সুগন্ধি চাল নিয়ে কী ঘটেছিল? দাম চড়তেই অর্ধেক হলো রফতানি কোটা

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:২২আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:২২

রফতানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল ৪৫ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন সুগন্ধি চালের। সুযোগ পেয়েছিল ২৭৮টি প্রতিষ্ঠান। অথচ ৩০ আগস্ট পর্যন্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হাতে আসা হিসাবে ১২৯ প্রতিষ্ঠান রফতানি করতে পেরেছে মাত্র ২ হাজার ৪১৯ দশমিক ৪৩ মেট্রিক টন। বাকি ১৪৯ প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ রফতানি তথ্য পায়নি সরকার। এর মধ্যেই দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আগের অনুমোদিত রফতানি কোটা ৫০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে সরকার।

ফলে আগে যেসব প্রতিষ্ঠান যে পরিমাণ সুগন্ধি চাল রফতানির অনুমতি পেয়েছিল, এখন তার অর্ধেকের বেশি রফতানি করতে পারবে না। ৪৫ হাজার ২৭০ টনের অনুমোদিত মোট কোটা অর্ধেকে নামলে কার্যত সর্বোচ্চ অনুমোদিত পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২২ হাজার ৬৩৫ মেট্রিক টন। তবে সংশোধিত অনুমোদনের মেয়াদ থাকবে আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রফতানি-২ শাখা থেকে জারি করা সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, দেশের বাজারে চালের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য মূল্যচাপ নিয়ন্ত্রণে এই কোটা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন সিদ্ধান্তে শুধু কোটা কমানো হয়নি, রফতানিতে নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ১০টি শর্তও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিটি চালানের আগে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পণ্যের মান ও সত্যতা যাচাই, জাহাজীকরণের পর সংশ্লিষ্ট নথি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দাখিল, অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত চাল রফতানি নিষিদ্ধ এবং রফতানি আয় দেশে ফেরানোর প্রমাণ হিসেবে পিআরসি (প্রসিডস রিয়ালাইজেশন সার্টিফিকেট) জমা দেওয়া।

একইসঙ্গে প্রতি কেজি সুগন্ধি চালের সর্বনিম্ন এফওবি রফতানিমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার। অনুমোদন অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানকে হস্তান্তর করা যাবে না, সাব-কন্ট্রাক্টেও রফতানি করা যাবে না। জনস্বার্থে সরকার যেকোনও সময় অনুমোদন বাতিল করার ক্ষমতাও রেখেছে।

২৭৮ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হিসাব মিলেছে ১২৯টির

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে চলতি বছরের ১৩ মে প্রথম দফায় ২১১ প্রতিষ্ঠানকে সুগন্ধি চাল রফতানির অনুমতি দেওয়া হয়। পরে দ্বিতীয় দফায় আরও ৬৭ প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ২৭৮ প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুমোদিত পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৫ হাজার ২৭০ মেট্রিক টন। কিন্তু বাস্তব রফতানির চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ আগস্ট পর্যন্ত ১২৯ প্রতিষ্ঠান মোট ২ হাজার ৪১৯ দশমিক ৪৩ মেট্রিক টন সুগন্ধি চাল রফতানি করেছে। অর্থাৎ আগের অনুমোদিত ৪৫ হাজার ২৭০ টনের তুলনায় এখনও পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া রফতানির পরিমাণ মাত্র প্রায় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।

তবে এটিকে চূড়ান্ত রফতানির হার বলা যাচ্ছে না। কারণ অনুমতি পাওয়া আরও ১৪৯ প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত হিসাবে যোগ হয়নি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘মোট ২৭৮টি প্রতিষ্ঠান সুগন্ধি চাল রফতানির অনুমতি পেয়েছে। এর মধ্যে ১২৯টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য পেয়েছে মন্ত্রণালয়। এসব প্রতিষ্ঠান এখনও পর্যন্ত ২ হাজার ৪১৯ দশমিক ৪৩ মেট্রিক টন সুগন্ধি চাল রফতানি করতে সক্ষম হয়েছে।

