বৈশাখে বাণিজ্যে লক্ষ্মী

গোলাম মওলা
১৩ এপ্রিল ২০১৭, ১৩:০৩আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৭, ১৮:৩৪

বৈশাখী মেলা বিদায় নিচ্ছে ঋতুরাজ বসন্ত, দুয়ারে কড়া নাড়ছে বাঙালির পহেলা বৈশাখ। আগামীকাল শুক্রবার  বাংলা নববর্ষ। বাংলা বছরের প্রথম এই দিনটিকে ঘিরে ঘরে-বাইরে শহরে-গ্রামে চলছে নানা প্রস্তুতি। চলছে বৈশাখী মেলার আয়োজন। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বাঙালি জাতির এটিই সবচেয়ে বড় উৎসব। বাঙালির সর্বজনীন এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বাড়ছে ব্যবসা ও বাণিজ্য। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র শুরু হয়েছে নানামুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ায় পহেলা বৈশাখে অর্থনীতির গতি বাড়ে।  

এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ১০ বছর আগেও পহেলা বৈশাখ ঘিরে এত আয়োজন ছিল না। কিন্তু এখন আমাদের পহেলা বৈশাখটাও ঈদের মতো হয়ে গেছে। ঈদের মতোই ব্যবসা-বাণিজ্যে চাঙ্গাভাব সৃষ্টি হয়। মানুষ পহেলা বৈশাখে এখন খরচ করে। ঈদের মতো নতুন নতুন পোশাক কিনে। নানা রকমের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা রাখে। শুধু পহেলা বৈশাখের এই একদিনকে কেন্দ্র করে ৮ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি বাণিজ্য হয়। বৈশাখী মেলা

তিনি বলেন,  দেশব্যাপী একদিনের জন্য নানামুখী ব্যবসা হয়। ছেলে-মেয়েরা নতুন পোশাক ছাড়াও নানা রংয়ের গহনা পড়ে একটা উৎসবের সৃষ্টি করে।

তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিবছরই পহেলা বৈশাখ ঘিরে শহরের পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত এলাকাতেও ভালো বেচাকেনা হচ্ছে। এবারে পহেলা বৈশাখ ঘিরে ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্য হবে বলেও মনে করেন তিনি।

এদিকে পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে রাজধানীর ছাড়াও গ্রামবাংলার চলছে মেলার প্রস্তুতি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বসেছে বৈশাখী মেলা। বৈশাখী মেলা

প্রসঙ্গত, এক সময় বর্ষবরণের এই উৎসবটি ছিল শুধুই গ্রামাঞ্চলে। এই উৎসবে এখন নগরের সম্পৃক্ততা বেড়েছে। বৈশাখী শাড়ি, কুটির শিল্প কিংবা খেলনায় থাকছে গ্রামীণ ছোঁয়া। এসব পণ্যের বাজারজাতকরণে বড় ভূমিকা রাখছে বৈশাখ। শুধু তাই নয়, এসব পণ্যের নগরকেন্দ্রিক বাজার গড়ে উঠেছে।

ইতোমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন যায়গায় বৈশাখী মেলা শুরু হয়েছে। গত ১০ এপ্রিল থেকে ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরে ডব্লিউভিএ মিলনায়তনে চলছে বৈশাখী মেলা। এই মেলায় ২৩ জন নারী উদ্যোক্তা বৈশাখী বিভিন্ন পণ্যের দোকানের স্টল দিয়েছেন। প্রতিদিন সকাল ১০ টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এই মেলায় বেচা-কেনা চলছে। এই মেলা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে।

বেইলি রোডে বাংলাদেশ মহিলা সমিতিতেও চলছে বৈশাখী মেলা। ৩৫টি স্টলে বেচা-কেনা হচ্ছে বৈশাখী পোশাক। এই মেলাও চলবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ।  এই মেলার আয়োজন করেছে ইমেজ মার্ক কমিউনিকেশন।

রাজধানীর ধানমণ্ডির ২৭ নম্বর সড়কে জেনেটিক প্লাজার সামনের বসেছে বৈশাখী চুড়ির মেলা। নানান রঙের চুড়ি নিয়ে বসেছেন নারী বিক্রেতারা। এই মেলায় এক ডজন চুড়ি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৬০ টাকায়। বৈশাখী মেলা

রাজধানীর বিপণিবিতানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, বাঙালির প্রাণের উৎসব ঘিরে সাদা-লালে ছেয়ে গেছে বিপণিবিতানগুলোর বৈশাখী আয়োজন। বৈশাখ ঘিরে এরই মধ্যে ঈদের মতো প্রাণচাঞ্চল্য শুরু হয়েছে এসব দোকানে। বিশেষ করে দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো যেন নতুন সাজে সেজেছে। আড়ং, বাংলার মেলা, অঞ্জনস্, রং, সাদা-কালো, ছোঁয়া, নোলক, গ্রামীণ সম্ভার, ডুয়েট অ্যান্ড ঐতিহ্য, গ্রামীণ ইউনিক্লো, ফরওয়ার্ড, শপার্স ওয়ার্ল্ড, কে-ক্রাফট, চন্দ্রবিন্দু, গ্রামীণ মেলাসহ প্রতিটি ফ্যাশন হাউসে এখন চলছে পহেলা বৈশাখের বিশেষ আয়োজন। 

দেশি ফ্যাশন হাউসগুলোর সংগঠন ফ্যাশন এন্টারপ্রেনার অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, ঈদসহ সারা বছর দেশি ফ্যাশন হাউসগুলোয় যে পরিমাণ পোশাক বিক্রি হয় তার ৩০ শতাংশ বিক্রি হয় পহেলা বৈশাখ ঘিরে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পহেলা বৈশাখে আমরা দেশীয় পণ্য ব্যবহার করছি, দেশীয় পণ্য তৈরি করছি, দেশীয় পণ্য বেচা-কেনা করছি।

