বাংলাদেশ ২০১৮ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়ার প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করবে। আর ২০২৪ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হবে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের এলডিসি প্রতিবেদন-২০১৬তে এই প্রাক্কলন করা হয়েছে। শনিবার সকালে ব্র্যাক সেন্টারে সিপিডি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়।
আঙ্কটাডের ‘দ্য লিস্ট ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রিস রিপোর্ট- ২০১৬’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লোগ (সিপিডি)-র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। এসময় উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির সম্মানীত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টচার্য, নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক ড. ফাহমিদা হক, অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রমুখ।
তৌফিকুল ইসলাম বলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সাল নাগাদ বের হবে ১০টি। ২০২৫ সালে বের হবে আরও ৬টি। আঙ্কটাডের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১ সালে যে দেশগুলো স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হবে তার মধ্যে বাংলাদেশের নাম নেই। প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ২০১৮ সালের মধ্যে এলডিসি থেকে বের হওয়ার প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করবে। ২০২১ সালের মধ্যে এলডিসি থেকে বের হওয়ার জন্য যে তিনটি সূচককে বিবেচনা করা হয়, তার তিনটি সন্তোষজনকভাবে বজায় রাখতে সক্ষম হবে বাংলাদেশ। তিনটি বিষয় হলো-মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও আর্থিক ভঙ্গুরতা সূচক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এরইমধ্যে মানবসম্পদ উন্নয়নে জোর দিয়েছে। আর্থিক ভঙ্গুরতা সূচকে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করেছে। মাথাপিছু আয়েও বাংলাদেশ লক্ষ্য অর্জনের কাছাকাছি রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বিশ্বব্যাংকের মাথাপিছু আয়ের হিসাব অনুযায়ী, ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উন্নীত হয়েছে। তবে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হতে পারবে না। অবশ্য সরকার ইচ্ছে করলে যে কোনও সময় ঘোষণা দিয়ে এলডিসির তালিকা থেকে বের হয়ে আসতে পারে।
তিনি বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে আসার গতি মসৃণ ও টেকসই হওয়া জরুরি। হালকাভাবে বা নিস্তেজভাবে বা গড়াগড়ি দিয়ে বের হলে চলবে না। ক্ষিপ্রতার সঙ্গে বেরুতে হবে। সেক্ষেত্রে উন্নয়নের কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। কাঠামোগত রূপান্তর মানে হচ্ছে বাংলাদেশকে আরও শিল্পায়ন হতে হবে। উৎপাদন বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। আর এটা করতে হলে শ্রমঘন আরও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বাড়াতে হবে। এ জন্য রাজস্ব আহরণের গতি বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও রফতানি প্রবৃদ্ধিতে সফল হওয়া যাবে না। প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি অর্ন্তভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সুশাসন, সমাজের বৈষম্য দূরীকরণ জরুরি। উন্নয়ন হতে হবে সবগুলো মিলিয়ে।
তিনি বলেন, অনেকগুলো স্বল্পোন্নত দেশের অভিজ্ঞতা হলো, এসব দেশ অনেকদূর এগিয়ে গিয়েও ফের পিছিয়ে পড়েছে। তার বড় কারণ, এসব দেশের অভ্যন্তরে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট ছিল। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সহিংস ও সামরিক সমস্যা এমন পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, সহিংসতা, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা এই অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারে। এ কারণে, গতিবেগ আরও ক্ষিপ্র করতে হলে দেশের ভেতরে মানবাধিকার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
তিনি বলেন, আফ্রিকার অনেক দেশ উন্নয়নের গতিপথে থাকার পরও বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও আঞ্চলিক সংকটে পড়ে পিছিয়ে গেছে। সম্প্রতি ইথিওপিয়া প্রায় ১০ শতাংশ হারে উন্নতি করছিল, তারাও তথাকথিত গণতন্ত্রের নামে উন্নয়ন করছিল। কিন্তু আঞ্চলিক সংকটকে গুরুত্ব দেয়নি। এ কারণে তারাও পিছিয়ে পড়েছে।
প্রবৃদ্ধি নিয়ে ড. দেবপ্রিয় প্রশ্ন তোলেন, ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে আমরা কেন খুশি হচ্ছি? অর্জিত প্রবৃদ্ধির চেয়ে কেন হারিয়ে যাওয়া প্রবৃদ্ধির কথা বলছি না? কেন বলছি না যে আমরা ৮ শতাংশ বা ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারতাম!
সংবাদ সম্মেলনে তৌফিকুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে এলেও ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে যেসব সুবিধা পেতো তার সব সুবিধাই পাবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণে সফল হলেও এটা কার্যকর হবে জাতিসংঘের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাউন্সিলে পাশ হওয়ার পর।
তিনি বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ভালো হলেও শিক্ষা ও অন্যান্য সূচকে এখনও ভালো অবস্থায় নেই বাংলাদেশ। বিজ্ঞানপ্রযুক্তি, মাথাপিছু আয় ও আন্তর্জাতিক সাহায্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে আরও উত্তরণ ঘটাতে হবে। রফতানির বাজার বহুমুখীকরণ করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতি আরও গতিশীল করতে হবে। রাজস্ব আয় তথা করের আওতা বাড়াতে হবে। ব্রেক্সিটসহ বিশ্বব্যাপী যেসব ঝুঁকি রয়েছে তা যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে ৪৮টি দেশ এলডিসি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এশিয়াতে বাংলাদেশের পাশাপাশি আফগানিস্তান, ভুটান, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার, নেপাল ও ইয়েমেন এলডিসিভুক্ত দেশ।
প্রসঙ্গত: জাতিসংঘ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশকে স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল ও উন্নত এ তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে।
আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি দেশের ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এলডিসি থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব দেশ হচ্ছে আফগানিস্তান, অ্যাঙ্গোলা, ভুটান, জিবুতি, ইকোটোরিয়াল গুইনিয়া, কিরিবাতি, লাওস, মিয়ানমার, নেপাল, সাওতোমি, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, ইয়েমেন এবং আরও কয়েকটি আফ্রিকান দেশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভুটান, কিরিবাতি, নেপাল, সাওতোমি, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, তিমুর ও টুভালু ২০২১ সাল নাগাদ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছাবে।
/জিএম/এসটি/টিএন/








