১৮ দফা মেনে নেওয়ার খবর নেই শ্রমিকদের কাছে!

উদিসা ইসলাম
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ২২:০০আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ২২:১৫

সাভারের আশুলিয়া ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে গত কয়েক দিন ধরে চলমান অসন্তোষ থামছে না। শ্রমিকদের দেওয়া ১৮ দফা মালিকপক্ষ মেনে নেওয়ার পর ২৫ সেপ্টেম্বর স্বাভাবিক হতে শুরু হয় শিল্পাঞ্চলের কর্মপরিবেশ। এরপরই ২৯ তারিখ ১২দফা নিয়ে হাজির হন আরেক কারখানার শ্রমিকরা। সর্বশেষ আজ সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বাইপাইল ও ডিওএইচএস পয়েন্টে সড়ক অবরোধ করলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে এক শ্রমিক নিহতের খবর আসে।

শ্রমিক নেতাদের দাবি, ১৮ দফা মেনে নেওয়া হলেও শ্রমিকদের কাছে দফাগুলো নিয়ে সঠিক তথ্য নেই। সবাই এ বিষযে জানেনও না। ফলে অন্য এলাকার কারখানাগুলোর শ্রমিকেরা নিজেদের দাবি নিয়ে মাঠে থাকছেন। বিচ্ছিন্নভাবে দাবি নিয়ে কাজ করলে অসন্তোষ কমানো কঠিন হবে বলেও মত তাদের।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর নবীনগর-আশুলিয়া-আব্দুল্লাহপুর সড়কের নরসিংহপুর, নিশ্চিতপুর, ঘোষবাগ ও জিরাবো এলাকায় ৫৩টি পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও কর্মবিরতি পালন করেন। এদের মধ্যে ৪৪টি পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ছিল। এছাড়া ৯টি পোশাক কারখানায় সকালে শ্রমিকরা কাজে যোগ দিলেও বিক্ষোভের কারণে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কারখানা কর্তৃপক্ষ।

সোমবার আশুলিয়ায় পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ হয় (ছবি: সাভার প্রতিনিধি)

পরে শ্রম মন্ত্রণালয় জানায়, পোশাক শিল্পের সাম্প্রতিক অস্থিরতা নিরসনের লক্ষ্যে চার জন উপদেষ্টার সমন্বয়ে সভা করে, মন্ত্রণালয়ের একাধিক দল মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করে, শ্রমিক নেতা ও পোশাক শিল্পের মালিকপক্ষের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করার পরে ১৮ দফা দাবি পূরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যৌথ ঘোষণায় জানানো হয়, দেশের পোশাক শিল্পের সব কারখানার শ্রমিকদের মাসিক হাজিরা বোনাস ২২৫ টাকা বাড়ছে। টিফিন ও রাত্রিকালীন ভাতাও (নাইট বিল) বাড়বে। সেই সঙ্গে আগামী অক্টোবরের মধ্যে বিদ্যমান নিম্নতম মজুরি বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া ১০ অক্টোবরের মধ্যে কারখানা কর্তৃপক্ষকে শ্রমিকদের সব বকেয়া মজুরি পরিশোধ করা হবে। এগুলোসহ শ্রমিকদের ১৮ দফা দাবি বাস্তবায়নে সম্মত হয় মালিকপক্ষ।

১৮ দফার মধ্যে আরও ছিল–– শ্রমঘন এলাকায় টিসিবি ও ওএমএসের মাধ্যমে রেশন প্রদান, কারখানায় শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করা বন্ধ করতে মনিটরিং, ঝুট ব্যবসা মনিটরিং করে শ্রমিকদের মধ্যে থেকে ক্রেতা বের উপায় বের করা, গত বছর ন্যূনতম মজুরি আন্দোলনসহ নানা সময় মামলা ও শ্রমিকদের নিপীড়নমূলক মামলা প্রত্যাহারের জন্য রিভিউ করে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সমাধান করা, নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা, জুলাই আন্দোলনে নিহতদের ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা করা, রানা প্লাজা ও তাজরিন ফ্যাশনের বিষয়ে কমিটি গঠন, সব কারখানায় ডে-কেয়ার সেন্টার নিশ্চিত করা, অন্যায্যভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করা, নারী কর্মীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ১২০ দিন করা, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন, শ্রম আইন সংশোধন নিয়ে কাজ করা, প্রভিডেন্ট ফান্ড পর্যালোচনা করে শ্রমিক মালিকের আলোচনার মাধ্যমে চালু করা এবং প্রতি বছর দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট বিষয়ে কমিটি গঠন।

