কয়েক বছর আগেও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির আলোচনায় বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের নাম উচ্চারিত হতো একইসঙ্গে। তৈরি পোশাক রফতানি, দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং উন্নয়নের নানা সূচকে বাংলাদেশকেও অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভাবনাময় অর্থনীতি হিসেবে তুলে ধরা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ার সময়ে ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার মতো কয়েকটি দেশ দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। সবশেষ বিশ্বব্যাংকের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস সেই পরিবর্তনেরই নতুন প্রমাণ।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের হালনাগাদ তালিকায় ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, জর্ডান ও মাইক্রোনেশিয়া নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে টোগো স্বল্প আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উঠে এসেছে। অথচ বাংলাদেশ এখনও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবেই রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক প্রতি বছর আগের ক্যালেন্ডার বছরের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (জেএনআই পার ক্যাপিটা) বিবেচনায় বিশ্বের অর্থনীতিগুলোকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করে। এ বছরের তালিকা বলছে, বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় থাকা কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে নতুন আয়ের স্তরে পৌঁছে গেছে।
সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ভিয়েতনাম। তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশটি এখন শুধু পোশাক নয়, ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর, মোবাইল ফোন, যন্ত্রাংশ ও উচ্চপ্রযুক্তি পণ্যের বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় বেড়ে ৪ হাজার ৯৭০ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের জন্য নির্ধারিত ৪ হাজার ৬৩৬ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ভিয়েতনামের রফতানি ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ৭ ও ৮ শতাংশ। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট জাতীয় আয় গড়ে বছরে ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি।
শুধু ভিয়েতনাম নয়, ফিলিপাইনও অর্থনীতির প্রায় সব খাতে সম্প্রসারণের মাধ্যমে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২২ সালের নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে মাত্র তিন বছরের মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়ে একই কাতারে পৌঁছেছে শ্রীলঙ্কা। জর্ডান জাতীয় হিসাব পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে এবং মাইক্রোনেশিয়া স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে নতুন শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব দেশের অগ্রগতির পেছনে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে—নীতিগত ধারাবাহিকতা, রফতানির বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনও তৈরি পোশাক খাতের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল। ইলেকট্রনিকস, প্রযুক্তিপণ্য ও উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় রফতানির বৈচিত্র্য সীমিত রয়েছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভিয়েতনামের উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা। এটি দেখিয়েছে, ধারাবাহিক অর্থনৈতিক সংস্কার, রফতানির বহুমুখীকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তুলনামূলক অল্প সময়েও উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব।
তার ভাষায়, ভিয়েতনাম শুধু পোশাক রফতানির ওপর নির্ভর করেনি; বরং ইলেকট্রনিকস, প্রযুক্তিপণ্য ও উচ্চমূল্য সংযোজিত শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। একই সঙ্গে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণ, বন্দর ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি শিক্ষা এবং দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে।
মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বাংলাদেশের এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রফতানির বহুমুখীকরণ এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, প্রকৌশল পণ্য, রাসায়নিক শিল্প ও উচ্চমূল্য সংযোজিত পোশাক উৎপাদনে বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত স্থিতিশীলতা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, কাস্টমস ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোতে দ্রুত বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এখনও উন্নয়নের দৌড় থেকে ছিটকে পড়েনি। তবে প্রতিযোগী দেশগুলো যখন দ্রুত উচ্চতর আয়ের স্তরে পৌঁছে যাচ্ছে, তখন সংস্কার ও বিনিয়োগে বিলম্বের সুযোগ আর নেই। আগামী দশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পৌঁছাতে হলে অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার, রফতানির বৈচিত্র্য, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।









