বাংলাদেশের বড় একটি তামাক কোম্পানি তাদের মধ্যম স্তরের সিগারেটকে নিম্নস্তরে সিগারেট হিসেবে দেখিয়ে প্রায় সাতশ কোটি রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে। একটি কোম্পানিই যদি এত টাকা কর ফাঁকি দিয়ে থাকে, তাহলে বাকিগুলোর অবস্থা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এই দিকটিতে সরকারের কঠোর নজরদারিসহ আগামী ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে তামাকের ওপর বিদ্যমান রফতানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার দাবি জানিয়েছে প্রজ্ঞা ও অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স (আত্মা)।
সোমবার (৮ মে) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে ‘কেমন তামাক কর চাই’ শীর্ষক প্রাক-বাজেট ২০১৭-২০১৮ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য ও দাবি তুলে ধরেন বক্তারা। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোমানা হক।
মূল প্রবন্ধে রোমানা চারটি প্রস্তাবনা ও নয়টি সুপারিশ তুলে ধরেন। প্রস্তাবনায় সিগারেটের ১০ শলাকার প্যাকেটের মূল্য ২৫.৯৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২০ টাকা, ২৫ শলাকা বিড়ির ওপর ১০.১৩ টাকা করারোপ করে ২২.৩০ টাকা নির্ধারণ, ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যে (জর্দা ও গুল) ওজনের ভিত্তিতে ১৬ টাকা ভিত্তিতে করারোপ করে খুচরা মূল্য সর্বোচ্চ ৩২ টাকা নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়া, সব তামাক পণ্যে মূল্য সংযোজন কর ১৫ শতাংশ বহাল রাখতে হবে।
প্রবন্ধে রোমানা হক জানান, প্রস্তাবনাগুলো গ্রহণ করা হলে সিগারেট থেকে সরকার অতিরিক্ত ৫ হাজার ২শ কোটি টাকা, বিড়ি থেকে ১ হাজার ৩০ কোটি টাকা ও প্রতি ২০ গ্রাম ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত পণ্য থেকে অতিরিক্ত ৬ টাকা রাজস্ব আয় করতে পারবে। একইসঙ্গে তামাকজাত পণ্যের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।
সুপারিশমালায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশের তামাকের ওপর শুল্ক-কাঠামো অত্যন্ত জটিল এবং তা আদায় হয় অ্যাড ভ্যালোরেম বা মূল্যের শতাংশ হারে। এটা অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি করে এবং কর ফাঁকির সম্ভাবনা বাড়ায়। এ কারণে সিগারেটের ওপর করারোপের প্রচলিত প্রথাও পর্যায়ক্রমে তুলে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। সুপারিশে তামাক পণ্যের খুচরা মূল্যের ওপর ২ শতাংশ হারে স্বাস্থ্যখাতে সারচার্জ আরোপের কথা বলা হয়। পাশাপাশি তামাকের ব্যবহার কমানো ও রাজস্ব বাড়াতে ভূমিকা রাখার মতো একটি সহজ ও কার্যকর তামাক কর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রস্তাবও করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জামান বলেন, ‘মানুষের কাছে তামাকের চাহিদা কমাতে হলে কেবল কর বাড়ালেই চলবে না, তামাকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কেও মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে। তামাকবিরোধী প্রচারণাতে বড় আন্দোলনে রূপ দিতে হবে।’
কাজী খলীকুজ্জামান আরও বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তামাক বা মাদক সেবনের জন্য অনেকটা বৈধতা দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশের তো এখন সেই অবস্থা নেই। আমরা নিজেরদের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছি, নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে পারি। ফলে দেশে তামাকজাত পণ্যের দাম বাড়ানো ও উচ্চ কর আরোপে কোনও কোম্পানি বন্ধ হলে হোক। সরকার ওই কোম্পানি থেকে হয়তো রাজস্ব পাবে না। কিন্তু তাই বলে তো আমরা মানুষের ক্ষতি করতে পারি না। গণমানুষের ক্ষতি করা যাবে না। তবে হঠাৎ করেই আবার তামাক কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে সরকারের আয়ও হঠাৎ করে কমে যাবে। তাই ধীরে ধীরে বন্ধের পথে এগিয়ে যেতে হবে।’
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য আমিনুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এনবিআরের রাজস্বের একটা বড় অংশ আসে তামাক থেকে। তাই তামাক পণ্যে বাড়তি করের ঝুঁকি নিতে এনবিআর দ্বিধায় থাকে। তবে এনবিআর দীর্ঘদিন ধরে তিন ধরনের তামাকজাত পণ্যের ওপর আলাদাভাবে কর আরোপের চিন্তা করছে। এটা করলেও রাজস্ব বেড়ে যেত।’
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা বিগ্রেডিয়ার (অব.) আব্দুল মালিকের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন, আত্মার কনভেনর শফিকুল ইসলাম, কো-কনভেনর নাদিরা কিরন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান অপরাধ প্রতিবেদক মর্তুজা হায়দা লিটন প্রমুখ।
/আরএআর/টিআর/








