বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে স্থিতিশীল থাকলেও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে আগামী নির্বাচিত সরকারকে পাঁচটি প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
ড. সালেহউদ্দিনের মতে, পরবর্তী সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো—শিল্প ও ব্যবসা সচল করা, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতিকে কার্যকরভাবে ‘অ্যাক্টিভেট’ করা। শিল্প ও ব্যবসা সচল না হলে কর্মসংস্থান হবে না, আর কর্মসংস্থান ছাড়া মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব নয়।” তিনি আরও যোগ করেন, হংকং বা সিঙ্গাপুর মডেলের চেয়ে দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) শক্তিশালী করাই হবে বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত পথ।
মূল্যস্ফীতিকে একটি বহুমাত্রিক সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; এর সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থা ও জ্বালানি মূল্য জড়িত। ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে তিনি বলেন, “খেলাপি ঋণ ও আস্থাহীনতার কারণে খাতটি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ছাড়া শুধু ব্যাংকের ওপর নির্ভর করে টেকসই অর্থনীতি গড়া কঠিন।”
আগামী সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কার। ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ স্বীকার করেন যে এনবিআরকে কার্যকর করতে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হলেও নীতিগত সংস্কার এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা করনীতি নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন রিপোর্ট রেখে যাচ্ছি, যা পরবর্তী সরকার সংস্কার কাজে ব্যবহার করতে পারবে।”
জ্বালানি খাতকে ভবিষ্যতের একটি বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, অফশোর ড্রিলিং এবং সৌরশক্তির মতো বিকল্প জ্বালানি উন্নয়নে আরও বেশি জোর দিতে হবে।” তিনি জানান, বাংলাদেশে সৌরশক্তির বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই খাতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর বিষয়ে তিনি বলেন, “কারা এবং কোন কোন দেশে অর্থ পাচার করেছে, সেই তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে বিদেশ থেকে এই সম্পদ ফেরত আনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি। আমরা প্রাথমিক ভিত্তিটা তৈরি করে দিয়েছি; এখন প্রয়োজন সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও এজেন্সির মধ্যে জোরালো সমন্বয়।”
নির্বাচিত সরকারের প্রতি অর্থ উপদেষ্টার মূল পরামর্শ হলো—নতুন করে সব কিছু শুরু না করে চলমান সংস্কারগুলোকে সংহত করা। তিনি বলেন, “বর্তমান সরকারের ভালো কাজগুলো ধরে রাখুন, প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ান এবং কাজের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করুন। এসব চ্যালেঞ্জ সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে পারলে অর্থনীতি দ্রুত টেকসই স্থিতিশীলতার পথে ফিরবে।”









