বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশ সফরকারীরা নজরদারিতে

শফিকুল ইসলাম
১১ মার্চ ২০১৬, ১৬:৪৪আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৬, ১৮:০৭

হ্যাকার বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা হ্যাকড হওয়ার ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেকগুলো বিষয় খতিয়ে দেখছে। বিশেষ করে, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশি কেউ জড়িত আছেন কি না—গোয়েন্দাদের এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গত ৬ মাসে যারা প্রশিক্ষণ, কর্মশালা বা সভা-সেমিনারে ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলেন, তাদেরও একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এ তালিকায় যারা আছেন তারা ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কায় গিয়ে কোথায় থেকেছেন, কার সঙ্গে কোনও মিটিং, কোনও সভা বা  সেমিনারে অংশ নিয়েছেন তা তদন্ত চলছে। এ লক্ষ্যে আবারও ফিলিপাইন সফরে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি উচ্চ পর্যায়ের টিম। একজন নির্বাহী পরিচালকের নেতৃত্বে ওই টিমে একজন মহা-ব্যবস্থাপক (জিএম) ও একজন উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) পর্যায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন। সোমবার (১৪ মার্চ) সকালে টিমটি ম্যানিলার উদ্দেশে  রওয়ানা হতে পারে। শুক্রবার বাংলা ট্রিবিউনকে এমন তথ্য জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা গত ৬ মাসে ফিলিপাইন বা শ্রীলঙ্কা গিয়েছেন, তাদের সঙ্গে সেসব দেশের কারও সঙ্গে কোনও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। সরকারের প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে, কারও ব্যাপারে ন্যূনতম সন্দেহ থাকলে তার ওপর কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। ওই তালিকায় যারা আছেন, তাদের কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ঢাকার বাইরে না যাওয়ার জন্য মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তালিকায় কতজন আছেন, কারা-কারা আছেন, সে বিষয়ে কেউই মুখ খুলছেন না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা আরও জানান, ওই টিমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন উপ-সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারও যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ অ্যাকাউন্ট থেকে এভাবে কয়েকদফায় টাকা হ্যাকড হওয়ায় ইমেজ সংকটে পড়েছে সরকার তথা অর্থ মন্ত্রণালয়। তাই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্ট থাকার বিষয়টিকেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সরকার। বিষয়টি নিয়ে খুবই বিব্রত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তার নির্দেশেই বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই টিমের সঙ্গে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে যুক্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র।

বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর হওয়ায় কোনওভাবেই যেন কোনও মহলের তদবিরে তদন্ত বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকটিও নিশ্চিত করার দিকে নজর রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন একজন ডেপুটি গভর্নর। বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে রিজার্ভের চুরি যাওয়া টাকা উদ্ধারে সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।  

এ দিকে পুরো বিষয়টি বহুমুখী তদন্তাধীন থাকায় এখনও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারকরা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাতে রাজি হচ্ছেন না। এমনকি কেউ মুখ খুলতেও সাহস করছেন না। পুরো বাংলাদেশ ব্যাংকজুড়ে এখন থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহাও মেপে মেপে কথা বলছেন। সাংবাদিকদের ফোন ধরছেন হিসাব-নিকাশ করে। এত কিছুর পর তিনি শুধু এটুকুই জানান, চুরি হওয়া অর্থ ফেরত আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক তৎপর রয়েছে। ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষের তৎপরতাও সন্তোষজনক। দেশটির আদালতসহ সব কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছে। ফলে অর্থ ফেরত পাওয়া সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য একটি সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন দুটি দল বিমানবন্দর ও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে আলোচনা করতে শিগগিরই ঢাকায় আসবেন। বিষয়টি পররাষ্ট্র সচিব এম শহিদুল হককে জানিয়েছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেন্স ব্লুম বার্নিকাট।

বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাকড হওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট গন্তব্য শনাক্ত করে উদ্ধারের বিষয়ে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ফিলিপাইনের এন্টি-মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করছে।

এদিকে, সন্দেহভাজনদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য উদ্ধার করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৪ কর্মকর্তাকে বৃহস্পতিবার গোপনে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে গভর্নর ড. আতিউর রহমান নিজে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন বলে জানা গেছে। এদিকে, সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, তদন্তে অনেকগুলো বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বর্তমানে দিল্লি অবস্থান করছেন। তিনি পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলভুক্ত দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আয়োজিত তিনদিনব্যাপী এক সেমিনারে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার দিল্লি গেছেন। দিল্লির তাজ হোটেলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই সেমিনার। গভর্নর ওই সেমিনারে আলোচ্য কয়েকটি সেশনে বক্তৃতাও করবেন। গভর্নর ড. আতিউর রহমান আগামী ১৪ মার্চ সকালে ঢাকায় ফিরবেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মহা-ব্যবস্থাপক এএফএম আসাদুজ্জামান। তিনি জানান, গভর্নর ড. আতিউর রহমানের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান ও নাজনীন সুলতানা এ  বিষয়গুলো তদারকি করছেন। তবে অন্য ডেপুটি গভর্নরাও এ বিষয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। গভর্নর  দিল্লিতে থেকেই এ সম্পর্কিত বিষয়গুলো মনিটর করছেন বলে জানান তিনি।     

এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডাটাবেজ বা সার্ভার সম্পর্কে জানে এমন সব প্রতিষ্ঠানকেও তদন্তের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী কাজ চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য ফিলিপাইনের ব্যাংকো সেন্ট্রাল এনজি ফিলিপিনাসের সঙ্গে আলোচনা শেষে দেশে ফেরার পর এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হ্যাকড হওয়ার ঘটনায় কোনও বিদেশি প্রতিষ্ঠান জড়িত  আছে কিনা বিশেষজ্ঞরা সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখছেন।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা শাখার একটি চৌকস দল বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর কড়া নজরদারি করছেন। তদন্তের স্বার্থে পদ পদবিসহ তাদের পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের কাছ থেকে প্রযুক্তিগত কিছু তথ্য ইতোমধ্যেই জানতে চাওয়া হয়েছে।

এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, ফিলিপাইনের অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষ তাদের দেশের আদালতে মামলা দায়ের করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবগুলো ফ্রিজ আদেশ আদালত থেকে সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন সাইবার বিশেষজ্ঞ পরামর্শক ও তার ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশন টিম এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের টিমের সঙ্গে কাজ করছে বলে জানা গেছে।

সূত্র আরও জানায়, শুধু টাকা হ্যাকডই নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও  অনেক গোপন তথ্য হ্যাকারদের কাছে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পরামর্শক রাকেশ আস্তানা। যে প্রক্রিয়ায় টাকা হ্যাকডের ঘটনা ঘটেছে বা  ঘটানো হয়েছে তাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ সরাসরি জড়িত থাকতে পারেন বলে তিনি মনে করেন না। তিনি ধারণা করছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পরিচালনা ব্যবস্থা সম্পর্কে হ্যাকারদের খুব স্বচ্ছ ধারণা ছিল। কেননা, রিজার্ভের অর্থ চুরির জন্য এমন একটি সময়কে তারা বেছে নিয়েছে যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের তিনজন ডেপুটি গভর্নরের পদই শূন্য ছিল। চারজন ডেপুটি গভর্নরের মধ্যে  আবুল কাশেম ছাড়া অন্য তিনজন ডেপুটি গভর্নর—এস কে সুর চৌধুরী, আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান ও নাজনীন সুলতানার মেয়াদ শেষে হয় গত ২১ জানুয়ারি। এর প্রায় ১৫দিন পর গত ৭ ফেব্রুয়ারি এই তিনজন ডেপুটি গভর্নরের চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আদেশ জারি করে সরকার। এ বিষয়টিকেও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, রিজার্ভ জনগণের সম্পদ। জনগণের পক্ষে সরকার এর মালিক। বাংলাদেশ ব্যাংক এর সংরক্ষক পাশাপাশি ব্যবস্থাপক। রিজার্ভ হ্যাকড হওয়ার বিষয়টি একটি বড় সমস্যা। তবে এটি জাতীয় বিপর্যয় নয়। রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার যে সফটওয়্যার আছে তাকে এমন লোক দিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে, যাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সব গোয়েন্দা সংস্থা নিরাপদ বলে ছাড় দিয়েছে। কারণ, ভেতরের কোনও সম্পৃক্ততা ছাড়া এ ধরনের হ্যাকিং সহজ নয়। এমন হতে পারে হ্যাকাররা হয়তো ঢুকতে পারে, হয়তো এভাবে করেও, তবে তা অনেক কষ্টসাধ্য। আর যদি কোনও অভ্যন্তরীণ সহায়তা পায়, তাহলে সেটা অনেক সহজ।

ড. ফরাস উদ্দিন আরও বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে একতরফা দোষারোপ করা ঠিক হবে না। আবার বাংলাদেশ ব্যাংককে কোনও দোষ না দেওয়াটাও ঠিক নয়। সুতরাং তদন্তের সময় দিতে হবে। তদন্তটা বস্তুনিষ্ঠ হতে হবে। অভিজ্ঞদের দিয়ে তা করাতে হবে।

/এপিএইচ/এমএনএইচ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম