ঋণ পরিশোধেই রাজস্বের ১৪ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে নিম্নআয়ের দেশগুলোর

গোলাম মওলা, ব্যাংকক থেকে
১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৫০ আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৫২

মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের চাপে নিম্নআয়ের দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে রাজস্ব আয়ের ১৪ শতাংশে। কয়েক বছর আগেও এ হার ছিল ৮ শতাংশ। ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমলেও সুদের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এসব দেশের সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কমছে না। এ পরিস্থিতিতে ঋণ পুনর্গঠন দ্রুত ও কার্যকর করার পাশাপাশি নিম্নআয়ের দেশগুলোকে সহজ শর্তে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, নিম্নআয়ের দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ন্যায্য রাজস্বনীতি এবং সরকারি ব্যয়ের সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ (এআই) নতুন প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগানো এবং সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলনের ষষ্ঠ দিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এতে সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদান উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন আইএমএফের যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক জুলি কোজাক।

ঋণ কমলেও কমছে না চাপ

ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। মূল্যস্ফীতি অনেকটা করের মতো কাজ করে, যার প্রভাব নিম্নআয়ের মানুষকে তুলনামূলক বেশি বহন করতে হয়। তাঁরা এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ চান, যেখানে সরকারের নীতিতে স্পষ্টতা থাকবে এবং বেসরকারি খাত ও উদ্যোক্তারা সহজে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারবেন।

আইএমএফের এমডি বলেন, উচ্চ সুদ ও মূল্যস্ফীতির কারণে ঋণের বোঝা কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক নিম্নআয়ের দেশ ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিজেদের আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করলেও ঋণ পরিশোধের ব্যয় তাদের রাজস্বের বড় অংশ আটকে রাখছে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চআয়ের দেশগুলোতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় ঋণের অনুপাত বাড়ছে। অন্যদিকে নিম্নআয়ের দেশগুলোতে এ অনুপাত কিছুটা কমেছে। তবে সুদের হার বেশি থাকায় ঋণের অনুপাত কমার সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না।

এ অবস্থায় সব নিম্নআয়ের দেশকে বড় ধরনের ব্যয় সংকোচন কিংবা কঠোর অর্থনৈতিক সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে—এমন ধারণারও বিরোধিতা করেন জর্জিয়েভা। তাঁর মতে, দেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ঋণের ধরন বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

সহজ শর্তে ঋণ বাড়ানোর উদ্যোগ

নিম্নআয়ের দেশগুলোর অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে আইএমএফ দারিদ্র্য হ্রাস ও প্রবৃদ্ধি সহায়তা তহবিলের (পিআরজিটি) আওতায় অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। এ তহবিল থেকে যোগ্য দেশগুলোকে তুলনামূলক সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হয়।

জর্জিয়েভা জানান, নতুন সংস্কারের ফলে আগের তুলনায় সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পরিমাণ তিন গুণেরও বেশি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি দেশগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সক্ষমতা উন্নয়ন কার্যক্রমেও অতিরিক্ত অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তবে ঋণসহায়তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় দেশগুলোর নিজস্ব রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

ঋণ পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জরুরি

ঋণ সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আইএমএফের এমডি বলেন, যেসব দেশের ঋণ পুনর্গঠন প্রয়োজন, তাদের ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে জি-২০-এর কমন ফ্রেমওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উদ্যোগটিতে সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদানের নেতৃত্বের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

জর্জিয়েভা বলেন, কিছু দেশের ঋণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হলেও তাৎক্ষণিক অর্থের ঘাটতি থাকে। এসব দেশের জন্য নিজস্ব রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সমন্বিত আন্তর্জাতিক অর্থায়নের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

তাঁর মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও পরিস্থিতির পরিবর্তনে নিম্নআয়ের দেশগুলো তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব দেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সুরক্ষা নিশ্চিত করার তাগিদ

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য শুধু ঋণ ব্যবস্থাপনা বা ব্যয় সংকোচন যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন আইএমএফের এমডি। তাঁর বক্তব্যে রাজস্বনীতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ এবং সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন প্রযুক্তির বিকাশের সুবিধা কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

জর্জিয়েভার মতে, সরকার, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীরা নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে তার সুফল মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে প্রতিফলিত হবে।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
নিম্নআয়ের দেশগুলোর জন্য আইএমএফের বার্তা কী
বিশ্বব্যাংকের দাতা হলো মঙ্গোলিয়া, দিচ্ছে ১৩ লাখ ডলার
আইএমএফের শর্ত মানলে লাভ কী, আর ঝুঁকি কোথায়? 
সর্বশেষ খবর
লেখালেখি করে পতন ঘটানো যাবে না, সরকার মেয়াদ পূর্ণ করবেই: নুরুল হক নুর
লেখালেখি করে পতন ঘটানো যাবে না, সরকার মেয়াদ পূর্ণ করবেই: নুরুল হক নুর
টস করলেন হৃদয়, লিটনের কী হলো?
টস করলেন হৃদয়, লিটনের কী হলো?
‘আমরা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছি’, ইমেইল পাঠানোর পর স্ত্রীর সঙ্গে মিললো টেকির মরদেহ
‘আমরা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছি’, ইমেইল পাঠানোর পর স্ত্রীর সঙ্গে মিললো টেকির মরদেহ
মেঘনার বুকে অপরূপ এক ঠিকানা, নাম তার মায়াদ্বীপ
মেঘনার বুকে অপরূপ এক ঠিকানা, নাম তার মায়াদ্বীপ
সর্বাধিক পঠিত
অপুর সঙ্গে দ্বিতীয় ইনিংস, কে এই আদনান
অপুর সঙ্গে দ্বিতীয় ইনিংস, কে এই আদনান
শনিবার জবিতে আবারও গরুভোজের আয়োজন, থাকছে কাওয়ালি সন্ধ্যা
শনিবার জবিতে আবারও গরুভোজের আয়োজন, থাকছে কাওয়ালি সন্ধ্যা
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
আমাদের দলের প্রার্থী পাস না করলে সেই ইউনিয়নে কোনও কাজ হবে না: চিফ হুইপ
আমাদের দলের প্রার্থী পাস না করলে সেই ইউনিয়নে কোনও কাজ হবে না: চিফ হুইপ
এক জেলাতেই ৭১০ কোটি টাকার সুপারি, চাষে লাভবান কৃষক
এক জেলাতেই ৭১০ কোটি টাকার সুপারি, চাষে লাভবান কৃষক