প্রজন্মের নেতৃত্বে শীর্ষ করপোরেট

কেমন চলছে দেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পপ্রতিষ্ঠান ‘খান গ্রুপ’

গোলাম মওলা
১৪ নভেম্বর ২০২০, ১০:০০আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২০, ১৪:১৫

খান একেঅ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড

দেশে বেসরকারি খাতে নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের (একেকে) যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৪৫ সালে। প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ তালিকাও বৈচিত্র্যপূর্ণ।  টেলিকম, বস্ত্র, ডিস্ট্রিবিউশন, আইএসপি/এএসপি, গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আবাসন খাতে ব্যবসা রয়েছে এই করপোরেট গ্রুপের। দেশের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প পরিবারের হাল ধরেছেন  গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত আবুল কাসেম খানের ছয় সন্তান এবং তার এক নাতি।  

এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পরই অতি দ্রুত সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে।  সে সময়ই পাট, বস্ত্র, শিপিং ইত্যাদি  খাতে হাজার হাজার লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন আবুল কাসেম খান।  শুধু তাই নয়, তিনি ইস্টার্ন মাকেন্টাইল ব্যাংক (বর্তমানে পূবালী ব্যাংক) প্রতিষ্ঠিত করেন, যা ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি উদ্যোক্তাদের মধ্যে সর্বপ্রথম ব্যাংক। এ কে খান এ দেশে প্রথম অগ্রণী বাঙালি শিল্পপতি। তিনি অনেকের কাছে কিংবদন্তিতে পরিণত হন।  

জানা গেছে, আবুল কাসেম খান ১৯৩৪ সালে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করেন। ১৯৩৫ সালে মুনসেফ হিসেবে যোগদান করে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের সদস্য হিসেবে কাজ করেন। এরপর তিনি তার শ্বশুর বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবদুল বারী চৌধুরীর পরামর্শে সিভিল সার্ভিসের চাকরি ত্যাগ করে ব্যবসা শুরু করেন।  শ্বশুরের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যবসা-বাণিজ্যে তিনি অসাধারণ সফলতা অর্জন করেন।  

১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি ভারতীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে তিনি পাকিস্তান আইন সভার সদস্য হন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণার সংশোধিত ইংরেজি খসড়াও তিনিই প্রণয়ন করেন, যা কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান পুনর্পাঠ করেন।  

এ কে খানের বড় ছেলে প্রয়াত এ এম জহিরুদ্দিন খান ১৯৫৮ সালে এ কে খান গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে এ কে খানের দ্বিতীয় ছেলে এ কে শামসুদ্দিন খান  এই শিল্পগোষ্ঠীর নেতৃত্ব দেন। বর্তমানে এই গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন এ কে শামসুদ্দিন খানসহ  তার  ভাই সালাহ উদ্দীন কাসেম খান, সদর উদ্দিন খান, আবু মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন খান।  প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন জেবুন নাহার ইসলাম। তিনি প্রয়াত আবুল কাসেম খানের মেয়ে। পরিচালনা পর্ষদে তার আরেক  মেয়ে ইয়াসমিন খান কবিরও রয়েছেন। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন আবুল কাসেম খানের নাতি ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আবুল কাসেম খান। তিনি জহিরউদ্দিন খানের বড় ছেলে। তিনি এ কে খান টেলিকম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ কে খানের হাতে গড়া বিশাল শিল্প সাম্রাজ্য আর তার অসম্পূর্ণ স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব।  

অবশ্য গ্রুপটি পরিচালনার জন্য এ কে খান পরিবারের বাইরে থেকে একজন অ্যাডভাইজার ও একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক  নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অ্যাডভাইজার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ। ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে আছেন কামরান বকর, যিনি এর আগে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার বাংলাদেশের সিইও ছিলেন। যদিও সেপ্টেম্বরের শেষেই  এ কে খান গ্রুপ থেকে চলে যান কামরান বকর। তার জায়গায় নিয়োগ পেয়েছেন  ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এম মাজেদুর রহমান।

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পথিকৃৎ হিসেবে দেশের শিল্প-বাণিজ্যে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন প্রয়াত আবুল কাশেম খান। যিনি এ কে খান নামে খ্যাত ছিলেন। এ কে খানই প্রথম বাংলাদেশি মুসলমান, যিনি প্রথম এ অঞ্চলে শিল্প-বাণিজ্যের প্রসারে এগিয়ে আসেন। বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের বিচার বিভাগে অতি  মর্যাদাপূর্ণ চাকরি ছেড়ে দিয়ে ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন এ কে খান কোম্পানি লিমিটেড। ১৯৪৫ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত সময়ে টেক্সটাইল, শিপিং, পাট, ইলেকট্রনিক মটরস, ম্যাচ ও পলিউড, প্রথম বাঙালি মালিকানাধীন ব্যাংকসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা করে জাতীয় শিল্পায়নের ক্ষেত্রে তিনি অনন্য অবদান রেখেছেন। বর্তমানে এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এবং সুনাম স্বীকৃত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।’  

আবদুল মজিদ উল্লেখ করেন, দেশের শিল্পায়নে তিনি যে পথ প্রদর্শন করে গেছেন, সেই পথে বাংলাদেশের অসংখ্য উদ্যোক্তা শ্রেণির উদ্ভব ঘটেছে। তার সন্তানেরাও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। বর্তমানে আবুল কাসেম খানের সন্তান ও নাতিরাও শিল্প-বাণিজ্যে বিনিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।’  

প্রসঙ্গত, ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে যখন আবুল কাসেম খান ব্যবসায় আসেন, তখন তিনি একজন  আইনজীবী ও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে ব্যাপক পরিচিত ছিলেন। আবুল কাসেম খান ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের আইনসভার সদস্য, পাকিস্তান আইন সভার সদস্য ও পাকিস্তানের মন্ত্রী। তার স্ত্রী ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল-বার্মা স্টিম নেভিগেশন কোম্পানির মালিক আবদুল বারী চৌধুরীর বড় মেয়ে শামসুন্নাহার বেগম।  

ওই সময় এ কে খান চট্টগ্রামে  ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৪৭  সালে দেশ ভাগ হওয়ার পর খান পরিবারের ব্যবসা আরও বড় হতে থাকে। এক দশকের মধ্যে এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানি  জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক  অবদান রাখতে শুরু করে। ১৯৫০  সালের গোড়ার দিকে বিমা, ব্যাংক, টেক্সটাইল,  ট্যানারি, শিপিং ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেন একে খান।  ১৯৮০ সাল থেকে এই গ্রুপটি টেক্সটাইল ও টেলিযোগাযোগ খাতে তাদের বিনিয়োগ আরও  বৃদ্ধি করে।  

জানা গেছে, ১৯৬৯-৭০ সালে শীর্ষ ১০ বাংলাদেশি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা পরিবারের শীর্ষে ছিল এ কে খান পরিবার। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এই পরিবারের  ১২টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। ওই সময় এই গ্রুপের সম্পদের পরিমাণ ছিল আনুমানিক সাড়ে সাত কোটি রুপি।  

ভারতীয় সিয়েট টায়ার কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে সিয়েট কারখানা স্থাপন করে এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানি। এছাড়া বাংলাদেশে এসইজেড, বেসরকারি মালিকানায় বন্দর, আইসিডি স্থাপনেও বিনিয়োগ রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটির।  

বর্তমানে এ কে খান গ্রুপ বেসরকারি উদ্যোগে নরসিংদী জেলায় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০০ একর জমির ওপর গড়ে তুলেছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড)। একইসঙ্গে এখানে নির্মাণ করা হচ্ছে ৫০ একর জমির ওপর অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বার্জযোগে কনটেইনার ভর্তি মালামাল সহজেই নদীপথে পরিবহন সম্ভব হবে। এতে সড়কপথ ও রেলপথে পণ্য পরিবহনের চাপ কমবে।  

জানা গেছে, এ কে খানের বড় ছেলে এ এম জহিরউদ্দিন খান  টানা ৫০ বছর এই গ্রুপের নেতৃত্ব দেন। তিনি ১৯৯১ সাল থেকে এ কে খান গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, বেঙ্গল ফিসারিজ লিমিটেড, কোটস (বাংলাদেশ) লিমিটেড-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি মোবাইল ফোন কোম্পানি একটেল (টিএম ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ  লিমিটেড-১৯৯৭), ইনফোকম লিমিটেড (২০০০) এবং একেসিকম লিমিটেড (২০০২)-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন।  ১৯৭৭ সালে তিনি ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) সভাপতি নির্বাচিত হন। এছাড়া বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও সাধারণ বিমা করপোরেশনের পরিচালক ছিলেন। তিনি সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।  

বর্তমানে এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের অধীন  ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে:

এ কে খান সিয়েট লিমিটেড

এ কে খান প্যানফেব্রিক কোম্পানি লিমিটেড

কোটস বাংলাদেশ লিমিটেড

বাংলার মৎস্য লিমিটেড

আন্ধারমানিক চা রাজ্য

চট্টগ্রাম টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড (সিটিএম)

এ কে খান রাবার বাগান

এ কে খান ম্যাচ ফ্যাক্টরি

এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড সিঅ্যান্ডএফ বিভাগ 

এ কে খান কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেড 

এ কে খান সিকিউরিটিজ লিমিটেড

এ কে খান টেলিকম লিমিটেড

ইনফোকম লিমিটেড

এ কে খান অর্থনৈতিক জোন (একেকেইজেড)

এ কে খান কনটেইনার টার্মিনাল (একেকেসিটি)

এ কে কে লজিস্টিক ও বিতরণ লিমিটেড (একেকেএলডিএল) (প্রস্তাবিত) 

/এপিএইচ/এমএমজে/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম