গরিবের অল্প টাকার ওপর সরকারের নজর বেশি 

গোলাম মওলা 
২৩ জুন ২০২৬, ০৯:৪৯আপডেট : ২৩ জুন ২০২৬, ০৯:৪৯

কর ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজে আয়-বৈষম্য কমানো, ধনীদের কাছ থেকে বেশি কর নিয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রীয় সেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেই নীতির উল্টো চিত্রই দেখা যাচ্ছে। প্রত্যক্ষ করের বাইরে পরোক্ষ করের বিস্তৃত জালে আটকা পড়ে তুলনামূলক কম আয়ের মানুষই সবচেয়ে বেশি করের বোঝা বহন করছেন। অথচ উচ্চ আয়ের মানুষের জন্য কর ফাঁকি বা কর পরিকল্পনার নানা সুযোগ থাকলেও সাধারণ মানুষের সেই সুযোগ নেই। 

একজন নিম্ন বা মধ্যম আয়ের মানুষ প্রতিদিন বাজারে গিয়ে চাল, ডাল, তেল, সাবান, মোবাইল ফোন সেবা কিংবা বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কিনতে গিয়ে নিয়মিত ভ্যাট পরিশোধ করেন। তিনি চাইলে এই কর এড়াতে পারেন না। ফলে তার উপার্জনের বড় অংশই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকারের রাজস্ব ভান্ডারে চলে যায়। অপরদিকে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিরা তাদের আয়ের একটি বড় অংশ সঞ্চয়, বিনিয়োগ বা সম্পদে রূপান্তর করেন, যা তুলনামূলকভাবে কম করের আওতায় থাকে। 

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধরনের কর কাঠামো সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ এতে আয়ের তুলনায় দরিদ্র মানুষকে বেশি কর দিতে হয়, যা তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয় এবং সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। 

বাজেটে বেড়েছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের করের চাপ

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণ করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি বলেছে, নতুন কর কাঠামোয় সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর। রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭ পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংলাপে সিপিডি এই উদ্বেগ তুলে ধরে। 

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, “যাদের বার্ষিক আয় ৬ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকার মধ্যে, তাদের করের বোঝা সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে প্রায় ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অথচ যাদের বার্ষিক আয় ৩০ লাখ টাকার বেশি, তাদের কর বৃদ্ধি হবে মাত্র ৭ দশমিক ৬ শতাংশ।” 

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই হিসাবই দেখিয়ে দেয় যে নতুন কর কাঠামোর প্রভাব সবার জন্য সমান নয়। বরং আয়ের নিম্নস্তরে থাকা মানুষই তুলনামূলক বেশি চাপের মুখে পড়বেন। 

পরোক্ষ করের দুষ্টচক্রে সাধারণ মানুষ

বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় ভ্যাট ও অন্যান্য পরোক্ষ করের অংশ উল্লেখযোগ্য। এই করের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ধনী-গরিব সবাইকে একই হারে কর দিতে হয়। 

ধরা যাক, একজন দিনমজুর বা স্বল্প আয়ের কর্মচারী মাসে ২০ হাজার টাকা আয় করেন। সংসার চালাতে তার প্রায় পুরো আয়ই ব্যয় করতে হয়। ফলে তিনি প্রতিটি কেনাকাটার সঙ্গে ভ্যাট পরিশোধ করেন। অপরদিকে একজন উচ্চ আয়ের ব্যক্তি মাসে কয়েক লাখ টাকা আয় করলেও তার আয়ের একটি অংশই কেবল ভোগে ব্যয় হয়। ফলে আয়ের অনুপাতে করের চাপ কম পড়ে। 

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি একটি ‘রিগ্রেসিভ ট্যাক্স সিস্টেম’, যেখানে আয় যত কম, করের প্রকৃত বোঝা তত বেশি। 

ফলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাচ্ছে, অপরদিকে ভ্যাট ও করের বাড়তি বোঝাও বহন করছে। এতে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। 

মূল্যস্ফীতির মধ্যে দ্বিগুণ চাপ

বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি এখনও সাধারণ মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। খাদ্যপণ্যের দাম দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে করের বাড়তি চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন নিম্ন আয়ের ব্যক্তি তার আয়ের অধিকাংশই খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসা খাতে ব্যয় করেন। এসব খাতে ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে করের চাপ যুক্ত হলে তার হাতে অবশিষ্ট অর্থের পরিমাণ আরও কমে যায়। 

ফলে অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে জীবনযাপন করছে, কেউ কেউ ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে। 

বৈষম্য কমানোর বদলে বাড়ানোর আশঙ্কা 

কর ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য হলো ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার ব্যবধান কমানো। কিন্তু বর্তমান কর কাঠামো সেই লক্ষ্য পূরণে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। 

সিপিডির মতে, নতুন বাজেটে এমন কিছু পরিবর্তন এসেছে যা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। অথচ উচ্চ আয়ের মানুষের কর বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম রাখা হয়েছে। 

তাদের মতে, রাষ্ট্র যদি সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে কর ব্যবস্থাকে আরও প্রগতিশীল করতে হবে। বিলাসী ভোগ, অপ্রদর্শিত সম্পদ ও উচ্চ আয়ের ওপর করের কার্যকর প্রয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ওপর করের চাপ কমাতে হবে। 

কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির স্পষ্ট রূপরেখার অভাব

সিপিডি মনে করে, মানুষের ওপর বাড়তি করের চাপ দেওয়া হলেও তাদের আয় বাড়ানোর বিষয়ে বাজেটে স্পষ্ট কোনো কর্মপরিকল্পনা দেখা যায়নি। 

নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে আগামী ১৮ মাসে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির কথা বলা হলেও বাজেটে তার প্রতিফলন খুব একটা নেই। শ্রম, প্রবাসী কল্যাণ, শিল্প ও বাণিজ্য খাতের বরাদ্দে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্য বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। 

সাধারণ মানুষের প্রশ্ন

কর বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন হচ্ছে— যখন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েই চলেছে, তখন কেন একই সঙ্গে করের বোঝাও বাড়ানো হচ্ছে? 

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আহরণ অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই রাজস্ব সংগ্রহের ভার যদি তুলনামূলকভাবে কম আয়ের মানুষের ওপর বেশি পড়ে, তাহলে তা অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যকে আরও তীব্র করে তুলবে। 

তাদের ভাষায়, রাষ্ট্রের রাজস্ব বাড়ানোর সবচেয়ে সহজ পথ হলো সাধারণ মানুষের ভোগব্যয়ের ওপর কর আরোপ করা। কিন্তু সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত পথ হলো বেশি সামর্থ্যবানদের কাছ থেকে বেশি কর আদায় করা। নতুন বাজেট সেই ন্যায়সঙ্গত ভারসাম্য কতটা নিশ্চিত করতে পেরেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। 

বিশ্লেষকদের মতে, কর ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার না হলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ আরও বেশি চাপে পড়বেন। আর মূল্যস্ফীতি, সীমিত আয় ও বাড়তি করের ত্রিমুখী চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে আরও নিঃস্ব করে তুলতে পারে। 

/এসটি/ 
সম্পর্কিত
আইএমএফের নতুন ঋণ, জনজীবনে চাপ কি আরও বাড়বে 
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না: বাংলাদেশ ব্যাংক
দেউলিয়া ৫ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ছোট আমানতকারীদের জন্য বড় সুখবর
সর্বশেষ খবর
একক নিউরনের পূর্ণাঙ্গ বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে সাফল্য চীনের
একক নিউরনের পূর্ণাঙ্গ বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে সাফল্য চীনের
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জামায়াতের মিছিল শেষে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, আহত ১ 
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জামায়াতের মিছিল শেষে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, আহত ১ 
ত্রাণ ভাণ্ডারের পণ্যের সঙ্গে অতিরিক্ত পণ্য, রাজস্ব কর্মকর্তা আটক
ত্রাণ ভাণ্ডারের পণ্যের সঙ্গে অতিরিক্ত পণ্য, রাজস্ব কর্মকর্তা আটক
চুক্তি না মানলে যা করার প্রয়োজন তাই করবো: ইরানকে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
চুক্তি না মানলে যা করার প্রয়োজন তাই করবো: ইরানকে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
সর্বাধিক পঠিত
বিদায়ের আগে ডিসি সারওয়ারের চমক, এবার জানা যাবে মাজারের কত টাকা লুট হয়
বিদায়ের আগে ডিসি সারওয়ারের চমক, এবার জানা যাবে মাজারের কত টাকা লুট হয়
‘অভিমানী’ সেই কুমির অনশনে, ১৯ দিনেও খাবার তোলেনি মুখে
‘অভিমানী’ সেই কুমির অনশনে, ১৯ দিনেও খাবার তোলেনি মুখে
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত 
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত 
শাহজালালের মাজারের অর্ধেক টাকা কোথায় যায়, ইঙ্গিত মিললো চিঠিতে
শাহজালালের মাজারের অর্ধেক টাকা কোথায় যায়, ইঙ্গিত মিললো চিঠিতে
নবম পে-স্কেল: কার বেতন কত বাড়বে, কবে মিলবে টাকা 
নবম পে-স্কেল: কার বেতন কত বাড়বে, কবে মিলবে টাকা