সম্প্রতি মুরগির ডিমের দাম কমে যাওয়ায় লোকসানের কবলে পড়েছেন ডিম উৎপাদনকারী খামারিরা। তাদের আশঙ্কা, এভাবে ডিমের দাম কমতে থাকলে অচিরেই তারা পথে বসতে বাধ্য হবেন। এই সংকট সমাধানে তারা সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এদিকে দ্রুত এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী।
গত কয়েকদিন ধরে দেশের সর্বত্র ফার্মের মুরগির ডিমের দাম কমে গেছে আশঙ্কাজনক হারে। খুচরা বাজারে এখন প্রতি হালি ফার্মের মুরগির ডিমের দাম ২৪টাকা। প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়। গত কয়েকদিন আগেও প্রতি ডজন মুরগির ডিম বিক্রি হয়েছে ৮৫ থেকে ৯০ টাকায়।
খামারি, ব্যাবসায়ী ও ভোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হঠাৎ করে ডিমের দাম কমার কারণ মূলত তিনটি। তারা বলছেন, ডিমের অতিরিক্ত উৎপাদন, বাজারে পর্যাপ্ত সবজি-মাছের সরবরাহ থাকা ও গরুর মাংসের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকায় ডিমের চাহিদা কমেছে।
বাজার ঘুরে জানা গেছে, বাজারে পর্যাপ্ত শীতের সবজির সরবরাহ রয়েছে। দেশি-বিদেশি মাছের সরবরাহও সন্তোষজনক। অন্যদিকে গত কয়েক মাসের তুলনায় কিছুটা কমেছে গরুর মাংসের দাম। ৫৫০ টাকা কেজি দরের গরুর মাংস এখন বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৪৬০ থেকে ৪৮০ টাকায়। ফলে ক্রেতাদের আগ্রহ গরুর মাংসকে ঘিরে। এসব কারণেই ডিমের চাহিদা কমেছে। ডিমের দাম কমার এই প্রবণতা আরও কিছুদিন থাকবে বলে জানিয়েছেন গাজীপুরের খামারি আবু নাসের।
জানতে চাইলে ডিম উৎপাদনকারী আবু নাসের বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ‘আবহাওয়া ভালো থাকায় মুরগির রোগবালাই কম। তাই উৎপাদন ভালো হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরেই দেশের প্রতি খামারে ডিমের উৎপাদন ভালো হচ্ছে।’ পর্যাপ্ত উৎপাদন ও চাহিদা কমে যাওয়ায় ডিমের দাম পাচ্ছেন না বলে অনেকটাই হতাশা ব্যক্ত করেছেন আবু নাসের। তিনি বলেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে খামারিদের লোকসানের মুখে পড়তে হবে। কারণ ডিমের দাম কমলেও মুরগির ওষুধ ও খাবারের দাম কমেনি। ডিমের সঙ্গে ব্রয়লার মুরগি ও লেয়ার মুরগির দামও কমেছে। এভাবে চললে খামারি বাঁচবে কিভাবে?’
রাজধানীর কাওরান বাজারের ডিম ব্যবসায়ী আরিফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতি ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়। যাত্রাবাড়ী আড়তে গত সপ্তাহে একশ পিস ডিমের দাম ৪৮৫ টাকা দরে বিক্রি হলেও শুক্রবার তা নেমে দাঁড়ায় ৪৬৫ টাকায়। মাস দেড়েক আগে প্রতি ’শ ডিমের দাম ছিল ৫৪০ থেকে ৫৫০ টাকা।’ ব্যবসায়ীরা জানান, দাম কমার বড় কারণ সরবরাহ বেশি।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাবে, দেশে ছয় বছর আগে ২০০৯-১০ অর্থবছরে ডিমের উৎপাদন ছিল ৫৭৪ কোটি পিস। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৯৬ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাবে, ২০০৯ সালে প্রতি হালি ডিমের গড় দাম ছিল ২৮ টাকা। ২০১৬ সালে এসে এর দাম দাঁড়ায় ৩৪ টাকায়। ২০১৭ সালে আবার তা কমে ৩২ টাকায় নামে। এখন বাজারে প্রতি হালি ডিমের দাম ২৪ টাকা।
খামারিরা জানিয়েছেন, লোকসানের কারণে লেয়ার মুরগির বাচ্চার চাহিদা কমে যাওয়ায় বাচ্চা ফোটানোর জন্য প্রতিটি হ্যাচিং ডিম আগে যেখানে বিক্রি হতো ১৪ টাকায়, এখন সেই ডিম বিক্রি হচ্ছে মাত্র আট টাকায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পোল্ট্রি খামারিদের সংগঠনের কর্মকর্তা আবু জাফর বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ‘কৃষির উপখাত পোল্ট্রি ডেইরি তথা প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণে আমরা মর্মাহত।’ তারা বলেন, ‘একটি ডিম থেকে একটি মুরগির বাচ্চার জন্ম ডিমের মূল্য, বাচ্চা উৎপাদন খরচ, বিনিয়োগের লাভসহ মোট উৎপাদন খরচ ২৪ টাকা থেকে ৩০ টাকা।’
আবু জাফর বলেন, ‘চাহিদার বিপরীতে অতিরিক্ত ডিম উৎপাদন হওয়ায় খামারিরা বর্তমানে বাজারে ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। ফলে তাদের দুঃখ হতাশা ও ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে।’ এই ক্ষোভ প্রশমনে সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত উৎপাদিত ডিম ও মাংস রফতানির অনুমতি দেওয়া অবৈধ পথে ডিম মুরগির বাচ্চা প্রবেশ ঠেকানো ও খামারিদের সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর জন্য আহবান জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মৎস্য ও পাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে। খামারিরা যেন লোকসানের মুখে না পড়েন, সে বিষয়ে অবশ্যই সরকার সচেতন। পরিস্থিতি এমন থাকবে না।’ দ্রুত এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলেও জানান তিনি।








