকার সম্ভাবনা ছিল বেশি। সম্ভাবনা এখনও আছে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঢাকায় এপিজির বার্ষিক সভাটি বাতিল না হলে আমরা সেখানে বেশি জনবল নিয়ে মতামত তুলে ধরার সুযোগ পেতাম। এর ফলে সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হতো। কিন্তু গুলশান হামলার পর এপিজির বার্ষিক সভাটি ২ মাস পেছানো হয়েছে। ঢাকার পরিবর্তে ভেন্যু নেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। তবে সেখানেও বাংলাদেশের পক্ষে প্রয়োজনীয় বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থাকবে বলে মনে করেন তিনি।
সর্বশেষ মে মাসের শুরুতে এপিজির ৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসেছিল। তখন অর্থ পাচার ও জঙ্গি অর্থায়ন প্রতিরোধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে এপিজি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে টানা ১৬টি বৈঠক করে বিএফআইইউ।
জানা গেছে, জঙ্গি অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ, অর্থ পাচার প্রতিরোধ এবং যে কোনও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অর্থায়ন বন্ধে প্রতিবছর এপিজির বার্ষিক সভা করা হয়ে থাকে। সংস্থাটির এবারের সভায় ৪১টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, ৮টি দেশ এবং ২৮টি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রায় ৪শ’ প্রতিনিধি অংশ নেওয়ার কথা ছিল। এই সম্মেলন সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য বাংলাদেশের প্রস্তুতিও ছিল। কিন্তু গুলশানে জঙ্গি হামলার পর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এপিজি।
জানা গেছে, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ১১টি মানদণ্ড রয়েছে। এ ১১টি মানদণ্ডের মধ্যে যদি কোনও দেশ ৯ বা তার অধিক মানদণ্ডে ‘নিম্ন ও মধ্যম মানে’ থাকে, তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন রিভিউ গ্রুপভুক্ত (আইসিআরজি) হবে। যদি বাংলাদেশ ৮ বা তার কম মানদণ্ডে ‘নিম্ন ও মধ্যম মানে’ থাকে, তাহলে সে ক্ষেত্রে বিশ্বজনীন আন্তসরকার সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) মানদণ্ড পূর্ণভাবে বাস্তবায়নকারী দেশের তালিকায় চলে যাবে।
বাংলাদেশ ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আইসিআরজি প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে এফএটিএফ পূর্ণভাবে বাস্তবায়নকারী দেশের তালিকাভুক্ত হয়। প্রতিবেশী ভারত এফএটিএফভুক্ত দেশ। প্রচলিত সাধারণ নিয়মে বিশ্বের কোনও দেশ আইসিআরজি প্রক্রিয়াভুক্ত থাকলে আন্তর্জাতিক আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সেই দেশটির ঋণপত্র বা এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খরচ বেড়ে যায়। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
দেশের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিদেশি বিনিয়োগসহ নানা ভাবে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে বাংলাদেশ। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় চলে গেলে বিদেশ থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সুদের হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। একইভাবে বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। অভ্যন্তরীণ বড় বড় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ পরিস্থিতিরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, গুলশানে জঙ্গি হামলার পর দেশের অর্থনীতিতে একটা বড় ধাক্কা আসতে পারে এমন আশঙ্কা অনেকেই করছেন। এতোমধ্যে বিদেশিরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনও বিদেশিই বিনিয়োগে আসতে আগ্রহী হবেন না। তিনি জানান, শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের কারণে তৈরি পোশাকের ব্যবসা এসেছিল বাংলাদেশে। ওই সময় বিনিয়োগকারীরা সেখানে নিরাপত্তা পায়ননি বলেই বাংলাদেশমুখী হয়েছিলেন। একইভাবে বাংলাদেশে নিরাপত্তা-সংকট দেখা দিলে কোনও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগ করবেন না।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গুলশানে জঙ্গি হামলার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশকে যদি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় নেওয়া হয় তাহলে সেটা হবে দুঃখজনক। কারণ, জঙ্গিবাদ সমস্যা কেবল বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়, এটি সারাপৃথিবীর সমস্যা। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে হলে জঙ্গিবাদ সমস্যা দূর করতে হবে। তা না হলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। বিশেষ করে বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনও বিদেশি এই দেশে বিনিয়োগ করতে আসবে না।
এপিজি হচ্ছে ‘অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন’বিষয়ে মানদণ্ড নির্ধারণকারী এশিয়া অঞ্চলের সংস্থা। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৪১ দেশ এর সদস্য। এপিজি প্রতিনিধিদল সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মানি লন্ডারিং প্রতিরোধবিষয়ক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করে থাকে। ২০০৩ সালে বাংলাদেশকে সংস্থাটি প্রথম মূল্যায়ন করে। এরপর বাংলাদেশ নিয়ে ২০০৮ সালে এ ধরনের মূল্যায়ন করা হয়েছিল। ওই সময়ে বাংলাদেশ সন্ত্রাসী অর্থায়ন ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রমে খুব বেশি সফলতা দেখাতে পারেনি। যে কারণে বাংলাদেশকে কালো তালিকার আগের ধাপ ‘ধূসর’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তী নানা উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর সেখান থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে আসে। সর্বশেষ ২০১৫ সালের অক্টোবরে মূল্যায়ন করে গেছে এপিজি। ২০১৪ সালে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়া হয়।
আরও পড়তে পারেন: হত্যাকারীদের প্রশিক্ষণ একই পদ্ধতিতে, হত্যার ধরন একই
/এমএনএইচ/








