বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার’ গত চার মাস ধরে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। সেখানে কোনও অগ্রগতি হয়নি। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে আর্থিক খাতকে রক্ষা করতে এই আইন অত্যন্ত জরুরি।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসিবি) আয়োজিত ‘ইমপ্লিকেশনস অব এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ফর ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি: বাংলাদেশ পার্সপেক্টিভ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
গভর্নর বলেন, “আমরা সরকারের কাছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আইনের প্রস্তাব পাঠিয়েছি। ব্যাংক রেজুলেশন অর্ডিন্যান্স ও ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স অর্ডিন্যান্স ইতোমধ্যে পাস হয়েছে। এর আওতায় ৫টি ব্যাংক একীভূত করা হচ্ছে এবং ৯টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার’ চার মাস ধরে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “এই আইন পাস না হলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া কঠিন হবে। মৌলিক সংস্কার আনতে গেলে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বাধা সৃষ্টি করছে। তাদের প্রতিহত না করতে পারলে দেশ আবার আগের জায়গায় ফিরে যেতে পারে।”
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে কড়া সমালোচনা
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন গভর্নর। তিনি বলেন, “গত সরকারের আমলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো পাপেটের মতো আচরণ করেছে। যখন ৬ থেকে ৯ শতাংশ সুদের হার বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, তখন তারা তালি দিয়েছিল। অর্থ পাচারের সময়েও তারা নীরব ছিল। এমন আচরণে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না।”
এলডিসি উত্তরণ নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান
এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, “বাংলাদেশকে আমি আফগানিস্তানের মতো দেশের কাতারে দেখি না। বাংলাদেশ এখন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা ভারতের মতো দেশের সমমর্যাদার দাবিদার। এলডিসি থেকে আজ হোক বা কাল হোক— আমাদের উত্তরণ হতেই হবে।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শক্তিশালী মুদ্রা ও আর্থিক কাঠামো, দক্ষতা বৃদ্ধি, লজিস্টিকস, যোগাযোগ, আইসিটি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত উন্নয়ন ছাড়া এই উত্তরণ টেকসই হবে না। “সামান্য সুবিধার জন্য বড় সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না,” যোগ করেন তিনি।
মুদ্রানীতি ও কর্মসংস্থান নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
অনুষ্ঠানে হা-মীম গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করলেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তার দাবি, কঠোর মুদ্রানীতির ফলে ইতোমধ্যে প্রায় ১২ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন এবং আগামী ছয় মাসে আরও ১২ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাতে পারেন।
তিনি জানান, বেসরকারি খাত ব্যাংক থেকে মাত্র ৬ শতাংশ ঋণ নিয়েছে, যেখানে সরকার নিয়েছে ২৭ শতাংশ— যা ভবিষ্যতে ৩২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো ছাড়া কেবল মনিটারি পলিসি দিয়ে অর্থনীতি সামাল দেওয়া যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সুদের হার কমাতে সুশাসনের ওপর জোর
সুদের হার প্রসঙ্গে গভর্নর স্বীকার করেন, বর্তমান হার তুলনামূলক বেশি। তবে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে এক অঙ্কের সুদের হার খুব একটা দেখা যায়নি। ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার বেরিয়ে গেছে এবং খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ফলে সংকোচন স্বাভাবিক ছিল।”
তবে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমানত প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সুশাসন, গ্রাহক আস্থা বৃদ্ধি এবং খেলাপি ঋণ কমানো গেলে সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি— দুটোই নিয়ন্ত্রণে আসবে।









