কোরবানিদাতা যেন পশুর চামড়ায় নিজ খরচে লবণ দিয়ে রাখেন—সেই পরামর্শ দিয়েছে সরকার। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, চামড়া জাতীয় সম্পদ। এটাকে রক্ষায় কোরবানিদাতাকেই এগিয়ে আসতে হবে। তারা নিজ ব্যবস্থাপনায় চামড়ায় লবণ মেখে রাখবেন। বাণিজ্যমন্ত্রীর এই আহ্বানে সাধারণের মনে প্রশ্ন জেগেছে—একটি গরুর চামড়ায় কতটা লবণ লাগে? খরচ কত পড়বে?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিটি বড় গরুর চামড়ার আকার হয় ৩৫-৪০ ফুট। এটা প্রক্রিয়াজাতকরণে ৮-৯ কেজি লবণ লাগলেও কোরবানির সময় লাগে কমপক্ষে ১২-১৪ কেজি। কারণ, ওই চামড়ার বেশিরভাগই অপরিপক্ব হাতে ছাড়ানো হয়। এতে চামড়ায় মাংস ও চর্বি লেগে থাকে। তাতেই লবণ বেশি লাগে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রোজার আগে পাইকারি বাজারে ৬০ কেজি ওজনের প্রতিটি লবণের বস্তা ৪৫০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন দাম ঠেকেছে ৮৭০ টাকায়। এই হিসাবে প্রতিটি গরুর চামড়ায় লবণ দিতে হবে কমপক্ষে ২০০ টাকার।
আবার কোরবানিদাতারা ৬০ কেজির বস্তা না কিনে যাবেন খুচরা দোকানির কাছে। সেখানে কেজি দরে বিক্রি হয় মোটা দানার লবণ। ওটার দাম ২০ টাকা। তাতে খরচ দাঁড়াবে ২৮০ টাকায়।
প্রশ্ন উঠেছে, ২৮০ টাকার লবণ মেখে কোরবানিদাতা ওই চামড়া বিক্রি করবেন কত টাকায়।
আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে পশুর চামড়ার দাম। তাই ঈদুল আজহায় কোরবানিদাতারা ন্যায্যমূল্য পাবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, চামড়ার দাম আন্তর্জাতিক বাজার, কেমিক্যালের দাম, লবণের দাম ও দেশি বাজারের চাহিদার ওপর নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম সামান্য বাড়লেও অন্য সব দিকে বাড়েনি। তাই এ বছরও চামড়ার ন্যায্য দাম নিয়ে আশঙ্কা আছে।
এবার ঢাকায় লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ৪৭ থেকে ৫২ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৪০-৪৪ টাকা। খাসির চামড়া ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ১২-১৪ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার।
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, কোরবানির পশুর চামড়া যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে সচেতন হতে হবে এবং চামড়ায় লবণ দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। মসজিদগুলোতেও এ বিষয়ে কোরবানিদাতাদের সচেতন করার আহ্বান জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেছেন, যে কোরবানিদাতা লাখ টাকা দিয়ে গরু কিনতে পারবেন, তিনি নিশ্চয়ই জাতীয় সম্পদ রক্ষায় ২০০ টাকার লবণও কিনতে পারবেন।
জরিমানা-মামলা
এদিকে ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে লবণের চাহিদা ও সরবরাহ দুটোই বেড়েছে। সুযোগ বুঝে দামও বাড়িয়েছেন একশ্রেণির ব্যবসায়ী।
সরকারের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। লবণের দাম নিয়ে কারসাজি করলে শুধু জরিমানা নয়, মামলাও করা হবে বলে জানিয়েছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর।
অধিদফতরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেছেন, চামড়া নিয়ে এ বছর যাতে কোনও শিরোনাম না হয় তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পশুর চামড়া জাতীয় সম্পদ। এবার চামড়া সংরক্ষণে ভোক্তা অধিদফতরের অভিযান কঠোর হবে। দেশে চাহিদার তুলনায় বহুগুণ লবণ আছে।
সরকারের অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, দেশে মোট লবণের চাহিদা ২৩ লাখ টন। কোরবানি ঈদে লাগে ১ লাখ টনের কম। মজুদ রয়েছে সাড়ে ৩ লাখ টন। তারপরও ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা লবণের বস্তা ১১০০ টাকা হয়েছে। প্রতি বস্তায় ৭৫ কেজি লবণ থাকে। প্রতি কেজি ১৫ থেকে ২০ টাকার বেশি হবে না।
তিনি আরও জানান, চামড়া ব্যবসায়ীরাই ৮০ শতাংশ লবণ সংগ্রহ করেছেন। তাই কোনোভাবেই লবণের বেশি দাম নেওয়া যাবে না।
কাঁচা চামড়া কতক্ষণ ভালো থাকে
ভোক্তা অধিদফতরের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়ে ১৫-১৬ ঘণ্টা কাঁচা চামড়া রাখা যায়। তবে গরমে ৫-৬ ঘণ্টার বেশি রাখলে নষ্ট হয়ে যায়। লবণ মেখে রাখলে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।
তিনি বলেছেন, লবণ না দেওয়ায় গতবার পচে যাওয়া চামড়া পদ্মা নদীতেও ফেলে দিয়েছিল অনেকে। চট্টগ্রামেও ট্রাক থেকে চামড়া ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এবার সেই সুযোগ দেওয়া হবে না। এ নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থাও তৎপর।
এদিকে দেশে লবণের ঘাটতি আছে—এমন দাবি করছেন লবণ মিল মালিকরা। তবে তথ্য বলছে, এখনও দেশে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টন লবণ মজুত রয়েছে। পাশাপাশি আমদানির অপেক্ষায় আছে দেড় লাখ টন লবণ। ঈদে প্রয়োজন হবে ৫৫ থেকে ৫৬ হাজার টন।
লবণের উৎপাদন ও মজুত
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্য বলছে, আবহাওয়াসহ সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় এবার দেশে লবণের উৎপাদন সন্তোষজনক।
২০২১-২২ মৌসুমে লবণের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৩২ হাজার টন। যা বিসিক লবণ উৎপাদন কার্যক্রম শুরুর পর থেকে (৬১ বছর) রেকর্ড।
২০১৮-১৯ অর্থবছরেও ১৮ লাখ ২৪ হাজার টন লবণ উৎপাদিত হয়েছিল।
বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ও পূবালী সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী পরিতোষ কান্তি সাহা বলেন, দেশে লবণের চাহিদা ৩০ লাখ টন। কিন্তু সরকার ২৩ লাখ টন বলছে। বাস্তবে ঘাটতি রয়েছে। শুধু মোটা লবণের দাম কিছুটা বেড়েছে। আমদানির পর সেটা কমে যাবে।