এর আগে ১৩ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রফতানি-২ শাখা থেকে অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রকৃত রফতানির তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছিল। কারণ রফতানির অনুমতি পাওয়ার পরও অনেক প্রতিষ্ঠান পুরো কোটা ব্যবহার করতে পারেনি, কেউ কেউ করেছে আংশিক রফতানি।

বাজারে ১২০ টাকার চাল ২৪০ টাকা

সরকার যখন রফতানির হিসাব নতুন করে যাচাই করছে, তখন অভ্যন্তরীণ বাজারে সুগন্ধি চালের মূল্য পরিস্থিতিও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক কামাল হোসেন পলাশ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা অবশ্যই চাই বাংলাদেশের পণ্য, বিশেষ করে কৃষিপণ্য রফতানি হোক। রফতানি দেশের জন্য ভালো। তবে দেশের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করেই রফতানির সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেশের মানুষের চাহিদা আগে, এরপর বিদেশে রফতানির বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।’’

তিনি বলেন, ‘‘সুগন্ধি বা পোলাও চালের দাম সাধারণত কেজিপ্রতি ১২০ থেকে ১৩০ টাকার মধ্যে থাকতো। কিন্তু রফতানির অনুমতি দেওয়ার পর বাজারে এর দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে তা পাইকারি বাজারে ২০০ টাকা ছাড়িয়ে ২২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে।’’

চিনিগুঁড়া, কালিজিরা, কাটারিভোগসহ বিভিন্ন সুগন্ধি চালের দাম গত কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের একাংশ রফতানির অনুমতিকে এই মূল্যবৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে দেখছেন। অপরদিকে রফতানিকারক ও মিলারদের একাংশ উৎপাদন কমে যাওয়া, ধানের বাড়তি দাম, মজুত, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় এবং বিশেষায়িত মিলিং খরচকেও দায়ী করছেন।

ফলে মূল্যবৃদ্ধির পুরো দায় সরাসরি রফতানির ওপর চাপানোর সুযোগ না থাকলেও সরকার এখন রফতানির অনুমোদিত পরিমাণ কমিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অবস্থান নিয়েছে।

কামাল হোসেন পলাশ মনে করেন, শুধু অনুমোদিত কোটার হিসাব করলেই হবে না। সেই অনুমোদনের অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে কিনা, সেটিও কঠোরভাবে দেখা দরকার।

তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশে সুগন্ধি চালের অভ্যন্তরীণ চাহিদা খুব বেশি নয়। তবে একসঙ্গে বেশি পরিমাণ রফতানির অনুমতি দেওয়া হলে, তার প্রভাব বাজারে পড়তে পারে। আবার যেসব প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল রফতানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তারা অনুমোদিত পরিমাণের চেয়ে বেশি চাল অন্য কোনও উপায়ে বিদেশে পাঠিয়েছে কিনা, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।’’

তার মতে, সরকার যাচাই-বাছাই করে এবং বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে রফতানির অনুমতি দিলে ভালো হবে। একইসঙ্গে একজন রফতানিকারক যে পরিমাণ চাল রফতানির অনুমতি পেয়েছেন, সেই অনুমতি যেন অপব্যবহার বা নকল করে অতিরিক্ত চাল রফতানি করা না যায়, সেটিও কঠোরভাবে নজরদারিতে রাখতে হবে।

বানিজ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্দেশনায় সেই নজরদারিই জোরদার করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। প্রতিটি চালানের আগে কাস্টমসের যাচাই, চালান শেষে নথিপত্র জমা এবং ভবিষ্যতে নতুন অনুমোদনের ক্ষেত্রে আগের প্রকৃত রফতানির প্রমাণ দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

‘রফতানি বন্ধ নয়, সহনশীল পর্যায়ে থাকুক’

তবে রফতানি পুরোপুরি বন্ধ করারও পক্ষে নন রফতানিকারকরা। ব্যবসায়ী কামাল হোসেন পলাশ বলেন, ‘‘রফতানি একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হলে— যারা দীর্ঘদিন ধরে চাল রফতানির সঙ্গে যুক্ত, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই আমরা চাই না রফতানি পুরোপুরি বন্ধ হোক। বরং দেশের বাজার ও ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা করে সহনশীল পর্যায়ে রফতানি চালু রাখা হোক। রফতানির পরিমাণও এমন হতে হবে, যাতে দেশের বাজারে সরবরাহ বা দামের ওপর অস্বাভাবিক চাপ না পড়ে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘আমাদের কাছে দেশের স্বার্থই আগে। দেশের বাজার স্থিতিশীল রেখে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা নিশ্চিত করে এবং কার্যকর নজরদারির মাধ্যমে রফতানি চালু রাখাই সবচেয়ে ভালো পথ।’’

এবার নজর প্রকৃত রফতানির পূর্ণ হিসাবের দিকে

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, রফতানি পুরোপুরি বন্ধ করা হচ্ছে না। বরং অভ্যন্তরীণ বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনায় তা নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে নামিয়ে আনা হচ্ছে।

তবে অনুমতি পাওয়া ২৭৮ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১২৯টির তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি ১৪৯ প্রতিষ্ঠান কত চাল রফতানি করেছে, কতটি প্রতিষ্ঠান একেবারেই রফতানি করতে পারেনি এবং মোট ৪৫ হাজার ২৭০ টনের অনুমোদনের আসলে কতটা ব্যবহার হয়েছে সেই তথ্য পাওয়া যায়নি।

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
খালি কনটেইনার, কাগজে  রফতানি দেখানো ৫ কোটি টাকার পণ্য
হরমুজ বন্ধে মধ্যপ্রাচ্যের তেল রফতানি কমেছে ৩৯ শতাংশ
বাংলাদেশ কেন ভারতে পণ্য বিক্রি করতে পারছে না?
সর্বশেষ খবর
খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেমে যেভাবে তারকা হলেন আইএএস কর্মকর্তা
খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেমে যেভাবে তারকা হলেন আইএএস কর্মকর্তা
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
বাংলাদেশের জার্সিতে জাপানি সুকি, জয় এনে দিলেন মোরসালিন-ইমন
বাংলাদেশের জার্সিতে জাপানি সুকি, জয় এনে দিলেন মোরসালিন-ইমন
অ্যালামনাইদের অভিজ্ঞতা ও মুশফিকের পরামর্শে ড্যাফোডিলে নবীনবরণ
অ্যালামনাইদের অভিজ্ঞতা ও মুশফিকের পরামর্শে ড্যাফোডিলে নবীনবরণ
সর্বাধিক পঠিত
সিগারেটের দাম বাড়লো ৩ টাকা, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন
সিগারেটের দাম বাড়লো ৩ টাকা, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন
দুধে ডিটারজেন্ট আছে কি না সহজে জানবেন যেভাবে
দুধে ডিটারজেন্ট আছে কি না সহজে জানবেন যেভাবে
কাঁচপুর-ইলিশা সরাসরি ফেরি উদ্বোধন আজ
কাঁচপুর-ইলিশা সরাসরি ফেরি উদ্বোধন আজ
গতকাল নতুন বাসায় উঠেছিলেন চিকিৎসক, আজ মিললো লাশ
গতকাল নতুন বাসায় উঠেছিলেন চিকিৎসক, আজ মিললো লাশ
চুরি ঠেকাতে ক্রেন দিয়ে দুই তলার ছাদে তোলা হলো নতুন গাড়ি
চুরি ঠেকাতে ক্রেন দিয়ে দুই তলার ছাদে তোলা হলো নতুন গাড়ি