দেশীয় ব্র্যান্ডকে আমরা তুলে ধরতে পারছি। এই দিনে দেশীয় খাবার খাচ্ছি, অর্থাৎ এই দিনে আমরা যাই করছি, দেশীয় সংস্কৃতির মাধ্যমে একটি বড় উৎসব করছি। তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখের উৎসবে ঈদের চেয়ে কম বাণিজ্য হলেও আমরা এই উৎসবে শতভাগ দেশীয় ব্র্যান্ডকে তুলে ধরতে পারছি। তিনি মনে করেন, এই উৎসবে  আড়াই থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার পণ্য বেচা-কেনা হলেও এর গুরুত্ব যে কোনও উৎসবের চেয়ে বেশি।

এদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের বৈশাখী উৎসব ভাতার প্রভাবে এবার আরও জমজমাট হয়ে উঠবে বাংলা নববর্ষ।  বৈশাখী মেলা

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে এখন অর্থনীতিতেও এর একটি ইতিবাচক গতি বাড়ছে। এটা এখন আমাদের উৎসব। যে কারণে বেচা-কেনাও বাড়ছে। তিনি বলেন, এবার সরকারি কর্মকর্তারা উৎসব ভাতা পেয়েছেন। এ কারণে বেচা কেনা আরও বাড়বে। তিনি উল্লেখ করেন, এই উৎসবে নানা রকম পণ্যের চাহিদা বাড়ছে, আবার এর বিপরীতে সরবরাহও বাড়ছে।

পহেলা বৈশাখ উৎসবকে প্রান্তবন্ত করতে পিছিয়ে নেই নিত্যপণ্য, ফুল, মৃৎশিল্পের ব্যবসায়ীরাও। শুধু তাই নয়, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ফ্যাশন হাউসগুলোও নতুন নকশার পোশাক বাজারে নিয়ে এসেছে। কেনাকাটায় বৈশাখী মূল্যছাড়ও দিয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান। ফ্যাশন হাউসগুলোতে নতুন পোশাক কিনতে প্রতিদিনই ভিড় ভাড়ছে। ফুটপাত থেকে শুরু করে নামিদামি শপিংমল পর্যন্ত সবখানেই বৈশাখ উৎসবের প্রস্ততি দেখা যাচ্ছে।

পোশাক বিক্রেতারা জানিয়েছেন, ঈদের পর পহেলা বৈশাখই হলো পোশাক বেচা-কেনার সবচেয়ে বড় উপলক্ষ। ভোক্তাদের চাহিদামতো পোশাক ছাড়াও অন্যান্য পণ্যের যোগান দিতে পাঁচ-ছয় মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন তারা।

ইতিমধ্যে নতুন পোশাক কেনার ধুম পড়েছে বিপণিবিতানগুলোয়। প্রসাধনী ও  গয়নাও বেচা-কেনা চলছে হরদম। ক্রেতা আকর্ষণে বিভিন্ন কোম্পানি বিশেষ মূল্যছাড় দিয়েছে। কেনাকাটা বেড়েছে অনলাইনেও। হোটেল, রেস্তোরাঁ ছাড়াও বাঙালি পরিবারগুলোতে চলছে বছরের প্রথম দিনটির বিশেষ খাবারের প্রস্তুতি। বৈশাখ ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানের ফুল ব্যবসায়ীদের ব্যবসা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। এছাড়া প্রতিবছরের মতো এবারও শুভেচ্ছা কার্ড ও বাংলা নববর্ষের ক্যালেন্ডার উপহার দিয়েছে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। এতে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসাও জমে উঠেছে।

এই উৎসবের মূল আকর্ষণ ইলিশ। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি চাহিদা হচ্ছে ইলিশের। এক কেজি ইলিশের মূল্য এখন কত তা জানার আগ্রহের এখন শেষ নেই। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল গণভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পহেলা বৈশাখে ইলিশ না খাওয়ার জন্য দেশবাসীকে অনুরোধ করেছেন।

এদিকে গ্রাম বাংলাতেও উৎসবের প্রস্ততি এখন শেষ পর্যায়ে। পহেলা বৈশাখের উৎসব সফল করতে মৃৎশিল্পের বিশেষ কারুকাজ, সরা আঁকা, মিছরির মিষ্টি বানানো, নানা রকম সন্দেশ-মিষ্টি, খৈ তৈরি, কাপড় বোনা ইত্যাদি অর্থনৈতিক কাজ উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে। এছাড়া ইতিমধ্যে গ্রাম বাংলার মেলাগুলোর জন্য হস্ত নির্মিত নানা পণ্যসামগ্রী তৈরি হয়েছে। গৃহস্থরা মূলত সারা বছরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও তৈজসপত্র এই পহেলা বৈশাখের মেলা থেকেই কেনেন। ছোটদের জন্য মাটির পুতুল, বাঁশের বাঁশি, রঙিন বেলুন, ঢোল, ডুগডুগি, ফিতা, পুঁতির মালা, কাচের চুড়ি, ইমিটেশনের গহনা মেলায় বিক্রি হয়। এই উৎসবে রাজধানী ঢাকা ছাড়াও বিভাগ, জেলা শহরের প্রায় প্রতিটি স্থানেই মাটির পণ্য বিক্রি হয়। 

 

/টিএন/আপ-এফএস/

আরও পড়ুন- প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা কার্ডে বিশেষ শিশুদের আঁকা ছবি

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম