২০২২ সাল শেষে ব্যাংক খাতে মোট অনাদায়ী ঋণ ছিল ১৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত বছরের শেষে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের মোট পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে মোট ঋণের চার ভাগের এক ভাগই ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদনে মোট খেলাপি ঋণ (এনপিএল), বকেয়া পুনঃতফসিলকৃত ঋণ ও বকেয়া পুনর্গঠিত খেলাপি ঋণের হিসাব কষে অর্থের এই পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, ২০২২ সাল শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা, এছাড়া বকেয়া পুনঃতফসিল করা ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ১২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা ও বকেয়া খেলাপি ঋণ রয়েছে আরও ৪৪ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ব্যাংক খাত যে কতটা নাজুক অবস্থায় আছে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের এই পরিমাণ তা বলে দিচ্ছে। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ চলতি অর্থবছরের বাজেটের প্রায় অর্ধেকের সমান।
প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ প্রকাশ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতের সম্পদের গুণগতমানে সামান্য অবনতি হয়েছে। কারণ, খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট বকেয়া ঋণের ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ ছিল। এটি আগের বছর ছিল ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ ভাঙাশিল্পে খেলাপি ঋণ ২২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অন্যসব খেলাপি ঋণের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী চামড়া ও চামড়াজাত শিল্পে খেলাপি ঋণ আছে ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ, বস্ত্রশিল্পে ১১ দশমিক ৫৪ শতাংশ ও তৈরি পোশাকশিল্পে ১১ দশমিক ১২ শতাংশ।
এদিকে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১১ বছরের মধ্যে ব্যাংক খাতের আমানতে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২০২২ সালে। যদিও গত বছর ব্যাংক খাত থেকে দেওয়া ঋণের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে মাত্র ৫.৭ শতাংশ। ২০২১ সালেও ১০ শতাংশ হারে আমানত বেড়েছিল। সে হিসাবে এক বছরের মধ্যে আমানতের প্রবৃদ্ধি অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০১৩ সালে আমানতে ১৬.০৮ শতাংশ এবং তার আগের বছর ২০১২ সালে ২০.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমেছে। তার মতে, মানুষের খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে তারা ব্যাংকে টাকা জমা রাখার চেয়ে হাতে বেশি টাকা রাখছে। এর প্রভাব গিয়ে পড়েছে আমানতের প্রবৃদ্ধিতে। তিনি বলেন, আমানতের বড় একটা অংশ আসে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির কাছে থেকে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির কারণে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঞ্চয়ে বড় প্রভাব পড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে মোট ঋণ ও অ্যাডভান্স ছিল ১৫.০৩ লাখ কোটি টাকা, যার বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩.৫ শতাংশ। আর মোট আমানত ছিল ১৬.০৩ লাখ কোটি টাকা— যার বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫.৬ শতাংশ। ঋণের এই উচ্চ প্রবৃদ্ধি ভবিষ্যতে ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে কম, কিন্তু ঋণ ও অ্যাডভান্সের ক্ষেত্রে উচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিপরীতে, বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আমানতের উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করেছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণ ও অ্যাডভান্সে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে তারই প্রতিফলন দেখা গেছে।
মোট আমানতের প্রায় অর্ধেকই মেয়াদি আমানত। ২০২২ সালে মেয়াদি আমানতের হিস্যা কিছুটা কমে ৪৫.৯ শতাংশে নেমে এসেছে (২০২১ সালে ছিল ৪৮.৫ শতাংশ)। আর চলতি আমানত (কারেন্ট ডিপোজিট), সঞ্চয়ী আমানত (সেভিংস ডিপোজিট) ও অন্যান্য আমানতের হিস্যা ছিল যথাক্রমে ২২.২ শতাংশ, ২৩.৮ শতাংশ ও ৮.২ শতাংশ।
আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতি জুনে বার্ষিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ প্রকাশ করতো। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের শর্ত হিসেবে আবারও এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা শুরু করলো।









