জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে পর্যাপ্ত উদ্যোগ না নেওয়ার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি বাণিজ্য অংশীদারের পণ্যের ওপর নতুন করে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার (২৪ জুলাই) থেকে কার্যকর হওয়া এ সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ফলে দেশের রফতানিনির্ভর খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। হোয়াইট হাউসের ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য প্রতিরোধে যুক্তরাষ্ট্রের মতো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে এ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নতুন শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া মোট পণ্যের প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশের ওপর প্রযোজ্য হবে। তবে জ্বালানি তেল ও গ্যাস, সার, কিছু খাদ্যপণ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কয়েকটি পণ্য এ শুল্কের আওতার বাইরে থাকবে।
বাংলাদেশের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক
চূড়ান্ত তালিকায় বাংলাদেশসহ আর্জেন্টিনা, যুক্তরাজ্য, কম্বোডিয়া, কানাডা, একুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ‘মোস্ট-ফেভার্ড-নেশন (এমএফএন)’ শুল্কের সঙ্গে সমন্বয় করে মোট শুল্কহার ১০ অথবা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া বাকি ৩৮টি দেশের পণ্যের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এ তালিকায় চীনও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, দেশটিতে উইঘুর সংখ্যালঘুদের জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা হয়। যদিও বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
আইনি ভিত্তি সেকশন ৩০১
নতুন শুল্ক ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১ এর আওতায় আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ের পরও অধিকাংশ আমদানিপণ্যের ওপর ন্যূনতম শুল্ক বজায় রাখতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্লেষকদের মতে, সেকশন ৩০১ অতীতে আদালতের পরীক্ষায় টিকে যাওয়ায় নতুন শুল্কের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ সফল হওয়ার সম্ভাবনাও তুলনামূলক কম।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, ‘প্রায় এক শতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্র জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এখন সময় এসেছে আমাদের বাণিজ্য অংশীদাররাও একই ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন শুল্কের উদ্দেশ্য কেবল বাণিজ্য ঘাটতি কমানো নয়; বরং মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যায্য বাণিজ্যিক সুবিধা রোধ করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
কর্মকর্তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর আমদানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ অনেক দেশ একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তারা অন্যায্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাচ্ছে।
যেসব পণ্য শুল্কমুক্ত থাকবে
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জ্বালানি তেল ও গ্যাস, সার, কিছু খাদ্যপণ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার আওতায় আগে থেকেই পৃথক শুল্ক ব্যবস্থায় থাকা গাড়ি, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও তামার মতো পণ্য এ শুল্কের বাইরে থাকবে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বাণিজ্য চুক্তির (ইউএসএমসিএ) শর্ত পূরণকারী পণ্যও নতুন শুল্কের আওতায় পড়বে না। উত্তর আমেরিকার সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং এসব পণ্যে উচ্চমাত্রায় মার্কিন উপাদান ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এ ছাড় দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?
বাংলাদেশের মোট রফতানির বড় অংশই তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে এবং যুক্তরাষ্ট্র দেশটির অন্যতম প্রধান রফতানি বাজার। ফলে নতুন ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হলে বাংলাদেশের রফতানি প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে পোশাক খাতের মূল্য প্রতিযোগিতায় চাপ বাড়তে পারে। একইসঙ্গে শ্রম অধিকার, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা এবং জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড আরও কঠোরভাবে অনুসরণের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য নতুন করে গুরুত্ব পেতে পারে।

বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হার আসলে কত?
মার্কিন বাজারে ফের শুল্কের ঝড়, কতটা ঝুঁকিতে বাংলাদেশের রফতানি?
২০ শতাংশ পাল্টা শুল্কের চাপ সামলাবে কে 






