এক বছর যেতে না যেতে আবারও গ্যাসের দাম বাড়ানোর তৎপরতা চলছে। এরই মধ্যে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) শুনানি শেষ হয়েছে। অক্টোবরের শেষে অথবা নভেম্বরের প্রথম দিকে দাম বৃদ্ধির ঘোষণা আসতে পারে। পেট্রোবাংলা ও এর অধীন সংস্থাগুলো আগের ৯০ শতাংশ থেকে সরে এসে গড়ে ৬৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে।
শিল্প উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তারা বলছেন, এখন অধিকাংশ কারখানা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাচ্ছে না। অনেক সময় গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপও থাকে না। অথচ প্রতি মাসে ঠিকই গ্যাস বিল দিতে হয়। এর মধ্যে এক বছরের ব্যবধানে আরেক দফা গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। আর উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে দেশের বাজারেও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। পরিবহন ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাড়ি ভাড়া বাড়তে পারে। এতে অর্থনীতির পাশাপাশি জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটি মনে করে, আবার দাম বাড়ালে গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হবে। এর ফলে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং রফতানি খাতের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যাবে।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে ডিসিসিআই বলেছে, গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহের এখন সংকট চলছে। এ সংকটকালে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি দেশের তৈরি পোশাক, চামড়া, জাহাজ নির্মাণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ অন্যান্য গ্যাসনির্ভর শিল্প ও কলকারখানার উৎপাদনকে ব্যাহত করবে। এর প্রভাবে বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ নিরুৎসাহিত হতে পারে।
প্রসঙ্গত, রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো সংকটের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছিলেন না।
ব্যবসায়ি নেতারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ প্রায় ৪ বছর পর যখন বেসরকারি খাত চাঙ্গা হতে শুরু করে ঠিক সেই সময় দেশে জঙ্গিদের উৎপাত বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে আবারও ধাক্কা লাগে। এই সংকটাবস্থা থেকে যখন বেরুতে শুরু করছে ঠিক সেই সময়ে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেলে বেসরকারি খাতের চরম ক্ষতি হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে দেশের তৈরি পোশাক ছাড়াও চামড়া, জাহাজ নির্মাণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ গ্যাসনির্ভর সব সেক্টরে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ কারখানা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাচ্ছেন না। গ্যাস পেলেও অনেক সময় গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপও থাকে না। অথচ প্রতি মাসে গ্যাস বিল ঠিকই পরিশোধ করতে হয়। এই অবস্থায় আরেক দফা গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। আর উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি হলে দেশের বস্ত্র খাত চরম বিপদের মুখে পড়বে। সুতা ও বস্ত্র উৎপাদনে নিয়োজিত মিলগুলো প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ও সক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হবে। ফলে আগামী দিনে বাংলাদেশকে বস্ত্র ও সুতার জন্য অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে।’
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি তপন চৌধুরী বলেন, ‘গত বছরের সেপ্টেম্বরে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। গতবারের দাম বৃদ্ধির ফলে বস্ত্র খাতের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায় ব্যাপকভাবে। এ অবস্থায় অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে বস্ত্র খাতের। এমন অবস্থায় এক বছরের ব্যবধানে আবারও গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে সুতা ও বস্ত্র উৎপাদনে নিয়োজিত মিলগুলো প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ও সক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হবে।’
সূত্র জানায়, সম্প্রতি সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সঙ্গে কমিশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের মনোভাবের কথা কমিশনকে অবহিত করা হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, বর্তমানে গ্রাহকের কাছ থেকে বছরে গ্যাস বিল আদায় হয় ১৬ হাজার কোটি টাকা। এর ওপর আরও প্রায় ৬৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে পেট্রোবাংলা। অথচ পেট্রোবাংলা ও এর অধীন কোম্পানিগুলো প্রায় প্রতিটিই এখন লাভজনক অবস্থায় রয়েছে। শুধু তাই নয়, তাদের তহবিলে ২৫ হাজার কোটি টাকা অলস পড়ে আছে। এ কারণে গ্যাসের দাম বাড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না ।
জানা গেছে, আবাসিকে গ্যাসের দাম চুলাপ্রতি বর্তমান দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তে পারে। যদিও এর আগে গত মার্চে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো দুই চুলার জন্য ১ হাজার ২০০ এবং ১ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছিল বিইআরসির কাছে। এ ছাড়া সিএনজির দাম প্রস্তাব করা হয়েছিল প্রতি ঘনমিটার ৩৫ থেকে ৫৮ টাকা, গৃহস্থালিতে মিটারভিত্তিক গ্যাসের দাম ৭ টাকা থেকে ১৬ টাকা ৮০ পয়সা ও শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত ক্যাপটিভ বিদ্যুতের জন্য প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৮ টাকা ৩৬ পয়সা থেকে ১৯ টাকা ২৬ পয়সা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ২ টাকা ৮২ পয়সা থেকে ৪ টাকা ৬০ পয়সা এবং শিল্পের বয়লারে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ৬ টাকা ৭৪ পয়সা থেকে ১০ টাকা ৪৫ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। গত ৭ থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত এই প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি হয়েছে।
এর আগে, গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবাসিকসহ কয়েকটি শ্রেণির গ্রাহকের গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। তখন দুই চুলার বিল ৪৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৫০ এবং এক চুলার বিল ৪০০ থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হয়েছিল। আর সব গ্রাহকশ্রেণির গ্যাসের দাম সর্বশেষ বাড়ানো হয় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে।
বিটিএমএ সূত্র জানায়, গত বছরের আগস্টে ক্যাপটিভ জেনারেটরে ব্যবহৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ছিল ৪ টাকা ১৮ পয়সা। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৬ পয়সা করা হয়। এখন তিতাসের দেওয়া প্রস্তাব কার্যকর করা হলে গত এক বছরের ব্যবধানে ক্যাপটিভে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ৪৬০ শতাংশ বেড়ে যাবে। তাতে প্রতি কেজি সুতা উৎপাদনে গ্যাসের খরচ ১৩ টাকা ১৭ পয়সা থেকে বেড়ে ৩০ টাকায় গিয়ে ঠেকবে।
/এমএনএইচ/