কিন্তু এসব দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা আসার চার দিনের মধ্যেই ২৯ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের ভবানীপুর এলাকার আর অ্যান্ড জি বিডি গার্মেন্টস লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা হাজিরা বোনাস, নাইট বিল ও টিফিন বিল বৃদ্ধি, প্রশাসন বিভাগের ব্যবস্থাপকের অপসারণসহ ১২ দফা দাবিতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। তাদের দফার সঙ্গে আগের ১৮ দফার মিল থাকার পরও আগের ঘোষণাকে আমলে নিচ্ছেন না তারা। রবিবার দুপুর পৌনে ২টা থেকে বিকাল পৌনে ৫টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা শ্রমিকরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। পরে গার্মেন্টের প্রশাসন বিভাগের ব্যবস্থাপক হাসান স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে শ্রমিকরা সড়ক থেকে সরে যায়।

কেন দাবি মেনে নেওয়ার পরেও শ্রমিকরা আন্দোলনে–– এই প্রশ্নের জবাবে আশুলিয়া এলাকার আন্দোলনরত শ্রমিক কাশেম আলী বলেন, আমি তো ১৮ দফা জানি না। হঠাৎ একটা একটা করে কারখানা থেকে খবর আসে বন্ধ হয়ে যাওয়ার। বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের দুই-তিন মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়নি। আমারও এমন হয় কিনা সেই ভয়ে রাস্তায় নেমেছি। সবার দাবি মানছে শুনছি, আমাদেরটা পড়ে থাকবে কেন?

এদিকে সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সাভারের আশুলিয়ায় পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে কাউসার হোসেন খান (২৭) নামে একজন নিহত হয়েছেন। এতে আহত হয়েছেন আরও ২০ জন।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে স্বাভাবিক হয়ে আসছিল গার্মেন্ট শিল্প (ছবি: সাভার প্রতিনিধি)

এতদিনেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলো না কেন–– প্রশ্নে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির ঢাকা মহানগরের সভাপতি আবুল হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখন তো বৈষম্যবিরোধী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাহলে বৈষম্য থাকবে কেন সেটা শ্রমিকের প্রশ্ন। ফলে সে তার জায়গা থেকে দাবি উত্থাপন করছে। তবে এই অরাজকতা শ্রমিকরা করে না, বাইরে থেকে করানো হয়। আবার অনেক সময় কর্তৃপক্ষ হুটহাট মন্তব্য করে ফেলে। সেটা বাস্তবায়ন করতে না পারলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়। শ্রমিকদের খুব সংবেদনশীলভাবে হ্যান্ডেল করতে হয়।

১৮ দফা মেনে নেওয়ার পরেও নতুন দফা কেন আসছে এবং শ্রমিকরা কেন পথে–– জানতে চাইলে গামেন্টস সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার বলেন, এই যে ১৮দফা মেনে নেওয়া হয়েছে সেটা সবাই এখনও জানে না। শ্রমিকদের কাছে প্রকৃত তথ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজ আমরা করছি। এটা যে সবার জন্য প্রযোজ্য সেটা তো তাদের জানতে হবে।

সোমবারের শ্রমিক বিক্ষোভে পুলিশি অ্যাকশন বিষয়ে তিনি বলেন, দাবি পূরণের মধ্য দিয়ে সমাধান আনতে হবে। শ্রমিকদের ওপর হামলা গুলি মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এই হত্যার বিচার দাবি করি।

১৮ দফা মানার পরে আবারও কেন পথে শ্রমিক–– জানতে চাইলে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নতুন করে ১২ দফা বিষয়ে গণমাধ্যমে দেখেছি। মূল বিষয় ১৮ দফা, যেটা মালিক-শ্রমিক-সরকারের সমন্বিত বোঝাপড়ায় মেনে নেওয়া হয়েছে এবং আমরা সেটাকে সম্মান জানাতে চাই। কিন্তু এটা এত বড় সেক্টর, সবার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়গুলো জানানো সম্ভব হয়নি এখনও। আমরা ঠিক করেছি শ্রমিকদের মধ্যে এই বিষয়টি আরও সুচিন্তিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি করতে হবে। আজও আমরা বিভিন্ন প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে সেটার একটা কর্মপরিকল্পনা ঠিক করেছি। এটা যত দ্রুত ছড়ানো যাবে, তত ভালো হবে। তবে যারা এরপরেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইবে তারা প্রকৃত শ্রমিক নয়। 

আরও পড়ুন- 

পোশাক খাতের শ্রমিকরা কাজে ফিরেছেন, কতটা খুশি মালিকরা?

সময় বদলেছে, দমন করতে গেলে কী হয় গণঅভ্যুত্থান দেখিয়েছে

১৮ দাবিতে ঐকমত্য: কাল থেকে খোলা থাকবে সব গার্মেন্ট কারখানা

/এফএস/
সম্পর্কিত
ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের ওপর পুলিশের গুলি, জামায়াতের নিন্দা
বিজিএমইএর ৯৯ শতাংশের বেশি কারখানায় বেতন-বোনাস পরিশোধ
পোশাক কারখানাসহ দেড় হাজার প্রতিষ্ঠানে বোনাস বকেয়া
সর্বশেষ খবর
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম