বাংলাদেশ ব্যাংকের বেতন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন

তরুণরা কঠোর, নেতারা প্রতীকী কর্মসূচি চান

গোলাম মওলা
০৮ জানুয়ারি ২০১৬, ২১:০৪আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০১৬, ০০:৩৩

বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন বেতন কাঠামোর আন্দোলন নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভেদ দেখা দিয়েছে। ব্যাংকের অধিকাংশ তরুণ কর্মকর্তা চান, কঠোর কর্মসূচি দিতে। কিন্তু  সিনিয়ররা দিচ্ছেন ‘প্রতীকী কর্মসূচি’। অফিসকালীন এক ঘণ্টা মানববন্ধন অথবা কর্মবিরতি পালন করলেও বাকি সময়ে অফিসের নির্দিষ্ট কাজ শেষ করে যাচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কাজ শেষ করতে গিয়ে কখনও-কখনও এক ঘণ্টা দেরিতে বাসায় ফিরতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, তরুণ কর্মকর্তারা মনে করছেন, কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার কারণেই শিক্ষকদের আন্দোলন সরকারের কাছে গুরুত্ব পেয়েছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজশাহী কৃষি ব্যাংকের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষপদ নির্বাহী পরিচালক পদকে গ্রেড-১-এ রাখা হয়নি। আবার সহকারী পরিচালক পদকে অষ্টম গ্রেড থেকে অবনমন করে নবম গ্রেডে নেওয়া হয়েছে।
এ অবস্থায় কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার জন্য সিনিয়র কর্মকর্তাদের চাপও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে ‘প্রতীকী কর্মসূচি’ থেকে বের হতে পারছেন না বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের নেতারা।

অবশ্য ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের নেতারাও স্বীকার করেছেন, টানা ১৫ দিন ধরে আন্দোলন চলছে, অথচ সরকারের শীর্ষ মহলে এর কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের দুর্ভাগ্য—সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কেউ জানতেও চাইলেন না আমরা কেন আন্দোলন করছি। তিনি নিজেও মনে করেন, কঠোর আন্দোলন না হলে হয়ত ফল আসবে না। আর এ কারণেই তরুণ ও কমবয়সী কর্মকর্তারা ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলকে ‘কঠোর কর্মসূচি’ দেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ দিচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের একজন তরুণ কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি দিতে পারলে সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের মর্যাদা ফিরিয়ে দিত। তিনি বলেন, এই আন্দোলনে সিনিয়র কর্মকর্তারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তারা কোনও কঠোর কর্মসূচি দিচ্ছেন না। এতে কেবল সময় ক্ষেপণ হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষকদের আন্দোলন নিয়ে ভাবছেন, কারণ শিক্ষকরা কঠোর আন্দোলনে গিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারাও যে আন্দোলন করছেন, তা হয়ত প্রধানমন্ত্রীকে জানানোই হয়নি। তিনি বলেন, প্রতীকী আন্দোলনে আর যাই হোক, বাংলাদেশ ব্যাংকের মর্যাদা ফিরবে না। তিনি জানান, তার মতো হাজার-হাজার তরুণ কর্মকর্তা মনে করছেন, ‘প্রতীকী কর্মসূচি’ থেকে বের হয়ে না আসলে আন্দোলন সফল হবে না। আর আন্দোলন সফল না হলে আগামী দিনে কোনও প্রথম সারির মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি করতে আসবেন না। আসবেন তৃতীয় সারির ছাত্র-ছাত্রী। 

উল্লেখ্য, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবি নিয়ে ৪ জানুয়ারি বেতন বৈষম্য নিরসন সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকে তিনি শিক্ষকদের দাবির বিষয়টি নিয়ে কমিটির সদস্যদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। 

নাম প্রকাশ না করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই তরুণ কর্মকর্তার মতো আরও অন্তত ২০ জন জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধিকাংশ কর্মকর্তা মনে করেন,  দাবি আদায় করতে হলে আজ হোক কাল হোক ‘প্রতীকী কর্মসূচি’ থেকে কঠোর কর্মসূচির দিকে তাদের যেতে হবে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের মর্যাদা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আন্দোলন করছি’। আমাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। তিনি বলেন, আমরা এমন আন্দোলন করতে চাই না, যা দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করে। তবে আমাদের দাবি উপেক্ষা করা হলে আমরা কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।

তবে, পূর্বের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১০ ও ১১ জানুয়ারী সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত এবং ১২-১৪ জানুয়ারি সকাল ১০ থেকে ১২টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করা হবে। তিনি বলেন, সরকার ১৪ জানুয়ারির মধ্যে যদি অষ্টম জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন সংশোধনের উদ্যোগ না নেয়, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা গণছুটিতে যাবেন।

প্রসঙ্গত, বুধবার এক সভায় ‘গেট গ্যাদারিং’ শীর্ষক আন্দোলনের এ কর্মসূচি ঘোষণা করে অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল।

১৫ ডিসেম্বর অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার এক সপ্তাহ পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন, তাদের ঠকানো হয়েছে। পদবৈষম্য দূর করাসহ তিন দফা দাবিতে গত ২২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের ব্যানারে সমাবেশ করে ব্যাংক কর্মকর্তারা। সমাবেশে উপস্থিত হয়ে সহস্রাধিক কর্মকর্তা ওইদিন দুই ঘণ্টারও বেশি সময় কর্মবিরতি পালন করেন কর্মকর্তারা। পরের দিন ২৩ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এরপর কালো ব্যাজ ধারণ করে অফিস করেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। ওইদিন থেকেই প্রতিদিন এক ঘণ্টার মানববন্ধন পালন করেন। ৩১ ডিসেম্বর প্রতীকী কলম বিরতি, নতুন বছরে এসে গণস্বাক্ষর কর্মসূচিও পালন করা হয়।

ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের দাবি অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোয় বাংলাদেশ ব্যাংককে অন্যান্য সরকারি ব্যাংক অর্থাৎ বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), কর্মসংস্থান ব্যাংক, আনসার ও ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক এবং প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের সঙ্গে সমানভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এই সংজ্ঞায়ন ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মর্যাদা বা বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর দর্শনের (স্পিরিট) সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে মনে করেন আন্দোলনকারীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম যোগদান পদ শুরু হয় সহকারী পরিচালক থেকে। ক্যাডার সার্ভিস ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সমান  গ্রেডে সহকারী পরিচালকেরা এত দিন বেতন-ভাতা পেয়ে আসছিলেন। নতুন কাঠামোয় ক্যাডার সার্ভিস ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকরি শুরুর পদ অষ্টম গ্রেডে রাখা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকে সরাসরি নিযুক্ত সহকারী পরিচালকদের রাখা হয়েছে নবম গ্রেডে। বিষয়টি খুবই অবমাননাকর। এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রথম  শ্রেণির কর্মকর্তা রয়েছেন চার হাজারের বেশি। অথচ কর্মকর্তাদের পদবিন্যাসে গ্রেড-১ কর্মকর্তার কোনও পদ নেই। এটি একটি দৃশ্যমান বৈষম্য।

/এমএনএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম